আমরা জগুদার ছুরিটা হাতে নিয়ে কখনো দেখিনি, কিন্তু দূর থেকে অনেকবার দেখেছি, এমনকী ইন অ্যাকশান। কারণ পাড়ায় তখন মাসে, দু-মাসে একটা না একটা মস্তানির ঘটনা ঘটতই। দলবদ্ধভাবে কোনো অভিযানে গেলে জগুদা রিভলবার, সোর্ড, লাঠি নিয়ে বেরোত। আশপাশের বহু পাড়াকে জগুদা এমনভাবে ঠাণ্ডা করে রেখেছিল। কিন্তু অন্য কোনো উঠতি বা ডাকসাইটে মস্তানের সঙ্গে জগুদা মুখোমুখি ডুয়েল পছন্দ করত। এবং এভাবে বহু মস্তানকে রাস্তায় পেড়ে ফেলে তার টুটি টিপে জগুদা তাকে ক্ষমা চাওয়া ও নতি স্বীকার করিয়েছে। ছুটির দিন দশটা এগারোটা নাগাদ, কিংবা এমনি দিনে পড়ন্ত দুপুরে এইসব লড়াই জমত পাড়ায়। তখন পাড়ায় মান্যগণ্য ব্যক্তিরা পুলিশে ফোন করার বদলে বারান্দায় ঝুঁকে এই গ্ল্যাডিয়েটরীয় যুদ্ধ দেখায় মেতে উঠতেন।
বলা বাহুল্য, জগুদা আমাদের হিরো ছিল। এবং জগুদা কখনো কোনো ব্যক্তিগত, সম্মুখ সমরে হারেনি, বা পেছপা হয়নি। ছুরি ছাড়াও জগুদা বহুবার খালিহাতে লড়েছে। এবং তেমন ক্ষেত্রেও রক্তপাত কিছু কম ঘটেনি।
ছেলেবেলা থেকেই রক্ত দেখলে আমার মাথা ঘোরে, শরীর কাঁপে। কিন্তু মন ও শরীরে কোনো বিপত্তিই আমাকে জগুদার লড়াই দেখা থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। প্রথম প্রথম যে মাথা ঘোরেনি তা নয়। কিন্তু ক্ৰমে ব্যাপারটা গা সওয়া হয়ে গেল। এবং আরও কিছুদিন যেতে সেটা নেশায় দাঁড়িয়ে গেল। যে আমি ইশকুলের মিসট্রেসের আঙুল বেয়ে রক্ত গড়াতে দেখেলে প্রায় ভিরমি খেতাম সেই আমিই তখন অপার আহ্লাদে পাড়ার মস্তানি দেখছি। সে আহ্লাদ কিছুটা যেন টারজেনের ছবি দেখার মতন। লড়াই দেখার মুহূর্তে আমি নিজেও তখন মনে মনে জগুদা। জগুদার ছোড়া প্রত্যেকটা ঘুষি কিংবা চাকুর চালের সঙ্গে কিছুটা মিশে যাচ্ছে আমার নিজের শক্তি ও কল্পনা। জগুদার শরীর লক্ষ করে নিক্ষিপ্ত তার প্রতিপক্ষের কিছু কিছু আঘাতও যেন আমার গায়ে এসে পড়ছে।
একেক দিন আমরা সকাল থেকেই খবর পেয়ে যেতাম অমুক পাড়ার তমুককে পাড়ায় এনে পিটবে জগুদা। সেদিনটা তৎক্ষণাৎ পাড়ার ছেলেছোকরাদের কাছে উৎসবের দিন হয়ে যেত। আমরা আকাশের সূর্যের দিকে তাকিয়ে গভীর প্রত্যাশায় থাকতাম কখন দিনমণি পশ্চিমে কিছুটা হেলে পড়ে যুদ্ধের সময় আগিয়ে আনবেন। আমরা নিজেদের মধ্যে জল্পনাতেও ব্যস্ত হতাম মল্লবীর দারা সিং-এর সঙ্গে আখড়ায় নামলে জগুদা বিজয়ী হবে কি হবে না। কিন্তু জগুদার পকেটের স্বয়ংক্রিয় ছুরিটির কথা ভাবলে আমরা নিজেরাও মনে মনে শিউরে উঠতাম। জগুদার খোলা ছুরির সামনে আমরা নিরস্ত্র দারা সিংকেও ছেড়ে দিতে রাজি ছিলাম না।
সেদিনও এমনি একটা শীতের সকাল। হয়তো ছুটির দিন। আমরা খবর পেলাম জগুদাকে ফাইটে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে বেপাড়ার উঠতি মস্তান কেলে বিশে। কেলে বিশে আমরা শুনেছিলাম রোগা, লম্বা ও বিদ্যুৎগতিসম্পন্ন। তাকে মুঠোয় আনা কোনো মানুষের কম্ম নয়। তার হাতে ছুরিও খেলে বিদ্যুতের মতন। এতাবৎ সে অনেক মস্তান ও পুলিশ অফিসারের দেহে তার হাতের সূক্ষ্ম কাজের প্রমাণ রেখেছে। কিছু নরহত্যার দাবিও সে করে থাকে। সে এখন জগু সিংহকে তার পয়লা নম্বর শত্রু মনে করে। তাই ছুরি মোলাকাতে আসবে।
আমাদের পাড়ার সবারই রক্তের গতি সেদিন ভয়ানক দ্রুত হয়ে গেছিল। আমাদের মধ্যে অনেকে এ মতও পোষাণ করতে শুরু করেছিল যে জগুদা হয়তো শেষমেশ কেলে বিশেকে বাগে আনতে পারবে না। হয়তো আহত হবে, নচেৎ আসর ছেড়ে সরে দাঁড়াবে। একমাত্র নির্বিকার ছিলাম আমরা। যাদের কাছে জগুদা চাকু হাতে টারজেন, চাবুক হাতে জোরো কিংবা অন্য কোনো কমিক স্ট্রিপের হিরো। জগুদা হারছে, এমন কথা আমাদের কোনো গল্পের বই বা কমিকসে লেখা নেই।
আমি শুধু উৎকণ্ঠার সঙ্গে নজর করছিলাম আকাশের সূর্যটাকে। কখন সেটা রঞ্জুদের বাড়ির পিছনে হেলে পড়বে। আমি ধৈর্যহীনতার বশে একবার রাস্তায় গিয়ে উঁকি দিয়েছিলাম এবং তার বাড়ির সামনে পায়চারিরত জগুদার কোমরে ছুরিটা দেখে নিশ্চিন্তও হয়েছিলাম। চার্চিলের মতন দুটো আঙুল দিয়ে বিজয় চিহ্ন ‘ভি’ এঁকে দেখিয়েও ছিলাম জগুদাকে। জগুদা সে-দৃশ্য দেখেছিল কি না মনে নেই। তবে জগুদাকেও সেদিন অযথা উত্তেজিত বলে মনে হয়নি। সে শুধু হাওয়ার মধ্যে বোলারদের মতন তার দুটি হাত লম্বা করে সামনে পিছনে ঘোরাচ্ছিল। যেন এইমাত্র ভিনু মাঁকড়কে একটা ইন-সুইংগার নিক্ষেপ করবে। কিন্তু আসলে, জগুদা ওর হাতটাকে একটু ব্যায়াম করাচ্ছিল।
কখনো কখনো ওর ঝাঁকড়া কেশরাশি ঝাঁকিয়ে নিচ্ছিল জগুদা। আর অদূরে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য এক নাগাড়ে চোখ দিয়ে পান করছিল জনা ত্রিশেক ছেলেছোকরা। এপাড়ার ও আশেপাশের এলাকার উঠতি মস্তানরা।
শীতের দিন বলে সূর্যদেব আমাদের বেশিক্ষণ প্রতীক্ষায় রাখেননি। তাড়াতাড়ি হেলে পড়লেন রঞ্জুদের বাড়ির পিছনে। রোমানদের আমল হলে একটা ভেরি বেজে ওঠার প্রয়োজন হত। সেদিন সেই কাজটা করল ছনাদা। একটা ফুটবলের বাঁশি জোগাড় করে বার কয়েক বাজিয়ে দিল। ইতিমধ্যে শতখানেকেরও বেশি লোক জমে গেছে আমাদের বাড়ির সামনে। আমার উকিল বাবা পাড়ার এই নিয়মিত এন্টারটেনমেন্টের ব্যাপারে ছিলেন একেবারেই অনভিজ্ঞ। বাড়ির সামনে অত ভিড় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁরে অত ভিড় কীসের? কিন্তু সত্যি কথাটা বলার সাহস আমার কোনো মতে জোগাল না। পাছে আমায় নিযেধ করেন রক্তারক্তি ব্যাপার দেখায়। আরও মুশকিলের হবে বাবা যদি রাস্তায় গিয়ে জগুদাকে লড়াই করতে বারণ করেন। জগুদা বাবার খুব অনুগত, মামলায় জড়ালেই বাবার কাছে পরামর্শ নেয়। বাবা বললে জগুদা কিছুতেই লড়বে না।
