দু-চুমুক ওয়াইন পেটে পড়তেই নিজেকে খুব সুখী-সুখী লাগছিল। ভুলেই যাচ্ছিলাম আমি কেন এখানে এসেছি। হঠাৎ পাশের টেবিল থেকে একটা খিলখিলে হাসি। আমি চমকে উঠে চোখ ফিরিয়ে দেখলাম, গোলাপি গাউন-পরা এক সদ্য যুবতী তার পাশের ছেলেটির সঙ্গে হাত-মুখ নেড়ে ঢলে ঢলে কথা কইছে। একবার ভাবলাম গলাটা সেই ফোনের গলা নয়তো? তারপরেই ভাবলাম, ধুস। সে মেয়ে পুরুষের সঙ্গে বসে থাকবে কেন?
আমি আবার ঝিম মেরে বসলাম। এবার হঠাৎ চোখ পড়ল একটি নিঃসঙ্গ মেয়ের দিকে। কালো সোয়েটার পরে একমনে সিগারেট টানছে আর আগুনের খেলা দেখছে। আমার ঘোর সন্দেহ হল এই মেয়েই হয়তো সেই মেয়ে। আমি উঠে গিয়ে তার পাশে দাঁড়ালাম, যেমন খদ্দেরের পাশে নিঃশব্দে দাঁড়ায় ভালো ওয়েটার। মেয়েটা কিন্তু একমনে জাদুকরের কান্ড দেখে যাচ্ছে। জাদুকর ভুক ভুক করে আগুন খাচ্ছে আর হাঁ করে সেই আগুন ছুড়ে দিচ্ছে শূন্যে। আমি শুধু দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ভাবছি মেয়েটিকে কী নামে সম্বোধন করি। মেয়েটিও দেখি কিছুতেই মুখ ফিরিয়ে তাকাচ্ছে না আমার দিকে। আমি শেষে একটা দুটো ঢোক গিলে বললাম, ক্যারন্ত এ আঁ।
মেয়েটি এবার মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল বটে কিন্তু সেই চাহনির কোনোই মানে নেই। স্পষ্ট বুঝলাম আমার ছুড়ে দেওয়া কথাটার কোনো মানেই দাঁড়ায়নি তার কাছে। তখন তাড়াতাড়ি বললাম, পারদোঁ মাদমোয়াজেল, জে এম্পে। অর্থাৎ, সরি ম্যাডাম, ভুল করে ফেলেছি।
ফের এসে নিজের জায়গায় বসলাম আর একটু বিষণ্ণও বোধ করলাম। কোন এক পাগলির টেলিফোন শুনে কী ঝঞ্ঝাটেই না পড়েছি। ফের চুমুক দিলাম ওয়াইনে আর নতুন একটা সিগারেট ধরানোর উপক্রম করলাম। হঠাৎ আমার কানের পাশেই সেই আধাপরিচিত খিল খিল হাসি আর নীচু স্বরে ডাক, ক্যারন্ত এ আঁ?
আমি ঘাড় ঘোরাতেই দেখতে পেলাম কালো সোয়েটার আর সাদা স্কার্ট-পরা সেই মেয়েটাকেই, যে একটু আগে আমার ডাক শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল আমার দিকে। আমি ভয়ানক অবাক বোধ করে প্রায় তোলাতে তোলাতে বললাম, তুতু–তুমি? মেয়েটি হাসতে হাসতে বলল, হ্যাঁ, আমি বুন্ধুরাম।
-তা তখন ওরকম হাবাগোবার ভাব করলে কেন?
–দেখছিলাম তোমার মনের কতটা জোর। ভড়কে যাও কি না।
—তা ভড়কে তো একটু গেছিলামই। যাক গে, তুমিও তো আমায় চিনতে পারোনি।
—কে বললে চিনতে পারিনি? চিনতে পেরেছি বলেই তো না-চেনার ভাব করছিলাম।
এবার আমি সত্যি সত্যি দমে গিয়ে বললাম, ও! মেয়েটি তখন ওর ডান হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, হাতটা ধরে অন্তত বসতে তো বলো। কতক্ষণ আর এভাবে দাঁড়িয়ে থাকব?
খুব লজ্জা পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ওর হাত ধরে পাশের চেয়ারে বসলাম। আর জিজ্ঞেস করলাম, কী পানীয় নেবে মাই ডিয়ার? মেয়েটি আমার সাদা ওয়াইনের গেলাসের দিকে তাকিয়ে বলল ওইটা। আমি ওয়েটারকে ডেকে আরও একটা সাদা ওয়াইনের অর্ডার দিলাম। তারপর টেবিলের ওপর আলতো করে রাখা ওর হাতটার উপর আমার হাতটা পেতে বললাম, এবার তোমার নাম জানতে পারি কি, প্রিয়তমা?
সঙ্গে সঙ্গে ফের সেই বিদ্রুপাত্মক খিলখিলে হাসি। এবার লজ্জা নয়, রাগই হল আমার। আমি ওর হাতটা সজোরে চেপে ধরে বললাম, তোমার ব্যাপারটা কী বলো তো? এভাবে দু জনে দু-জনের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত থেকে গেলে কি কোনো বন্ধুত্ব হতে পারে? আর কেনই বা প্রয়োজন তেমন বন্ধুত্বর।
মেয়েটি আমার হাতের তলা থেকে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে আমার মুখের ওপর চাপা দিয়ে বলল, শ-শ-শ। চুপ! এত রাগ করার কী আছে। নাম বলার কি সময় পার হয়ে গেছে? বরং তোমার নামটাই বলো আমাকে।
আমি রাগে গজরাতে গজরাতে বললাম, আমার নাম ‘ক্যারান্ত এ আ’। আর অমনি উচ্চতরালে হাসতে লাগল মেয়েটি। রাগ আমারও একটু একটু চড়ছিল আর হঠাৎ তা এমনই বিশ্রী পর্যায়ে উঠে গেল যে ওয়েটার যখন ওয়াইন নিয়ে টেবিলে এল, আমি একটা দশ ফ্রাঁ-র নোট তার প্লেটে ছুড়ে দিয়ে খুব রূঢ় একটা মের্সি’ অর্থাৎ ধন্যবাদ মেয়েটিকে উপহার দিয়ে প্রচন্ড জোরে পা চালিয়ে কাফের থেকে বেরিয়ে গেলাম। তারপর সেই অদ্ভুত গতিতে হাঁটতে থাকলাম নদীর দিকে। মাথাটা আমার অসম্ভব গরম হয়ে উঠেছে, নদীর পাশে না গেলে তা আর ঠাণ্ডা হওয়ার উপায় নেই। নাম-না-জানা এই উটকো মেয়েটিকে আমার এখন একটি বেশ্যা বলেই মনে হচ্ছে।
আমি জোরে হাঁটলে সেটা সত্যিই খুব জোরে হাঁটা হয়। বড় অল্প সময়েই তখন গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাই। এক্ষেত্রেও হাঁটার স্পিড এত অস্বাভাবিক বেশি হয়ে গিয়েছিল যে নিজে ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই দেখি স্যেন নদীর উপর প ন্যফ বা নতুন ব্রিজের গোড়ায় চলে এসেছি। আমার সম্বিৎ ফিরে এল নদীর ওপারে আলোর মালা, নদীর কালো জলে প্রতিফলিত আলোর সারি, একটুকরো চাঁদ আর নদীর দূর কোণ থেকে ভেসে আসা স্টিমারের যান্ত্রিক ধ্বনিতে। নদীর পাশে বা নদীর ওপর সেতুতে দাঁড়িয়ে আমি কখনো রাগী থাকতে পারি না। নদীর জল আমার রাগ গলিয়ে জল করে দেয়। হঠাৎ নিজের শরীরটা বেশ হালকা বোধ হল, আমি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে সেতুর রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। আর ঠিক তক্ষুনি আমার কানের পাশে বেজে উঠল ফের সেই ধ্বনি, তুমি রাগ করেছ সোনা?
