দুপুরের খাওয়ার আগে উদয় গান্ধীজির ফটোতে মালা-চন্দন পরাল। নিজের বেসুরো গলায় একটা ভজন গাইল। তারপর খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বইয়ের তাক থেকে হাউ টু কমিট আ পারফেক্ট মার্ডার থ্রিলারটা নিয়ে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ল। যখন ঘুম ভাঙল তখন বেলা তিনটে। পলসনের কৌটো ভেঙে কফি বানাতে বানাতে উদয়ের মনে পড়ল ওর ছোটোবেলার প্রেমিকা পৃথাকে। খানিকক্ষণ ওর কথা ভাবতেই উদয়ের একটা ঘোর সৃষ্টি হল মনে। পৃথা এবং ওর স্বামী কালকের কাগজ পড়ে কী ভাববে? সারাজীবন ধরে উদয়ের যে একটা সাড়া জাগানো কান্ড করার ইচ্ছে ছিল এই বুঝি সেই সাড়া জাগানো মহাকাজ!
রিভলবারে তিনটে টোটা ভরল উদয়। পকেটে দুটো সিগারেট নিল রাস্তায় ফুকতে ফুকতে যাবে। দিল্লিতে শীত বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। ট্যাক্সি ডেকে যখন উদয় বিড়লা হাউস নামটা উচ্চারণ করল তখন ওর চোখের সামনে ভাসছে ক্রিসের মৃতদেহের ছবিটা। ভীষণ ইচ্ছে হল ওর ট্যাক্সি ছেড়ে উলটোদিকে দৌড় লাগায়। একসময় দরজার হাতলেও হাত রাখল। অমনি ড্রাইভার গর্জে উঠল, দরওয়াজা মৎ খিচিয়ে সাব! উদয় চোরের মতন হাত গুটিয়ে নিল।
বিড়লা হাউসের অনেক দূরেই গাড়ি থামল। তখন বেলা চারটে পঞ্চাশ। উদয়ের ধারণা ছিল গেটে পাহারাদাররা তার সমস্ত শরীর সার্চ করবে। তাই রিভলভারটা সে ধুতির কোঁচায় এঁটেছিল। এমনিতে উদয় প্যান্ট-শার্টই পরে। কিন্তু প্যান্ট-শার্টে বন্দুক লুকোনো মুশকিল। এ ছাড়া কিছুদিন ধরেই গান্ধীজিকে হত্যা করার একটা চক্রান্ত চলছে কোনো এক বিশেষ মহলে। তাই পাহারাদারিও খুব কড়া পর্যায়ের হচ্ছিল। অথচ সেদিন বিকেলে উদয়কে কেউই কিন্তু কোনোরকম জিজ্ঞাসাবাদ বা সার্চ-টার্চ কিছুই করল না। ভিড়ের সঙ্গে উদয় বিড়লা হাউসের বাগানে গিয়ে হাজির হল। সেখানে মহাত্মাজির জন্য একটা ডায়াসও বানানো হয়েছে। উদয় যতখানি পারল তার কাছে যাবার চেষ্টা করল। কারণ বহুকাল সে আর রিভলবার ব্যবহার করেনি। টিপটা আর আগের মতন নেই বলেই ওর ধারণা।
বিকেল পাঁচটায় গান্ধীজির প্রার্থনাসভায় আসার কথা অথচ পাঁচটা দশ বেজে যেতেও তাঁর দর্শন পাওয়া গেল না। উদয়ের ভয় হল, গান্ধীজি বুঝি অসুস্থ। না হলে ওঁর মতন সময়ানুবর্তী মানুষের তো এরকম দেরি হওয়ার কথা নয়। ওর একটু সন্দেহও হল, এই বুঝি পুলিশ এসে প্রত্যেককে আপাদমস্তক সার্চ করতে শুরু করে। উদয়ের ইচ্ছে ছিল গান্ধীজি প্রার্থনাসভা শুরু করলে সবাই যখন চোখ বুজে মন্ত্র আওড়াবে ঠিক সে-সময় এক মওকায় গুলিটা ছুড়বে। ভয়ের ভাবটা ঝেড়ে ফেলতে উদয় ইতি-উতি চাইতে থাকল। এবং ওর নজরে পড়ল পৃথার বৃদ্ধ বাবা অবসরপ্রাপ্ত জজ ব্রজেন্দ্রনাথ সান্যালকে। যাঁর পাশে তখন তৃতীয় স্ত্রী আবেদা খাতুন। বসে ঝিমুচ্ছেন। দপ করে জ্বলে উঠল উদয়ের মাথাটা। প্রচন্ড ইচ্ছে হল ওর জীবনের সমস্ত বিপন্নতা এবং দুঃখের মূল ওই ব্ৰজেন সান্যালের মাথার খুলিটা উড়িয়ে দেয়। পৃথার পাণিপ্রার্থী হয়ে যে চরম অপমান পেয়েছিল উদয় ব্রজেন সান্যালের কাছে তা এখনও ওকে থেকে থেকে সাপের ছোবলের মতন দংশন করে। রাগের চেয়েও অনেক বেশি ঘৃণা লুকিয়ে আছে উদয়ের মনে ওই বিশেষ অধ্যায়টির ব্যাপারে।
নিজের গায়ে অসম্ভব জোরে একটা চিমটি কেটে রাগ সংবরণ করল উদয়। আজ হেলাফেলার দিন না। আজ ওর একটা মিশন আছে। নরকের কীটপতঙ্গকে গুলি করে সে কাজ ভেস্তে দেওয়া যায় না। ঘড়িতে যখন পাঁচটা তেরো তখন কিছুটা আশ্বস্ত হল উদয়। ইতিমধ্যে একটা শোরগোল শুনতে পেল সে। বিড়লা হাউসের বুগেনভিলিয়ার আচ্ছাদনের সড়ক দিয়ে না এসে সটান লনের ওপর দিয়েই গান্ধীজি আসতে শুরু করেছেন। তাঁর দুই হাত আভা এবং মানুর কাঁধে ছড়ানো। মানুর হাতে একটা পিকদানি, মহাত্মাজির চশমা এবং সেদিনের তৈরি তাঁর বক্তৃতার কাগজপত্র। দুই মহিলার কাঁধে ভর করে গান্ধীজি যতখানি সম্ভব এস্ত পায়ে আসছেন। দেরি করিয়ে দিয়েছে বলে ক্রমাগত বকছেন তাঁদের। জীবনে গান্ধীজি এই দেরি করাটাই সবচেয়ে ঘৃণা করেছেন। বলছেন, তোমরাই না আমার ঘড়ি। তোমরাই তো আমায় মনে করিয়ে দেবে সময় কত। জানো না, আমি প্রার্থনায় দেরি করা সহ্য করতে পারি না?
গান্ধীজি তখনও বকে চলেছেন যখন তিনি প্রার্থনাসভায় ঢোকার চার ধাপ সিঁড়ির গোড়ায়। গান্ধীজির মাথায় তখন ডুবন্ত সূর্যের শেষ রশ্মিটুকু ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি মেয়েদের কাঁধ থেকে হাত তুলে জনতাকে নমস্কার জানালেন। তারপর যখন সিঁড়ির মাথায় গিয়ে দাঁড়ালেন তখন…তখন উদয়ের মনে হল সে একটা স্বপ্ন দেখছে। না, এ হতে পারে না। উদয় তার রিভলবারের জায়গাটায় হাত দিয়ে দেখল সেটা যথাস্থানেই আছে। কোনো অনিয়ম হয়নি সেখানে। অথচ স্পষ্ট শুনল তিন তিনটে গুলির আওয়াজ। তিনটে আওয়াজই ওর নাড়ি ভেদ করে শরীরের অভ্যন্তরে চলে গেছে। মনে হল ওই গুলিগুলো কেউ ওকেই তাক করে মেরেছে। উদয় উদভ্রান্তের মতো গান্ধীজির দিকে ছুটে গেল। তখন ‘হে রাম’ বলে বুকে রক্তমাখা গান্ধীজি মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন। মানু তাঁর পিকদানি আর বক্তৃতার কাগজগুলো অন্ধের মতো মাটিতে হাতড়াচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য উদয় একটা খাকি জামা পরা রোগাটে লোককে দেখতে পেল। উদয়ের নজরে পড়ল লোকটার হাতের ‘বোর’ পিস্তলটাও। তারপর সবটাই অন্ধকার দেখল উদয় চৌধুরী।
