সেদিন মাঝরাত্তিরে টেন্টে টেন্টে অ্যালার্ম বেজে উঠল। যা হোক কিছু একটা গায় চাপা দিয়ে সবাই বাইরে বেরিয়ে এসে দেখল একটা রক্তাক্ত মৃতদেহ চাপা দেওয়া আছে। ক্যাপ্টেন রাগে থরথর করে কাঁপছেন। সিভিয়ার ইনডিসিপ্লিনের অভিযোগে পারতপক্ষে সবাইকেই দায়ী করলেন ক্যাপ্টেন এগার্ট। এতগুলো লোকের কেউ কি জানত না ক্রিস মানসিক রোগে ভুগছিল? তাহলে তাঁকে সে-কথা জানানো হয়নি কেন? কেন একটা মানসিক রোগীকে দিনের পর দিন প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে? কেউ কি তার মনের খবর রাখার চেষ্টা করেনি?
যন্ত্রচালিতের মতন একসময় উদয় এগিয়ে গিয়ে বলল, আমি জানতাম।
পোস্টমর্টেমের সিদ্ধান্ত হল ক্রিস আত্মহত্যাই করেছে। তার অস্থায়ী উন্মাদনার সময় তার বন্ধুরা তার পাশে এসে দাঁড়ায়নি। তাকে বোঝায়নি। ক্যাম্প রিপোর্ট জানাল একটা তাস এবং রিভলবারের লোভে উদয় চৌধুরী তার প্রিয় বন্ধুর আত্মহত্যা নির্দ্বিধায় বরদাস্ত করেছে।
যুদ্ধ শেষ হতেই উদয় স্বেচ্ছায় অবসর চাইল। ডাক্তারের সার্টিফিকেটে দেখাল মেন্টাল ইনস্ট্যাবিলিটির। জমা টাকা তুলতে গিয়ে উদয় ক্রিসের বাজেয়াপ্ত রিভলবারটার খোঁজ করল। ওটা ক্রিসের নিজস্ব অস্ত্র ছিল। বেআইনিভাবে রাখা। নিজের সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র একে একে সারেণ্ডার করার পর উদয় যখন রিভলবারটার জন্য অ্যাপ্লিকেশন লিখল তখন ক্যাপ্টেন এগার্ট বললেন, তোমার ডক্টরস সার্টিফিকেটের ব্যাকগ্রাউণ্ডে, আমি তোমায় আর আইনত এই অস্ত্র দিতে পারি না। তবে বন্ধুর একটা উপহারের থেকেও আমি তোমায় বঞ্চিত করব না। আমি জিনিসটা হারিয়ে গেছে বলে রেকর্ড বুকে দেখাব। আর আমার অনুরোধ তুমিও এই যন্ত্র আর কোনোদিন কাজে লাগাবে না, একটা স্মৃতি হিসেবেইই রেখো। বাট বি কেয়ারফুল।
তার চার বছরের মধ্যে একবারও উদয় ওর ট্রাঙ্ক খুলে জিনিসটা দেখেনি। ১৯৪৮ এর ৩০ জানুয়ারির সকালটায় নেহাতই দুর্ঘটনার মতন তাস এবং রিভলবারটা বেরিয়ে পড়ল। উদয়ের যেসব কোল্ট টোটা ছিল সেগুলোও যে কেন ও ক্যাপ্টেনের কাছে সারেণ্ডার করেনি সেটা ভেবেও অবাক হয়ে গেল। নিজের রিভলবারটা দিয়েও কেন সেদিন গুলিগুলো দেয়নি? চকিতে ওর মনে পড়ল ক্রিসের কথা। ভাগ্য খুব রহস্যময়। তার আনন্দ এবং দুঃখ দেবার পথও রহস্যে ঢাকা। না হলে এতদিন পরই বা ওর গুলির কথা মনে আসবে কেন? এতকাল তো ও জানত ওর কেবল রিভলবারটাই আছে।
ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে দেখতে উদয়ের মনে হল যে, মারণাস্ত্রেরও একটা নিজস্ব প্রাণ আছে। একটা চরিত্র আছে। যে প্রাণ, যে চরিত্র সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই একেক সময় মানুষের ভাগ্য স্থির করে। সেই পর্যায়ে কোনো অস্ত্র এসে পৌঁছেলে একটা মানুষ তখন নিতান্তই যন্ত্র। সে তখন যন্ত্রের মতোই একটা মারাত্মক প্রাণীকে ব্যবহার করে।
একবার অন্তত ক্রিসের খেলাটা খেলার ইচ্ছে হল উদয়ের। নিজেকে বাজি রেখে নয়। অথচ ওর প্রিয়জন বলতে বিশ্বসংসারে কে-ই বা আছে? অন্তত সেরকম কেউ নেই। এক স্কুলের বন্ধু ছিল। কিন্তু সেও তো বহু দিন ধরে সুখী গৃহস্থ। তাকে মেরে একটা সংসার নষ্ট করার ইচ্ছা ওর হওয়া কঠিন। তা ছাড়া একটা ঘৃণ্য খুনি হওয়ার চেয়ে আত্মহনন শ্রেয়। অথবা…অথবা, তার চেয়েও শ্ৰেয় কাজ কাউকে ভালোবেসেই হত্যা করা। যে হত্যা সম্ভবত নিহত মানুষটিকে অনেক বড়ো গৌরব এনে দেবে। সম্ভবত তাঁকে শহিদের বেদিতে বসাবে।
যে মৃত্যুর ফলে তিনি বৃহত্তর এক শক্তি হিসেবে সমাজে কাজ করবেন। উদয়ের মনে পড়ল গান্ধীজিকে। সেদিনের কাগজেই গান্ধীজির ছবিটা হাসি হাসি মুখ করে জ্বলছে। হাজারো সমস্যা, অশান্তি এবং অঘটনের মাঝখানেও সে হাসিটুকু অম্লান আছে। তাস বার করে গান্ধীজির নামেই বাজি ধরল। রং নিল রুহিতন। কারণ ওর ধারণা রুহিতন চাইলেই আসে না। এভাবেও অন্তত গান্ধীর হত্যা এড়ানো যেতে পারে।
বার বার শাফল করে তিন-তিনটে তাস চোখ বুজে টানল উদয় চৌধুরী। এবং চোখ মেলে দেখল তিনটে তাসই রুহিতন।
একটা তীব্র বিদ্যুৎ খেলে গেল উদয়ের গোটা শরীরে। কিন্তু সে নিরুপায়। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল সকাল সাতটা। চটপট করে সে দাড়ি কামাল, তারপর বহুক্ষণ ধরে তার জীবনের সেরা লাক্সারি সেই স্নানটুকু শেষ করল। ততক্ষণে ওর মনে হতে শুরু করেছে এই বুঝি তার শেষ স্নান। বিড়লা হাউসে সে যদি ধরা পড়ে তবে তার ফাঁসি নির্ঘাৎ। কাল হয়তো খবরের কাগজে গান্ধীজির সঙ্গে ওর নিজের ছবিই বেরুবে। কোটি কোটি লোককে কাঁদিয়ে সে একজনকে অমর করবে আজ বিকেলে। ভাগ্যবিধাতাই সেটা নির্ধারণ করে রেখেছেন, নতুবা পর পর তিন টানেই রুহিতন উঠল কোন নিয়মে? একসময় সহসা উদয়ের মনে হল হয়তো স্বয়ং ঈশ্বরই চান এইভাবে গান্ধীকে মানুষের মাঝখানে ব্যাপ্ত করে দিতে। এবং সেই কাজের জন্যই তিনি নির্বাচন করেছেন উদয় চৌধুরীকে।
উদয় যেটুকু রাজনীতি বোঝে তাতে ওর গান্ধীজির ওপর অগাধ শ্রদ্ধা। বাঙালি হিসেবে যেটুকু রাগ ওর হয়েছিল তার সবটাই ধুয়ে মুছে গেছে গান্ধীজির নোয়াখালি অভিযানের পর। অথচ এতখানি শ্রদ্ধা নিয়ে কি কাউকে আঘাত করা যায়? পুরো ব্যাপারটা ক্রমশ ওর কাছে একটা মার্সি কিলিং-এর মতন ঠেকল। এবং সেই করুণার সূত্রে অমোঘ এবং করণীয়।
