হঠাৎ দরজায় ধাক্কা আর মাদাম কাসের হাঁক, রাজীব! রাজীব! টেলিফোন!
আমার রক্ত ফের জমে বরফ হচ্ছে। আমি জানি এ ফোন কার। আমি জানি এবার ও আমায় কোথায় যেতে বলবে। এবার গেলে যে আমি ফের আসতে পারব তারও নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু তাও যেন যাওয়ার জন্য বাসনা জাগছে ভেতরে। শরীর ফের উষ্ণ হচ্ছে, মাথায় একটা ঘোর সৃষ্টি হচ্ছে। আমি চোখে মুখে সামান্য জল ছিটোতে ছিটোতে চেঁচিয়ে বললাম, যাচ্ছি, মাদাম কামঁস!
যখন দরজা ঠেলে বেরুলাম, দেখি দরজার পাশেই মাদাম গম্ভীর মুখ করে দাঁড়িয়ে। আমি এগোতে যাব, হঠাৎ আমার হাত চেপে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, রাজীব, ফোনের ওই মেয়েটির গলা আমি চিনি। মনে হয় বেশ্যা। ওর পাল্লায় পড়ে তোমার ঘরেরই আগের বাসিন্দা পিটার মাথা খারাপ হয়ে হাসপাতালে। ও-ও একদিন ফিরে এসেছিল এই তোমার মতন চেহারা করে। তখন বুঝিনি ও কোন পথে গেছে। তারপর একদিন নতুন ব্রিজের মাঝখানে ওকে আধমরা অবস্থায় পাওয়া গেল। সেই থেকে হাসপাতালে।
মাদামের কথাগুলো ভীষণ খাঁটি বলে মনে হল, কিন্তু আমার ভেতর থেকে প্রবল প্রতিরোধ ওই উপদেশ মেনে নেওয়ার বিরুদ্ধে। আমি আস্তে আস্তে কাউন্টারে এসে ফোনটা তুলে নিলাম আর খুব আদরের স্বরে বললাম, হ্যালো!
আর ওপারে সেই প্রিয়, পরিচিত খিলখিল হাসি আর প্রশ্ন, ক্যারান্ত এ আঁ? আমার মনে হল, এই কণ্ঠস্বরটির জন্য আমি মরতেও প্রস্তুত আছি।
গান্ধীর আততায়ী
বেয়াল্লিশ বছর বয়সি উদয় চৌধুরী আজকের খেলাটা আগে মাত্র একবারই খেলেছে। সেই খেলার দিনটা আজ ইতিহাস হয়ে গেছে। ৩০শে জানুয়ারির ওই ভোরবেলায় পুরোনো ট্রাঙ্কের কী না কী ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ ক্রিস হারডিকের ছবিটা বেরিয়ে পড়েছিল। সেইসঙ্গে ক্রিসের উপহার এক প্যাকেট তাস আর একটা রিভলবার। রিভলবারটায় টোটা ভরা ছিল না। পাশের এক কৌটোয় গুলিগুলো ছিল। টোটাগুলো খুঁজতে গিয়েই উদয়ের ভারি লোভ হল ক্রিসের শেখানো খেলাটা খেলে দেখে। ক্রিসের বক্তব্য ছিল যে, হয় ভয়ংকর দুঃখ অথবা ভয়ানক আনন্দের দিনগুলোতে মানুষের উচিত নিজের সঙ্গে একবার লড়ে নেওয়া। যে ভাগ্যের জটিল পথে দুঃখ কিংবা আনন্দ আসে সেই ভাগ্যকেই সাক্ষী মেনে নিজের বিরুদ্ধে নিজেকে দাঁড়াতে হয়। একটা টোটা ভরে নিতে হয় রিভলবারে। তারপর তাসের প্যাকেট চোখ বুজে শাফল করে তিনটে তাস বার করে নিতে হয়। বলতে হয় এই রংটা উঠলে আমার মৃত্যু হবে। আর সত্যি সত্যি যদি সেই রং উঠে আসে হাতে তুমি জানবে গুলিটা তোমার নিজের খুলির জন্যই ভরা হয়েছিল। নিয়তি তোমাকে চায়।
যেদিন ক্রিস এই খেলাটা শেখায় উদয়কে ঠিক সেদিনই ওদের মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টে একটা চিঠি এসেছিল। তাদের প্রথম পরিচয়ের সাত বছর পর লিজা ক্রিসকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। বড়ো ঘরের মেয়ে, পাবলিক স্কুলে পড়া মেয়ে লিজার সঙ্গে ক্রিসের আলাপ নেহাতই আকস্মিকভাবে। একটা ফুটবল গ্রাউণ্ডে। সদ্য স্কুল-পাস করা ক্রিস বিয়ের জন্য উন্মাদ হয়ে উঠল। ভুলে গেল তার জন্ম লিভারপুলের এক শ্রমিকের ঘরে। আর লিজা কিছুটা লতায়-পাতায় এক পড়ন্ত ব্যারন ফ্যামিলির কন্যা। লিজা নিজেই এই ব্যবধানটাকে খুবই বড়ো বলে জানত। ওর অভিভাবকরা তো নিশ্চয়ই। প্রেমের বিষম দংশনে উন্মত্তপ্রায় ক্রিস প্রথম খেলেছিল এই টোটা-তাসের খেলা। তাও তিন তিন বার। কিন্তু একবারও ওর মৃত্যুর রংটা উঠল না। ভীষণ মনমরা হয়ে ক্রিস যুদ্ধে চলে গেল।
তারপর সাত বছর ধরে এখানে-ওখানে বাহিনীর সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছে ক্রিস। যেখানেই গেছে সুবিধেমত চিঠি দিয়েছে লিজাকে। কিন্তু কখনো বিয়ের প্রস্তাব দেয়নি। ইচ্ছে হলে কখনো কখনো ওর গভীর ভালোবাসা নিবেদন করেছে। অতএব সেদিন যখন ক্যান্টনমেন্টে লিজার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে রঙিন খামটা এল, ভয়ংকর উত্তেজনা এবং আনন্দের জোরে ক্রিস ঠিক করল যে, ওর পুরোনো খেলাটা ফের খেলবে। এতখানি অবাক উদয় তার আগে কখনও হয়নি। ছেলেটা কি পাগল? এরকম সুসংবাদ পেয়ে কেউ কি নিজের ভাগ্য নিয়ে জুয়া খেলে? দৈবাৎ যদি মৃত্যুর রং ওঠে!
সেদিন সন্ধ্যায় ক্রিসের কপালে মৃত্যুর হরতন উঠল। ক্রিস ওর মৃত্যুর রং দিয়েছিল হরতন। কারণ হরতনে মৃত্যু এবং ভালোবাসা একই সঙ্গে থাকে। খেলার শেষে রিভলবারে টোটা ভরতে ভরতে এক গেলাস রাম খেল ক্রিস। তারপর তাসের প্যাকেটটা উদয়কে দিয়ে বলল, আমার এই উপহারটা রইল। কোনো না কোনোদিন হয়তো তোমারও কাজে লাগবে। তবে যেদিনই খেল, খেলার সম্মানটুকু রেখো। জানি, নিজেকে খুন করা খুব কঠিন। সেক্ষেত্রে নিজের প্রিয়তম কোনো কিছুর ওপর বাজি ধরতে পার।
ক্রিসের কথাটায় উদয় চমকে উঠল। নিজের প্রিয়জনের জীবনের ওপর কেউ কি বাজি ধরে? আর সেখানেও যদি ভয়ংকর রংটাই উঠে আসে? সে তো আত্মহত্যার চেয়েও মারাত্মক ব্যাপার। এসব কথা ভাবতে ভাবতেই উদয় কোনো একসময় ক্রিসের হাত থেকে তাসের প্যাকেটটা তুলে নিল। তারপর ছয় ঘোড়ার কোল্টটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওটা?
আমার লাশের পাশে ওটা পড়ে থাকবে। তুমি ক্যাপ্টেনকে বলে নিয়ে নিয়ো। আমি তোমাকেই দিলাম ওটা। আমার পোস্টমর্টেম রিপোর্টের সঙ্গে আমার একটা চিঠি তুমি লিজাকে পাঠিয়ে দিয়ে। সম্ভবত রিপোর্টে বলবে টেম্পোরারি ইনস্যানিটি। তুমি কিন্তু আসল কথাটা লিখবে ওকে। যে কথা আমিও চিঠিতে লিখেছি।
