বলে ওঝামশাই ওরফে কবিরাজ ঘর ছেড়ে বেরোতে যাচ্ছিল। মাধবী বলল, বসেন বসেন। এক কাপ চা তো খেয়ে যান। কবিরাজ বলল, আমি মা হরতুকির জল খাই। চা আর খালাম কবে? বলে মাটির দিকে স্থির নজর রেখে ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে গেল। কবিরাজ বেরিয়ে যেতে মাধবী রাখালকে বলল, আমি কিন্তু ভুল দেখিনি। ওই দুল কিন্তু সত্যি চোখ হয়ে গিয়েছিল। রাখাল উদাসভাবে তাকিয়ে রইল মাধবীর দিকে। আর প্রায় অন্যমনস্কভাবেই অস্ফুট স্বরে একটা শব্দই উচ্চারণ করল, জানি।
দুপুরে মাছ কাটতে গিয়ে মাধবী দেখল মরা মাছের চোখ দুটো ওর দিকেই চেয়ে আছে। ঠায়। আর চোখ দুটোও ওর চেনা চেনা। গত রাত্রে স্বপ্নে দেখা। ও মাছটাকে সাততাড়াতাড়ি বঁটির পাশের ছাইয়ের গাদায় নামিয়ে রেখে স্বামীকে ডাকল, হ্যাঁ গো, শুনছ? রাখাল সবে স্নান করে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল! মাধবীর ডাক শুনে চিরুনি হাতেই বেরিয়ে এসে বলল, কী ব্যাপার?
–দ্যাখো, মাছের চোখটা দ্যাখো।
রাখাল উবু হয়ে বসে মাছটার চোখ এপাশ-ওপাশ করে দেখে বলল, হুম! একটু বেশি লাল। মাধবী বলল, তা বলছি না। ওগুলো একেবারে মানুষের মতন কিনা বল? রাখাল বলল, ধ্যাত! যত আজেবাজে চিন্তা তোমার। বলে ফের চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ফিরে গেল আয়নার সামনে। আর আয়নায় নিজের মুখ দেখে নিজেই ভয় পেল। ও দেখল আয়নায় প্রতিফলিত ওর চেহারাটা একজন ভীত সন্ত্রস্ত মানুষের। আয়নার ওই মানুষটা ভয় পেয়েছে, কারণ ও জানে মাধবীর কথাটা মিথ্যে নয়। মাছের চোখ দুটো বাস্তবিকই মানুষের চোখ। চোখ দুটো ঈশ্বরীর। তাতে কোনো ভুল নেই। তবু নিঃসন্দেহ হওয়ার জন্য রাখাল চিরুনিটা তাকের ওপর ছুড়ে দিয়ে ছুটে গিয়ে খুলে ফেলল ওর সুটকেসটা। দ্রুত হাত চালিয়ে ফাইল আর কাগজের বাণ্ডিল ঘেঁটে বার করে আনল ওর আর ঈশ্বরীর বিয়ের পর তোলা যুগল ছবিটা। আর মাছের চোখ ও ঈশ্বরীর চোখের সাদৃশ্য পরখ করার জন্য সরাসরি দৃষ্টি ফেলল নতুন বউ ঈশ্বরীর সুন্দর, ডাগর, প্রায় পটল চেরা চোখ দুটোর ওপর। আর দেখল এই মুহূর্তে এই ছবির ঈশ্বরীর চোখ দুটো একেবারে গর্তের মতন। কালো, অন্ধকার। ওখানে কোনো চোখ নেই!
শিরদাঁড়ায় প্রচন্ড একটা ব্যথা সহসা অনুভব করল রাখাল। ওর মনে পড়ল গ্রামের মেয়ে ঈশ্বরী কী পরিমাণ স্বামীগত প্রাণ এবং অন্যান্য সমস্ত বিষয়ে স্বার্থপর ছিল। হাসপাতালের বেডে শুয়েও ও বলেছিল, আমি ও-বাড়ি ছেড়ে কোনোদিন যেতে পারব না। প্রেসারের রোগী ঈশ্বরীর চোখ দুটো মৃত্যুর আগের দিন সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যায়। ওর মাথায় নাকি রক্ত চড়ে মাথাটাকেই লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল। রাখাল সেদিন ওর মাথার কাছে ঝুঁকে পড়ে যে নিথর, দৃষ্টিহীন চোখ দেখতে পেয়েছিল কিছুক্ষণ আগে সেই চোখই দেখেছে ও বাজার থেকে আনা ত্রিশ টাকা মূল্যের ইলিশটার মধ্যে। রাখালের মাথা ঘুরছিল। ও হাতের ছবিটা নামিয়ে রেখে মাধবীর নাম ধরে ডাকল কিন্তু গলা দিয়ে এতটুকু আওয়াজ বেরুল না। আর বেরোলেও মাধবীর তা শোনার মতো ক্ষমতা ছিল না, কারণ ভয়ে আর আতঙ্কে মাধবী ততক্ষণে ইলিশের চোখ দুটো বুড়ো আঙুল দিয়ে টিপে কোটর থেকে বার করে ফেলেছে। আর অসাড় হয়ে দেখছিল কীভাবে চোখ দুটো গড়াতে গড়াতে ঢুকে গেল ওদের ঘরে। যেন ঢালু জমিতে গড়িয়ে দেওয়া কাচের গুলি সমানে ধেয়ে যাচ্ছে।
রাখাল দেখল গুলির মতন গড়াতে গড়াতে মাছের চোখ দুটো এসে ঢুকে পড়ল ঈশ্বরীর চোখের কোটরে। আর অমনি ছবিটা একেবারে পূর্বের সেই চেহারায় ফিরে গেল। নতুন বর রাখালের পাশে নতুন বউ ঈশ্বরী বসে। বড়ো বড়ো পটলচেরা চোখে সলজ্জভাবে তাকিয়ে আছে ক্যামেরার লেন্সের দিকে।
ছুরিকাঘাত
জগুদার হাতের লম্বা ছুরিটার সঠিক বর্ণনা আমি আর দিতে পারব না। ফলাটা নিশ্চয়ই ছ ইঞ্চির একটু ওপরেই ছিল, কিন্তু সেটা তার বিশেষত্ব ছিল না। শহরের সব মস্তানই যখন তাদের চাকুর ব্লেডগুলোকে দু-আঙুলে টিপে ঘ্যাড়ঘ্যাড়, খ্যাড়খ্যাড় করে টেনে বার করত খাপ থেকে, জগুদা তখনই ঝটকা মেরে ছুরিটা তুলে আনত কোমর থেকে। আর তারপর তার চিতাবাঘের মতন চোখ যখন দপদপ করে জ্বলতে থাকত, আতঙ্কের সম্মোহন বিস্তার করত প্রতিদ্বন্দ্বী মস্তানের ওপর, ততক্ষণে তার ডান হাতের তালুর মধ্যে ক্লিক করে ধাতব শব্দ উঠত। আর অমনি অটোম্যাটিক্যালি, ছ-ইঞ্চিরও বাড়তি দৈর্ঘ্যের ফলাটা কড়াৎ করে বেরিয়ে আসত খাপ থেকে। ছুরির এই স্বয়ংক্রিয় ঔদ্ধত্য সে-সময় বহু মস্তানের হৃৎপিন্ডে দারুণ ধাক্কা দিত ভয়ের। আমরা বহু মস্তানকে সে-সময় হতবুদ্ধি থাকতে দেখেছি শুধুমাত্র এই ছুরির ফলাটার দিকে।
তবে জগুদা কখনো ওই ছুড়ির ভড়কির সুযোগে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে আঘাত করেনি। কারণ জগুদার আস্থা ছুরির চেয়েও বেশি ওর নিজের দেহের শক্তি ও কবজির কায়দার ওপর। তা ছাড়া পূর্বের দিনের মস্তানদের মতন জগুদার ভেতরও অনেকখানি ন্যায়পরায়ণতা ও আত্মম্ভরিতা কাজ করত। একবার চাকু খুললে প্রতিপক্ষের কিছুটা রক্তপাত না ঘটিয়ে সে ছাড়ত না। অথচ পরাস্ত প্রতিপক্ষকে প্রাণে মারারও ঘোর বিরোধী ছিল জগুদা। বহুদিন মস্তানির সুযোগ না পেলে জগুদা দুপুরে স্নানের আগে গায়ে তেল মেখে হাতে ছুরি নিয়ে শ্যাডো-ফাইটিং করত। আমরা পাড়ার বালকরা, বহুবার জগুদার কাছে, ওর ছুরিটা দেখার বাসনা ব্যক্ত করেছিলাম। কিন্তু ওই একটা ব্যাপারেই জগুদার স্বভাবত স্নেহশীল প্রাণটাকে টলানো যায়নি।
