আজ কিন্তু এই নিয়ে তিনবার ডাক এল আমার। এবার লিফটে নামতে নামতে আমার কেবলই মনে হচ্ছে এ ডাকটাও ভুল। ক্যারন্ত এ আঁ’ নম্বর চাইছে হয়তো কিন্তু সে আমাকে চাইছে না। আগের দু-বারই টেলিফোনের মহিলা কণ্ঠটিকে ‘রং নাম্বার’ বলে চলে এসেছি। কিন্তু তারপরেও এই ডাক। সত্যিই ও কাকে চায়?
ফের রিসিভার তুলে বললাম, হ্যালো! আর অমনি ও প্রান্ত থেকে সেই সুরেলা ফরাসিনী কণ্ঠ, ক্যারন্ত এ আঁ?’ ফের কিছুটা বিরক্তি দমন করে বললাম, হ্যাঁ। তবে আমার মনে হয় ওই ঘরের আগের বাসিন্দাকেই আপনি চাইছেন। কী নামের লোককে আপনি চাইছেন বলুন তো?
মেয়েটি এবার বেশ দুষ্টুমির স্বরেই বলল, ক্যারন্ত এ আঁ! হঠাৎ ভীষণ রাগ চড়ে গেল মাথায়, ভাবলাম দড়াম করে ফোনটা নামিয়ে দিই! মানুষের কাজের সময় ঘন ঘন ফোন করে নওছল্লা! পরমুহূর্তে ভাবলাম, আহা, থাক। ও কী চায় দেখি। এবার ‘আপনি’ সম্বোধনকে ‘তুমি’তে নামিয়ে এনে বললাম, একচল্লিশ বলছি, বলো কী করতে হবে?
সঙ্গে সঙ্গে খিলখিল করে এক দমকা হাসি ওপারে। সহসা লজ্জা হল, মেয়েটা বুঝিবা আমাকে নিয়ে মশকরা ফাঁদছে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ফোনটা আর নামাতে পারলাম না। বললাম, কী হে মাদমোয়াজেল, এত হাসি কীসের? ওপার থেকে আওয়াজ এল, ভয় কেটেছে তাহলে, মসিয়ূর? এবার আর আমি কোনো জবাব দিলাম না। ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে বেশ ঠ্যাটা মেয়ে। হয়তো রসিকও।
একটু থেমে ও-ই বলল, বিকেলে কী করছ মসিয়ূর? বললাম, কিছু না। কাফেতে বসে সময় কাটাব।
—আমার পছন্দসই একটা কাফেতে আসবে?
–সেটা কোথায়?
—শালে লে-আলের কাছে। খুব খোলামেলা জায়গা। তোমার ভালো লাগবে।
–সেটার নাম কী?
–কাফে দ্রুজো।
–বুঝলাম। ও কাফে আমি চিনি। বাজে মেয়ের ভিড় হয় বড্ড।–
-তা হোক না। আমিও তো বাজে মেয়ে। মন্দ লাগবে না। এবার দু-জনেই আমরা টেলিফোনের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে হাসতে লাগলাম। আমি মনে মনে ভাবলাম, বাপরে! এ মেয়ের সঙ্গে কথায় পারা মুশকিল। তারপরেই মনে ফের প্রশ্ন উঠল, ওকে চিনব কী করে? তাই জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু অতশত মেয়ের মধ্যে তোমায় চিনব কী করে?
—সে দায়িত্ব তোমার। যাকে তোমার আমি বলে মনে হবে তার পাশেই গিয়ে বোসো।
-বসে কী নাম ধরে ডাকব?
মেয়েটি হঠাৎ করে নামটা উচ্চারণ করতে গিয়েও করল না। বলল, দেখি কী নামে তুমি ডাকো আমাকে। আর প্রায় তৎক্ষণাৎ ফোনটা নামিয়ে রাখল ওদিকে। আমি হতবুদ্ধির মতন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম ফোন হাতে। যে মেয়ের নাম জানি না, জীবনে কখনো দেখিনি, কী বয়স সে আন্দাজও নেই, তাকে একরাশ মেয়ের মধ্যে থেকে বারই বা করব কী করে? গলার স্বর যদিও বা শুনেছি তাও টেলিফোনে। আর যাকে-তাকে যা-তা নামে সম্বোধন করে কি মার খাব নাকি শেষে? ভাবলাম, দূর ছাই! যাবই না। আমার কী এত তাড়া? আলাপ করার এত রস থাকলে ও নিজেই ফোন করবে।
‘যাব না, যাব না’ এটা শুধু ভাবনাতেই থেকে গেল, যত দুপুর গড়াতে থাকল হৃদয়ের একটি তাড়না শুরু হল একটিবারের মতন মেয়েটিকে চাক্ষুষ করার। ক্রমে না যাওয়ার চিন্তা উবে গিয়ে প্রবল কৌতূহল আর আবেগ দাপাতে লাগল বুকের ভেতরটায়। একটা বই নিয়ে বিছানায় শুয়েছিলাম বটে, কিন্তু সমস্ত মন ছেয়ে রইল ওই না-দেখা মেয়েটার কথা ও কণ্ঠধ্বনি। আমি মাঝে মধ্যে ঘড়ি দেখতেও আরম্ভ করলাম।
ঠিক সাড়ে পাঁচটায় আমি সিতে উনিভার্সিত্যার মেট্রো স্টেশন থেকে ট্রেন ধরলাম শালে লে-আলের। আমার কামরায় ক’টি যুবতী ছিল, তাদের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখছিলাম এদের মধ্যে সেই মেয়ে যদি থাকে। কাজটা যে কত অবান্তর, কিছুক্ষণ পর সেই জ্ঞান হতে বেশ লজ্জা পেয়ে গেলাম নিজেই। এভাবে আদেখলের মতন মেয়েদের দিকে তাকালে মেয়েরাও মজা পায়। একটি মেয়ে তো ফিক করে হেসেই দিল, আর দিয়েই মুখ ঘুরিয়ে নিল জানলার দিকে। আমি বুঝলাম এটা আমার হাভাতেপনার জবাব।
লে-আলে এসে ভূমধ্যস্থ কনভেয়ার স্ট্রিপে চেপে শালের দিকে চলে গেলাম। পরে এস্ক্যালেটরে চড়ে যখন রাস্তায় উঠে এলাম, তখন ঘড়িতে বাজে ছ-টা আর আকাশের আলো মিলিয়ে যায়-যায়। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে হনহন করে হাঁটতে লাগলাম কাফে জোর দিকে।
এর আগে কাফে জোতে যে কখনো বসিনি তা নয়। লে-আলে বাজারের এক বিশেষ প্রান্তে পাথুরে রাস্তার এক কোণে সারাদিন ভিড়ে জমজমাট এই কাফেতে কয়েকবার টু মেরেছিলাম বাংলাদেশি বন্ধু রশিদের সঙ্গে। এখানে কোন মেয়ে যে বারবনিতা আর কোন মেয়ে যে তা নয়, সেটা খুব অভিজ্ঞ চোখ ছাড়া ঠাউরে ওঠা দায়। রশিদ তো বিশ্বাসই করতে চায় না যে, এসব মেয়ের কেউ কেউ দেহপসারিণী। সমানে বলছিল, আমারে কইলে তো আমি যেডারে খুশি বিয়া করতে পারি। তখন ওকে প্রায় নিরস্ত করার জন্যই বললাম, তা মিঞা, তোমায় বিয়ে করছেটা কে? তখন কিছুটা আহত বোধ করে রশিদ বলল, তা ব্যাশ্যারে বিয়া নাই বা করলাম। ক্ষতি কী?
দ্রুজোতে আজও বেশ ভিড়। সামনে রাস্তায় একজন যাদুকর শীতের মধ্যেও খালি গায়ে আগুন গেলার খেলা দেখাচ্ছে। অন্ধকার আকাশের পটে সেই লেলিহান শিখা একটা চমৎকার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। জিপসি গোছের একটি দম্পতি ব্যাঞ্জো বাজিয়ে স্প্যানিশ গান গাইছে। টেবিলে টেবিলে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের জটলা, পানাহার। আমি দেখেশুনে একটা দূর প্রান্তের খালি টেবিল বেছে নিয়ে ওয়েটারকে অর্ডার করলাম, দু ভ্যাঁ ব্ল। অর্থাৎ সাদা ওয়াইন। এই সাদা ওয়াইন জিনিসটা আমার খুবই প্রিয়, আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে একলা একলা সময় কাটাতে পারি কিছু সাদা ওয়াইন আর কড়া তামাকের সিগারেট নিয়ে। আমি ওয়াইন আসতে পকেট থেকে মার্লবরোর প্যাকেটটা বার করে একটা সিগারেট ধরালাম।
