অথচ জগুদা না লড়লে গোটা পাড়ার সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। অগত্যা বাবাকে বললাম, বাবা, আজ এখানে ভাল্লুক খেলা হবে। বাবা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ভাল্লুক খেলা?
বাবা তখন বিরক্তির মুখ করে বললেন, দিন দিন পাড়ার বাড়ি লোকগুলো সব গাধা হয়ে যাচ্ছে। ধুত্তোর! এই বলে বাবা খড়মের খটখটাশ আওয়াজ করে নিজের সেরেস্তায় চলে গেলেন! আর ঠিক তখনই রণাঙ্গনে উপস্থিত হল উঠিত রংবাজ কেলে বিশে।
আমি গুটি গুটি বাড়ির গ্যারেজের ছাদে গিয়ে বসলাম। আর এক লহমা কেলে বিশেকে দেখে আমার রক্ত হিম হওয়ার জোগাড় হল। প্রায় ছ-ফুট লম্বা কালো জল্লাদের চেহারা তার। একরাশ কোঁকড়া চুল। ঠোঁট দুটো পান খেয়ে রক্তের মতন লাল। চোখ দুটো অন্ধকারে বেড়ালের চোখের মতন। ওরকম দড় পাকানো শরীরে হালকা সিল্কের সাদা সার্ট। কালো প্যান্টটা ওর এতই আঁটো সাঁটো যাতে মনে হয় ওকে পরিয়েই সেটার সেলাইকর্ম করা হয়েছে। কোমরের বেল্টটা চওড়া, তাতে কয়েকটা লোহার বন্টু আঁটা আছে। আর ওর পা চাপা, কোমর ঠাসা প্যান্টের হিপ পকেট থেকে বেরিয়ে আছে ওর চাকুর বাঁট। ও একটা হুংকার ছেড়ে চার পাঁচজন দর্শককে গোঁত্তা মেরে ঢুকে পড়ল লড়াইয়ের আখড়ায়। সেখানে ততক্ষণে খালি গায়ে তার ট্রাউজারে উদাস নেত্রে দাঁড়িয়েছিল জগুদা।
বিশে সড়াক করে ওর চাকু বের করল। তারপর ছুরির ভোঁতা দিকটা দিয়ে কপালের কিছুটা ঘাম আঁচড়ে স্বেদবিন্দুগুলো ছিটকে দিল দর্শকদের গায়ে আর মুখে বলল, জগু, আজ তুমি থাকবে আর না হয় আমি।
এবার জগুদার তৈরি হওয়ার পালা। জগুদা ওর উদাস দৃষ্টিকে ক্ষণিকের মধ্যে চিতা বাঘের মতন হিংস্র করে বলল, কালকা যোগী, আগে বাঁট সিধে করে ধর। বিশে ওর বাঁটের দিকে তাকাতে জগুদা নিমেষের মধ্যে কোমর থেকে বার করে ফেলল ওর ছুরিটা। কিন্তু সেটাকে না খুলেই তেড়ে গেল বিশের দিকে। বিশে জগুদার মুখ লক্ষ করে চাকু চালাল, কিন্তু জগুদা বসে গিয়ে আঘাত এড়াল। বিশে ফের নিজেকে সোজা করার আগে জগুদা ওর বিশাল বাঁ হাতটা দিয়ে ওর চুলের মুঠি ধরে ওকে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে গেল ফুটপাথের দিকে। কিন্তু, তখনও জগুদা ওর চাকু খোলেনি। উলটে উপস্থিত সবাইকে অবাক করে জগুদা ওর চাকুটা ফের গুঁজে নিল কোমরে। আর ভারমুক্ত ডান হাত দিয়ে বিশের চোয়ালে একটা ঘুষি মারল। বিশে ছিটকে পড়ল সানের ওপর। আর তখনই ওর গলার ওপর হাঁটু টিপে বসে পড়ল জগুদা।
যতদূর মনে পড়ে সেসময় বিশের গলা দিয়ে কান্নার মতন একটা ধ্বনি নিঃসৃত হয়েছিল। কেন? কেননা ওর গলার ওপর হাঁটু গেড়ে বসার পর জগুদা আস্তে আস্তে ওর প্রিয় ছুরিটা বার করে ‘ক্লিক’ ধ্বনি সৃষ্টি করে ছুরির ব্লেডটাকে পড়ন্ত রোদের আভায় লাল করে তুলেছিল। বিশে বুঝেছিল ওই ছুরি রক্ত পান না করে খাপে ফিরে যাবে না।
‘জগুদা, বাঁচাও। বলে একটা ডাকও ছেড়েছিল বিশে। সেই মুহূর্তে জগুদার মুখ-চোখ দেখে মনে হচ্ছিল কেলে বিশেকে খুন করতে চায় সে। কিন্তু আত্মসমর্পণ করার পরেও জগুদা কাউকে মেরেছে বলে শুনিনি। কিন্তু সেদিন যেন নিয়মভঙ্গ হতে চলেছিল। জগুদা তার ছুরিটাকে মুড়ে ফেলল না। কিন্তু বুকে স্ট্যাব না করে হালকা ভাবে বিশের গলা থেকে নাভি অবধি ক্ষত এঁকে দিল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে টান-টান হয়ে পড়ে থাকা কেলে বিশের মুখের উপর থুতু দিয়ে বলল, শুয়ারের বাচ্চা চাকু খোলা অব্দি টিকতে পারলি না শালা মস্তান।
জগুজা রণাঙ্গন ত্যাগ করার পরও বহুক্ষণ রাস্তায় শুয়েছিল কেলে বিশে। আস্তে আস্তে ওর সাদা শার্ট ভেদ করে ফুটে উঠল একটা দীর্ঘ রক্তের রেখা। সে-রেখা ক্রমশ জেবড়ে যেতে থাকল গোটা বুকে ছড়িয়ে গিয়ে। তারপর একসময় ওর জনা চারেক সাঙ্গপাঙ্গ যখন ওর ক্লান্ত, বিধ্বস্ত শরীরটা কাঁধে চাপিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা হল তখন সূর্য অস্তাচলে। পাড়ার ছেলেদের মধ্যে ব্যাপক জয়োল্লাস, যেন আমাদের ফুটবল টিম শিল্ড জিতে এসেছে। কিন্তু আমার নজর তখনও আটকে আছে কেলে বিশে যেখানে শুয়েছিল তার সামান্য দূরে রাস্তার ড্রেনের ঝাঁঝরিটার দিকে। সেখানে তখনও খোলা অবস্থায় পড়েছিল জগুদার রক্তমাখা ছুরিটা। বিশেকে ক্ষতবিক্ষত করে সেটিকে তাচ্ছিল্যের হাসির সঙ্গে জাগুদা ছুড়ে দিয়েছিল নর্দমার দিকে। যাতে মনে হয় জগুদা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল বিশের প্রাণ না নিলে ওই ছুরি সে বাড়ি নিয়ে ফিরবে না।
আশ্চর্য, কেউ কিন্তু সেটা যথেষ্ট নজর করেনি। তাই লড়াই শেষ হতে সবাই হই হই-তে মাতল, কেউ ওই সাধের ছুরিটা একবার তুলে নিয়ে পরখ করল না। আমি বুঝেছিলাম আমার এটাই একমাত্র সুযোগ ছুরিটাকে অন্তত স্মৃতি হিসেবে হস্তগত করার। তাই সবাই যখন তখনও সদ্য সমাপ্ত যুদ্ধের উন্মাদনা ও বিশ্লেষণে মত্ত আমি চুপচাপ গ্যারেজের ছাদ থেকে নেমে গেলাম রাস্তায়। আর ড্রেনের কাছে উবু হয়ে পেচ্ছাব করার ভণিতা করে কুড়িয়ে নিলাম ঐতিহাসিক চাকুটা। তারপর নিঃশব্দে বাড়ি ফিরে সেটিকে ধুয়ে ফেলে বিশের রক্তমুক্ত করে ছাদের চিলেকোঠায় পায়রার বাসার পিছনে খড় চাপা দিয়ে এলাম। এসব বহু আগের কথা। তারপর বহু জল গড়িয়েছে গঙ্গা দিয়ে। আরও ঢের রক্তপাত ঘটে গেছে আমাদের পাড়ায়। মস্তানির উত্থান-পতন ঘটেছে, রাজনীতির রং ও ঢং বদলেছে, জগুদার গৌরবের দিন অস্তমিত হয়েছে বহুকাল। আরও বহু মস্তান জেগেছে, কিন্তু তারা কেউ জগুদার ছিটেফোঁটা মর্যাদাও পায়নি। বহুদিন হল বাবা পরলোকগমন করেছেন এবং ওই পাড়ার বাড়ি বিক্রি করে আমরা অন্য পাড়ায় চলে এসেছি। বাবার বহু শখ ছিল আমি বিলেতে যাব, ব্যারিস্টার হব, কিন্তু আমি ভীত হয়েছি। বাবা অনেক কিছুই চাইতেন, কিন্তু আমি কোনো কিছুই হইনি। আমার ওপর রাগ করলে বাবা বলতেন, শেষকালে তোকে জগুর দলেই ভরতি হতে হবে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি টের পেয়েছি যে, আমার সেইটে হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই। আমি যথাকালে দর্শনের অধ্যাপক হয়ে কলকাতার উপকণ্ঠে এক কলেজে যোগ দিলাম। আমার একটিমাত্র সুনাম সমাজে রটেছিল—আমি অত্যন্ত ভদ্রলোক। বাড়ির চাকর রাখলে প্রথমে দু-দশদিন ‘আপনি’ করে কথা বলি। পাশের ঘর থেকেও কেউ কোনোদিন আমার কণ্ঠ শুনতে পাবে না। এমনকী কলেজেও ক্লাস নিলে পিছনে বসা ছাত্রছাত্রীরা আমার গলা শুনতে পায় না। তারা তখন নিজেদের গল্পগুজবে মন দেয়। তাদের চেঁচিয়ে বারণ করা মতন কণ্ঠশক্তিও আমার নেই।
