আমি মাথা না ঘুরিয়েও টের পাচ্ছিলাম এ গলা কার। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না রাগব না কাঁদব। নাকি সপাটে একটা থাপ্পড় কষিয়ে দেব মেয়েটির গালে। কিন্তু না, আমি কিছুই করলাম না, কারণ আমার শরীর ভয়ে কাঠ হয়ে আসছে। এত দ্রুত যে মেয়ে আমার পিছু নিতে পারে এই সন্ধের অন্ধকারে, তার মাথায় কিছু জটিল মতলব আছে। সে সহসা নিস্তার দেবে না আমাকে। আমি রেলিং ছেড়ে শরীরটাকে সোজা করবার চেষ্টা করলাম।
কিন্তু তার আগেই মেয়েটি আমার মুখটা ওর বুকের মধ্যে ঠেসে ধরে আমার মাথায় চুমুর আদর দিতে লেগেছে। ওর হাতের ও মুখের স্পর্শ ওর কালো সোয়েটারের চেয়েও উষ্ণ। তার চেয়েও উষ্ণ আমার মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়া ওর নিঃশ্বাস। আমার মনে হল, ওই ভালোবাসায়-ভরাডুবি বুকে মাথা রেখে আমার মৃত্যু হলেই ভালো হয়। এই আলিঙ্গন থেকে কোনোদিন যেন আমার মুক্তি না হয়। আনন্দে, সোহাগে সম্পৃক্ত আমি এই অযাচিত, অকল্পনীয় ভালোবাসায় ভেতরে ভেতরে এতটাই দ্রব হয়ে উঠলাম যে, আমার চোখ বেয়ে দু ফোঁটা জলও গড়িয়ে পড়ল। আমি বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে কেবলই বলতে থাকলাম, আমি আর তোমার নাম জানতে চাই না, প্রিয়তমা। কোনোদিনও জানতে চাইব না। তুমি শুধু আমায় ছেড়ে যেয়ো না কোনদিন।
এবার মেয়েটি আমার মুখটা তুলে ধরল ওর মুখের দিকে আর গভীরভাবে তাকাল আমার চোখের দিকে। আমার চোখের জল গিয়ে লেগেছিল আমার চশমায়, কিন্তু সেই ভিজে কাচের মধ্যে দিয়েও আমি দেখতে পেলাম, মেয়েটি কাঁদছে। দু-টি অশ্রুর ফোঁটা টলটল করছে ওর চোখের কোণে আর এক অব্যক্ত বেদনায় কুঁকড়ে উঠছে ওর পরম সুন্দর মুখটি। আমার নামও জানে না ও, তাই অস্ফুট স্বরে শুধু আমায় ডাকছে, ‘ক্যারন্ত এ আঁ! জ্য তেম। ক্যারন্ত এ আঁ! জ্য তেম।’ ‘একচল্লিশ! আমি তোমায় ভালবাসি।’ আমার কিন্তু মুখ দিয়ে আর কোনো কথা সরছে না, যা বলতে চাই সবই যেন নিরর্থক হয়ে যাচ্ছে, সবই কীরকম বরফ হয়ে গলার মধ্যে খকখক করছে। আমি ফের মুখ ঘসতে লাগলাম ওর মুখে, আমার ডান হাত দিয়ে অনুভব করতে লাগলাম ওর স্তন, তারপর ক্লান্ত শিশুর মতো ঢলে পড়লাম ওর কোলে।
একটু বাদে যেন গলার জমা বরফ আরও জমে উঠে পাথর হতে লাগল। বাকরুদ্ধ নই শুধু, আমি ক্রমশ যেন শ্বাসরুদ্ধও হচ্ছি। আমি মাথা ঝাড়া দিয়ে সোজা হয়ে উঠতে গিয়ে অনুভব করলাম দুটো শক্ত হাত আমার গলায় বসে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। আমি আতঙ্কে চোখ মেলে দেখতে পেলাম সে হাত কার, কিন্তু চোখের সামনে সেই সুন্দর বেদনাকম্পিত মুখটাই দেখলাম। শুধু একটা সামান্য হাসির ঝিলিক যেন ওই দুঃখী মুখে। আমি হাত দিয়ে গলার হাত দুটিকে জোর করে ছাড়াতে চেষ্টা করতেই সুন্দরীর হাসি আরও পরিষ্কার ভাবে ফুটে উঠল ঠোঁটে। চোখের জলটাও যেন কখন উবে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিয়েছে একটা কঠিন, নির্মম আক্রোশ। আমি আরও জোরে চাপ দিলাম গলার হাত দুটোয়, কারণ আমার সমস্ত দমই প্রায় শেষ হতে চলেছে। আমার হাতের চাপে মেয়েটির হাত সরে গেল ঠিকই, কিন্তু সেই মুখে ওর চোখের কোটর থেকে মণি দুটোও কীভাবেই জানি অন্তর্হিত হল। একটি অনুপম সুন্দর মুখে কোনো চোখ নেই! —এই সুরিয়ালিস্ট দৃশ্য যে জীবনে কখনো দেখতে পাব এ আমার সমস্ত কল্পনার অতীত! আমি আমার ক্লান্ত, বিধ্বস্ত মনটাকে নিঙড়ে কোনো মতে একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম, কে? কে তুমি? বলো তুমি কে? এই কথার সঙ্গে সঙ্গে আমার অবসন্ন হাত দুটোও এগিয়ে গেল রূপসীর গলার দিকে। আমি সজোরে চেপে ধরলাম ওর সরু, নরম সুন্দর গ্রীবা। আমার আকাঙ্ক্ষা হল ওর গলা সেভাবেই কিছুক্ষণ টিপে ধরি যেভাবে এতক্ষণ ও টিপে রেখে ছিল আমার কণ্ঠ। কিন্তু ওই পর্যন্ত! ওর গলা স্পর্শ করামাত্রই ওর সুন্দর দাঁতের পাটি হাসিতে জ্বলে উঠল। তারপর সেই হাসি ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে লাগল গোটা মুখে, যেন কঙ্কালের হাস্য। সেই খিলখিলে আওয়াজটা ফিরে এল কণ্ঠে, এবং আমি যত চাপ দিতে থাকলাম ততই উচ্চতরালে হতে থাকল ওই হাসি। কতক্ষণ এভাবে চেপে ধরেছিলাম ওর গলা আমার স্মরণ নেই। শুধু এটুকুই অনুভব করেছিলাম যে মেয়েটি ক্রমশ রেলিং ভেদ করে পিছিয়ে যাচ্ছে জলের দিকে এবং সেই সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছি আমি। রেলিং থাকতেও ওর শরীর ওপারে নদীর মধ্যে ঢলে গেল এক সময়, রেলিঙে বাঁধা পড়ল আমার শরীর। আমার দুটো হাটু মাথা রেলিঙের ওপর, আরেকটু এগোলেই গোটা শরীরটা তলিয়ে যেতে পারত। কিন্তু গেল না।
আমি হোস্টেলে ফিরে এসে লিফটের দিকে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ মাদাম কার্মস আমায় জিজ্ঞেস করলেন, খুব রূঢ় কণ্ঠে, আবার নিশ্চয়ই খুব নেশা করে ফিরছ, রাজীব? এভাবে কি পড়াশুনো হবে তোমার?
মাদাম কার্মস আমার অভিভাবিকা নন যে এমন সুরে কথা কইতে পারেন। কিন্তু তাহলেও আমি কোনো প্রতিবাদ করার প্রয়োজন বোধ করলাম না। শুধু জিজ্ঞেস করলাম, কেন আমাকে কি খুব রুখুসুখু লাগছে? মাদাম ফের ঝাঁঝের মাথায় বললেন, সেটা বললে কমই বলা হয়। তোমার দেখে মনে হচ্ছে বার্বেসের কোনো বেশ্যার বিছানা থেকে উঠে আসছ।
মাদামের এই কথাটা শেলের মতন বিধল বুকে। আমি লিফটে না উঠে একতলার টয়লেটে ঢুকে পড়লাম আর বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেলাম। আমারসারা মুখে ও জামার কলারে লিপস্টিকের ছোপ। গলায় দু-তিনটে কালশিরের দাগ। চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে কোটর থেকে। ঠোঁটের এক পাশে খানিকটা ছড়ে গিয়েছে। চুল উশকোখুশকো আর বুকের কাছে দুটো বোম ছেড়া। কীভাবে, কী কাজে এমনটা হয় সে প্রশ্ন তোলারও অবকাশ নেই। নিজেকে দেখে নিজেরই করুণা হচ্ছে।
