অথচ অত ভারী লাগল কেন সুটকেসটা তখন? মাথার মধ্যে সব কিছুই যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে মাধবীর। ওর মনে হল গত রাত্রে ঘুমের অভাবেই অতটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল ও। তাই প্রথম টানে বাক্সটাকে অতখানি ভারী লেগেছিল। এবার ও বাক্সটাকে এক হাতে সামান্য জোরে ঠেলতে সেটা সড়সড় করে সরে গেল অনেকখানি। নিজের ওপর ভয়ংকর রাগ গিয়ে পড়ল মাধবীর। ওর কানে এল কেটলিতে চায়ের জল ফোঁটার শব্দ। হাঁটুর ওপর হাতের ভর দিয়ে কোনোক্রমে উঠে দাঁড়িয়ে মাধবী উঠোনে গিয়ে চায়ের জলটা নামাল। তিন কাপ চা বানিয়ে তার দু-কাপ রাখালের জন্য ঢেকে রেখে একটা ছোট্ট অ্যালুমিনিয়ামের কাপে নিজের চা-টুকু নিয়ে মাধবী এসে বসল ফের সুটকেসের পাশে। চায়ে চুমুক দিতেই শরীরটা হঠাৎ বেশ ঝরঝরে লাগল। ও আরও দুটো চুমুক দিয়ে কাপটা পাশে রেখে ফের তুলে ধরল সুটকেসের ডালাটা। ওর চোখে পড়ল বড়ো একটা ফাইলের কোণে এক রাশ পিপড়ে কোত্থেকে জড়ো হয়েছে।
সত্যি, বরটা ভীষণই ভুলোমনা, ভাবল মাধবী। না হলে পিঁপড়ের চাক বসেছে দামী কাগজপত্রে সেটাও তার চোখে পড়ে না? এভাবে কাগজগুলো নষ্ট হলে ক্ষতি কার হবে? মাধবীর? না গোটা সংসারের? মাধবী চট করে ফাইলটা তুলে দিয়ে যেখানটায় পিঁপড়ে জমেছে সেখানে সজোরে ঝাড়তে লাগল। পিঁপড়েগুলো পড়ক না পড়ুক ওই ঝাড়াঝাড়িতে ফাইল থেকে একটা খাম গলিয়ে পড়ল মাটিতে। সেটা তুলে জায়গামতন রাখতে গিয়ে মাধবীর মনে হল ওতে দুটো দুল আছে। একটু ভারী দুলই হবে হয়তো। স্বামীর আগের পক্ষের জিনিস। তবে মেয়ে বলেই হয়তো সেটা না দেখে যথাস্থানে ফিরিয়ে রাখতে মন সরল মাধবীর। ও খামের একটা দিক ফাঁক করে উঁকি মেরে সেটা দেখল। এবং সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে ও আতঙ্কে ওর চোখ দুটো প্রায় ঠিকরে কোটর থেকে বেরিয়ে আসছিল। দুটো কানপাশা বা দুলের জায়গায় খামের মধ্যে হাজির ছিল দুটো মানুষের চোখ! জ্যান্ত, জ্বলজ্বলে, হিংস্র। ওই খামের ফাঁক দিয়েই চোখ দুটো চেয়েছিল মাধবীর দুই চোখের দিকে! কোটরমুক্ত, নিষ্পলক ওই চোখ দুটো যে কোনো মহিলার, মাধবীর তাতে কোনোই সন্দেহ রইল না। এই চোখ দুটোই সে গতকাল রাত্রে স্বপ্নে দেখেছে। ও তীব্র এক চিৎকার করে খামশুদ্ধ চোখ দুটো ছুড়ে দিল দরজার দিকে। আর পরক্ষণেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল মাটিতে।
মাধবী জ্ঞান ফিরে দেখল ওর মাথার পাশে মুখ কাঁচুমাচু করে বসে আছে রাখাল। সঙ্গে আরও কে একজন। মাধবীর চোখ খুলেছে দেখে রাখালের পাশে বসা লোকটি বেশ জোরে জোরে বলে উঠল, যা কইছিলাম রাখাল, দ্যাখলা তো? এ হল গিয়া পিত্তজ্বর। রাত্তিরে দুঃস্বপ্ন হয়, দিনের বেলা মাথাঘুরা। এসব আমার নখদর্পণে। কয়েক লক্ষ সারাইছি অ্যাদ্দিনে। নাও, নাও এবার এই বড়িখান বউরে খাওয়াও দিকিনি। বলে ওর ময়লা ধুতির খুঁট থেকে একটি কালির বড়ির মতন কী বার করে রাখালের হাতে দিল লোকটা। রাখাল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বড়িটা মাথায় ঠেকাল, যেন দেবতার প্রসাদ। আর মাধবীর হাড়পিত্তি জ্বলে গেল ওইসব বুজরুকির ওষুধ দেখে; ও বেশ বিরক্ত হয়েই বলল, হ্যাঁ গো, আমার তো কিছু হয়নি। আমায় ওষুধ দিচ্ছ কেন?
রাখাল মাধবীর মাথায় ওর হাতের তেলোটা আলতোভাবে রেখে বলল, তোমার কী হয়েছিল মধু? মাথা ঘুরছিল? মাধবী আস্তে আস্তে উঠে বসে বলল, না, মাথা ঘোরেনি। তোমার একটা দরকারি খাম পড়ে গিয়েছিল বাইরে। সেটা তুলতে গিয়ে দেখলাম তার ভিতরে মাধবী এতটুকু বলে যেন দম নিতে গেল। একটু চুপ করে রইল। তাতে উদবিগ্ন হয়ে রাখাল বলল, এই খামটা?
বলে সুটকেসের সেই খামটাই মাধবীর সামনে মেলে ধরল রাখাল। যে খাম মাধবী আতঙ্কের সঙ্গে ছুড়ে ফেলেছিল দোরগোড়ায়। মাধবী বলল, হ্যাঁ।
–তা এতে কী দেখলে?
–চোখ।
–চোখ!
— হ্যাঁ, দুটো চোখ।
হায় কপাল। বলে মাথা চাপড়াতে লাগল রাখাল। তুমি এর মধ্যে চোখ কোথায় পেলে? এতে তো ঈশ্বরীর দুটো কানপাশা আছে। তোমার জন্য নতুন করে গড়িয়ে দেব ভাবছিলাম। অথচ আজ সকালে তন্নতন্ন করে খুঁজেও খামটা সুটকেশের মধ্যে পেলাম না। তাইতো ছুটে গেছলাম তারকের বাড়ি। একবার এ দুটো ওর কাছে বন্ধক রেখে কিছু টাকা নিয়েছিলাম। ভাবলাম টাকা শোধ করলেও জিনিসটা বোধ হয় ফেরত আনিনি। কিন্তু তারক বলল, জিনিস তো আমি টাকা দেওয়ার দিনই ফেরত এনেছি। তারপর ঘরে ঢুকে দেখি দোরগোড়ায় দুল দুটো গড়াগড়ি খাচ্ছে।
এতক্ষণে সুযোগ বুঝে রাখালের পাশে বসা কবিরাজ ফের মুখ খুলল— আরে হ, ইডাই তো কইতে আছিলাম রাখাল। পিত্তজ্বরে দৃষ্টিভ্রম হয়। লাঠিরে সাপ দ্যাখে, সাপেরে ব্যাং। বুঝলা? অখন ওই ওষুধটা খাওয়াও অরে।
অমনি মাধবী মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠল, না না। আমার কোনো ওষুধের দরকার নেই। আমার কিছু হয়নি। কবিরাজ বলল, হইলেই বা তুমি বুঝবা ক্যামনে? তুমি তো নাবালিকা। মাধবী আরও রেগে গিয়ে জায়গা ছেড়ে উঠে গেল দালানে। স্বামীর জন্য রাখা দু-কাপ চা ফের কেটলিতে ঢেলে উনুনে বসালো গরম করার জন্য। আর সেখান থেকে শুনতে পেল কবিরাজ রাখালকে বলছে, দ্যাখলা তো রাখাল! এইডা হৈল গিয়া ভূতি ধরার লক্ষণ। ঘুণাক্ষরেও অরে জানতি দিও না যে আমি ওঝা; তাহলে ভয় পাবে, ভূতেরও পোয়া বারো ঘটব। এইডা খ্যাল রেইখো।
