এবং এরকম পরিস্থিতিতে একজন মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক কী করেন? তিনি তাঁর যাবতীয় লাঞ্ছনা ও অমর্যাদার প্রতিশোধ নিতে গল্প, উপন্যাস লেখায় ব্রতী হন। এবং আমিও তাই হলাম। তেমন আহামরি সাহিত্য রচনার ক্ষমতা আমার নেই, তাই নিজের পক্ষে যতখানি জটিল করে কিছু লেখা যায় আমি সেই চেষ্টাই করলাম। কিছু সম্পাদকের ধারণা হল আমি একেবারে প্রথম শ্রেণির জিনিয়াস। কারণ আমি লিখতাম মানুষের জটিল মনস্তত্ব নিয়ে, যার সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞান আছে কি না আমারও সন্দেহ, সমাজের নীচুতলার মানুষের হাহাকার নিয়ে (এই দ্বিতীয় ব্যাপারটি ছিল ওই জাতের ওপর আমার সবচেয়ে বড়ো ধোঁকাবাজি)। যা জানি না তাই লিখতাম বলে আমার স্পর্ধারও অন্ত ছিল না। শেষে একদিন আমার গুণমুগ্ধ এক সম্পাদক এসে বললেন, রাজীববাবু দলিত সমাজের ওপর আপনার লেখাগুলো এত চমৎকার হয়, তাই একটা অনুরোধ জানাতে এলাম। আপনি কলকাতার গুণ্ডা-মস্তানদের নিয়ে একটা উপন্যাস আমাকে দিন। যত সময় লাগে নিন, কিন্তু দিন।
এতটুকু বাড়িয়ে বলছি না, সেদিন আমার শিরদাঁড়া দিয়ে হু হু করে ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে লাগল। মানছি, আমি গরিব মানুষের সমাজ নিয়ে কিছুই জানি না। মানছি আমি বানিয়ে লিখি, এবং তেমন ভালো বানাতেও পারি না। এ দেশে এই ভাষায় এইসব ফালতু লেখা চলে। কিন্তু মস্তানি! আমি তো মস্তানদের দেখেছি। তাদের জগৎ তো আমার চেনা। এখন না হয় বহুদিন আমি ওদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি। তা হলেও ওদের নাড়িনক্ষত্র সবই তো আমার নখদর্পণে। আমি সত্যি তো ওদের চিনতাম! আমি ওদের নিয়ে বানাব কী করে? ভালো করে কিছু জানলে তাই কি লেখা যায়? অন্তত আমি কি লিখতে পারি?
সম্পাদক মহাশয় চলে গেলে আমি আমার পুরোনো বইয়ের আলমারির একটা খাঁজ থেকে জগুদার ছুরিটা বার করলাম। কালে কালে এর সমস্ত বিশেষত্ব চলে গেছে। এখন বোতাম টিপে এই ছুরি খুললে একটা ছ-বছরের শিশুও অবাক হবে না। বড়ো কথা এটাকে টিপলেও হয়তো ফলাটা বেরুবে না, কারণ ব্লেডের আশপাশে মরচে ধরেছে। আমি ছুরিটা নিয়ে তেল দিয়ে রগড়ে এর চেহারা ও স্বভাব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলাম। সামান্য চেষ্টাতেই ছুরির তেজ ফিরল, কিন্তু তার মধ্যে কিছু বিশেষত্ব ধরা দিল না, যাতে কিনা কাউকে ডেকে বলা যায়—দ্যাখ, জগু মস্তানের ছুরি! কিংবা এই কথাটুকুও কেউ মেনে নিলে তাকে বলা যায়, এতে ঢের ঢের মস্তানের রক্ত লেগেছে! এত দিন পরে বার করে বুঝলাম যে, আমার নিজের কাছেও এই চাকুর রহস্য হারিয়ে গেছে।
কিন্তু আমি ছুরিটাকে ফের আলমারিতে চালান দিলাম না। আমি কলেজ যাওয়ার সময় সেটিকে পকেটে নিয়ে বেরুলাম। এবং সেদিনই জীবনে প্রথম ক্লাসের দু-চারটে বেয়াড়া ছেলেকে গলা ছেড়ে বকুনি দেওয়ার নতুন সাহস সঞ্চয় করতে পারলাম। দেখলাম তাতে আমার অনুরক্ত ছাত্র-ছাত্রীরাও রীতিমতন মুগ্ধ বোধ করল। কলেজ শেষ করে আমি বাড়ি ফিরলাম না। এক কুখ্যাত মদের আড্ডায় দু-পাত্র মদ পান করতে গেলাম। সমাজে আমার অনেক ভদ্রলোক হিসেবে সুখ্যাতি হলেও এইসব জায়গা যে আমার কাছে পুরোপুরি অচেনা ছিল তা কিন্তু নয়। কলকাতা আসলে খুব বড়ো শহর। একপ্রান্তের এলাকায় চরিত্র স্খলন হলেও অন্য প্রান্তের বাসিন্দাদের কাছে তা খুবই অটুট রাখা যায়। আমি বহুবারই অবাক হয়ে ভেবেছি যে, শুড়িখানার বহু তাৎক্ষণিক বন্ধুদের দিনমানে আর অন্য কোথাও কখোনো দেখিনি কেন? নাকি আমি চোখে কম দেখি বা দেখেও চিনতে পারি না? আমার বরাবরই ভয় ছিল যে, মাঝেমধ্যে আমি যেসব পল্লিতে যাই সেই খবরও আমার কলেজে পৌঁছে যাবে। ছাত্র-ছাত্রীদের গার্জেনদের কানে উঠবে। তাও ওঠেনি। অর্থাৎ আমার দিনের এবং রাতের জীবনের মধ্যে দিন ও রাতের মতনই একটা দুস্তর ব্যবধান থেকে গেছে।
আর আজ আমি মস্তান অধ্যুষিত এই মদের আখড়ায় এলাম কারণ আমাকে মস্তানদের নিয়ে গবেষণা করতে হবে, কিছু লিখতে হবে। আমি রাজীব মিত্র, জগুদার পাড়ার মানুষ, জগু সিংহের একনিষ্ঠ ভক্ত। আজ মস্তানদের ব্যাপারে খোঁজ নিতে এলাম। কারণ মস্তান বিষয়ে যা আমি জানি তা জীবনেও লিখে দাঁড় করাতে পারব না। সত্য কথা দিয়ে সাহিত্য করার কোনো অভিজ্ঞতাই নেই আমার। অতঃপর না জানি সে সবকে ভোলার জন্যই নতুন করে কিছু শিখতে হবে।
আমি একটা বাংলা পাঁইট টেবিলে রেখে কিছু ছোলা আর লেবুর রসের ফোঁটা মেলাচ্ছিলাম। যা আমার কখনো হয় না আজ আমার তাই হল। এক গেলাস গেলার আগেই নেশা নেশা ভাব হল। আমি ইতিউতি তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম আজকাল কারা মস্তান, তাদের চেহারা আর চরিত্র কেমন। তারা কী ভাষা বলে। কিন্তু যতই দেখছিলাম একটা ক্লান্তি ও হতাশা আমার মনের মধ্যে ছেয়ে যাচ্ছিল। আমি বুঝছিলাম যে, এইসব কালকা যোগীদের নিয়ে উপন্যাস লেখা আমার দ্বারা হবে না। কারণ আমি সত্যিকারের মস্তান চোখে দেখেছি। তাদের চিনেছি, আর ভালোবেসেছি। জীবনে এই প্রথমবার হয়তো আমাকে সম্পূর্ণ বাস্তব থেকে সংগ্রহ করে একটা উপন্যাস লিখতে হবে এবং এইবারেই প্রথম সব সম্পাদকরা এককাট্টা হয়ে ঘোষণা করবেন, এ কিছু হয়নি। এ অতিবাস্তব অতিনাটকীয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাকে ওই সত্যগুলোই লিখতে হবে। শুধু আমার লেখার জন্য ওই স্মৃতি ও সত্যগুলো আছে।
