আমার পাঁইট শেষ হয়ে এসেছিল। আর একটা আনব বলে উঠতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ওঠার আর দরকার হল না, তার আগেই শুড়িখানায় ধুন্ধুমার কান্ড। গত রাত্রের এক ঝামেলার বদলা নিতে বেপাড়ার মস্তানরা রেড করেছে। এই আড্ডায় একেকজন মস্তানকে একেক করে তুলছে আর পিটছে। আমার চারপাশে বসে থাকা মস্তানগুলো দুদ্দাড় করে পালাবার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু গেটের মুখেই ধরা পড়ে পিটুনি খাচ্ছে। রডের বাড়ি, চেনের চাবকানি খাচ্ছে। দোকানদার ঝাঁপ বন্ধ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। হঠাৎ একটা জোরালো কণ্ঠস্বর ভেসে এল বাইরে থেকে। ভদ্রলোক যাঁরা আছেন আপনারা বেরিয়ে আসুন। কারো গায়ে হাত তোলা হবে না। অপনারা দেরি করবেন না। আমরাও ভদ্রলোক।
এই আওয়াজে অবশিষ্ট সমস্ত খদ্দেরই প্রায় ভদ্রলোক সেজে বেরুতে লাগল। আমি তাদেরই একজনের গোটা পাঁইট হাতিয়ে একদৃষ্টে টেবিলের দিকে তাকিয়ে চুক চুক করে মদ খেতে থাকলাম। আমি সমস্ত জোর দিয়ে মনকে বোঝালাম, আমি ভদ্রলোক নই। এক সময়ে পকেট থেকে জগুদার ছুরিটা বার করলাম, ওটার মান বজায় রাখতে হবে। কারণ শুড়িখানার বাইরে থেকে যে হুংকার এইমাত্র শুনেছি, সেটা আমার স্মৃতি বলছে কেলে বিশের ডাক।
আমি একা বসে আছি, বাইরে লঙ্কাকান্ড চলছে। কেলে বিশে শোর তুলেছে এই ভাটিখানা লন্ডভন্ড করবে। দোকানের মালিক এক কোণে দাঁড়িয়ে থর থর করে কাঁপছে। তাদের দিকে আমি তাকাইনি। কিন্তু ওদের দাঁতে দাঁত ঘষার শব্দ আমি পাচ্ছি। আমাকে হয়তো ওরা পাগল কিংবা মৃত বলে ঠাউরে নিয়েছে।
কেলে বিশের এক অনুচর ভেতরে উঁকি মেরে ঘোষণা করল, বিশেদা, ঠেক ফাঁকা। শুধু এক শালা ভদ্দরলোক বসে মাল টানছে। বিশে বলল, বার করে দে ওকে। তারপর কী ভেবেই বলল, তুই থাক, আমি যাচ্ছি। তোরা শালা ভদ্রলোকের সঙ্গে ব্যবহার করতে জানিস না।
আমার কাঁধে একটা মৃদু টোকা পড়েছে। একটা ভদ্র আহ্বান, দাদা বাড়ি যান। কিন্তু এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আমার শরীর আর মাথা রাগে কাঁপছে। আমার সামনে বাল্যের দেখা সেই বিশে মস্তান। ছ-ফুটেরও বেশি লম্বা! কিন্তু সেই কালো ঝাঁকড়া চুল আর নেই। সেখানে মস্ত টাক আর টাকের চারপাশে গোল হয়ে সাদা কোঁকড়া চুলের অপসৃয়মান রেখা। বিশের মুখে বুকে কাটা-ছেড়া দাগ। খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর গোঁফ। চোখের সেই চাহনি আর নেই। ছিপেছিপে শরীর মোটা কদাকার, চর্বির ঢিপি। আর নোংরা জালি গেঞ্জির নীচে ঢলঢলে ট্রাউজারটাও বিবর্ণ। কিন্তু আমি যা দেখতে চেয়েছিলাম সেটা বলা চলে অক্ষতই আছে অর্থাৎ জগুদার ছুরি দিয়ে গলা থেকে নাভি অব্দি এঁকে দেওয়া ক্ষত।
আমি জগুদার মতন হিংস্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছি বিশের চোখ লক্ষ করে। ঠিক জগুদার মতন অবলীলায় ‘ক্লিক’ ধ্বনি করে তার ছুরিটা খুলে ফেলেছি। আর বলছি, বিশে তোমার মনে পড়ে এই ছুরি? নাহলে নিজের বুকের দাগটা একবার দেখে নাও। কোন সাহসে তুমি শালা আমাকে ভদ্দরলোক ভেবে টিটকিরি দাও। রুস্তমি দেখাতে চাও তো বার করো চাকু!
জগুদার মুঠিতে যেমন, এখন চাকুটা সেইরকম রাগী হয়ে উঠেছে। ও কিছু রক্তপান করবেই। ও যেন আপনা থেকেই কেলে বিশের দিকে এগোচ্ছে। আমি শুধু ওকে ধরে আছি। আমি হাত ঘুরিয়ে দিকপরিবর্তনও করতে পারছি না। আমি মুঠো খুললেও বুঝি ও হাত থেকে পড়ে যাবে না। কেলে বিশেও একে চিনেছে। তাই একটা অপ্রস্তুত হাসি হেসে ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে সে। বিশে তার বাঁহাত দিয়ে ওর সাঙ্গপাঙ্গদের নিষেধ করছে। আর মুখে শুধু বলছে, দাদা আপনি ভুল করছেন। আপনাকে আমি মারতে আসিনি। আপনাকে তো আমরা চিনি। নামকরা লেখক আপনি। ছিঃ। আপনি আমাদের এত ছোটোলোক ভাবছেন?
ছুরির সঙ্গে সঙ্গে আমিও বেরিয়ে এসেছি অন্ধকারে, এখনও ছুরিটা হাত থেকে খসেনি। জগুদার ছুরি রক্ত পান না করে ক্ষান্ত যায় না। আমি আমার বাঁহাতে একটা খোঁচা দিলাম ফালাটা দিয়ে। ভীষণ যন্ত্রণায় একটা ‘আঃ’ ধ্বনি বেরিয়ে এল আমার। চাকুটাও যথারীতি ছিটকে গিয়ে পড়ল একটা ড্রেনের ঝাঁঝরির পাশে যেরকম একটা জায়গা থেকে ওকে কুড়িয়ে নিয়েছিলাম বহুকাল পূর্বে।
ছোট্ট একটু রাত্রিসংগীত
আজ সকালেও ২৭ কি ২৮ ডিসেম্বর, ট্রিনকাসের ব্যাণ্ডের ছেলেগুলো এসে ধরেছিল, সনি, প্লিজ এই একটা মাস বাজিয়ে দাও। ক্লায়েন্টরা মিস করছে তোমার বাজনা। এভরিওয়ান ইজ আস্কিং, হোয়্যার ইজ লোবো? রিয়েলি, ইউ কান্ট ডু দিস টু আস!
লোবো বসেছিল ওর দোতলার ফ্ল্যাটের সিঁড়িতে। সিঁড়িটা ফ্ল্যাটের বাইরে দিয়ে তিনটে বাঁকে নেমেছে। রাস্তা থেকে উঠতে প্রথম যে বাঁকটা, ওইখানে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল বাবা, টোনি লোবো, ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে। প্রথমে বুক চেপে ধরল, একটা প্রবল চিৎকার দিল ‘সনি!’ আর তারপর ওই যে শুয়ে পড়ল সিঁড়িতে আর উঠল না। বড়ো বড়ো, ঢেলা ঢেলা চোখে মাতাল বাবা অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল রাতের আকাশে তারামন্ডলীর দিকে। সনি গিয়ে যখন মাথার কাছে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করল, কী হল, বাবা? শরীর খারাপ করছে? বাবা আঙুল তুলে তারা দেখিয়ে বলল, ওরা আমায় ডাকছে, সনি। তারপর ওই তারা দেখতে দেখতে চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল।
সিঁড়ির দ্বিতীয় বাঁক থেকে শেষ হাত নেড়েছিল প্রিসিলা। ওহ কী অপূর্ব হাত নাড়ার দৃশ্য সেটা, লোবো কোনো দিনও ভুলবে না। দৃশ্যটা মনে মনে তারিফ করতে করতে কী আফশোস তখন ওর—শিট! কেন আমার একটা ক্যামেরা নেই দৃশ্যটাকে ধরে রাখার জন্য! জড়িয়ে ধরে আদর, চুম্বন ও চোখের জলের পালা তো শেষই হয়ে গিয়েছিল, হাত নাড়ার বাইরে আর তো কিছু করার নেই তখন। বাইরে গেটে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে, প্রিসিলা হাওড়া স্টেশনে যাবে। সেখান থেকে বম্বে। একটা শীতের মরসুমের জন্য ও গাইবে বম্বের শেরাটনে। তারপর ফিরে এসে…
