অফিসের সাতকাজের মধ্যেও অবচেতনে যেন ছবিটা ঘোরাফেরা করছে মনে। অনেকগুলো টুকরো টুকরো প্রশ্ন ছড়িয়ে আছে মনের আনাচে-কানাচে। সেই সব প্রশ্ন আবার মিলেমিশে একটা মস্ত প্রশ্ন হয়ে দেখা দিচ্ছে। শৈশব থেকে দেখে আসা ছবিটা বাস্তবিকই মোনালিসার রহস্যময় হাসি হাসছে ওর মনের আয়নায়। অরুণ একটা লেখা তৈরি করার জন্য বসেছিল, কিন্তু সাড়া পেল না। ও প্রধান সম্পাদকের ঘরে গিয়ে একটা অজুহাত দিল —শরীরটা ভালো নেই। লেখাটা কাল দিলে খুব দেরি হবে কি? সম্পাদকমশাই জানেন, এমন অজুহাতের লোক অরুণ নয়। উনি মুখে একটু ছদ্মচিন্তিত ভাব দেখিয়ে বললেন, না, না, শরীর খারাপ থাকলে আজ দেওয়ার দরকার নেই। তবে কাল পাওয়া যাবে তো? অরুণ বিগলিত স্বরে বলল, অবশ্যই! অবশ্যই!
অফিস থেকে বেরিয়ে অরুণ কিন্তু বাড়ি গেল না। ও রওনা হল ন্যাশনাল লাইব্রেরির দিকে। ভেতরটা আনচান করছে। তলব করে দেখতে হবে অ্যালফ্রেড নিউটন জন শিল্পীটি কে, কবেকার কোথাকার? ওঁর কোনো ছবির মূল্য কী দাঁড়াতে পারে এবং ‘দ্য আনএণ্ডিং পার্টি’ ওঁর কোনো বিশ্রুত ছবি কি না।
কম বই ঘাঁটতে হয়নি অরুণকে, অধিকাংশ শিল্পের বইতে একটিবারের জন্যও কোনো উল্লেখ নেই অ্যালফ্রেড নিউটন জন-এর। ঘণ্টা দুয়েক এভাবে ধস্তাধস্তির পর যখন হাল ছেড়ে দেওয়ার মুখে অরুণ, ওর খেয়াল হল দ্য আনএণ্ডিং পার্টি’ ছবির নামে কোথাও কোনো এন্ট্রি পাওয়া যায় কি না, নগণ্য শিল্পীদেরও কোনো উল্লেখযোগ্য কাজের উল্লেখ থাকে ডিকশনারিতে। এইভাবে ইণ্ডেক্স দেখতে দেখতেই ও হঠাৎ পেয়ে গেল নামটা। তারপর ছবির বর্ণনা পড়তে গিয়ে বাক্যে বাক্যে হোঁচট খেতে লাগল। প্রথমেই পড়ল যে অমর ইংরেজ শিল্পী উইলিয়ম টার্নারের বন্ধু ছিলেন ‘দ্য আনএণ্ডিং পার্টি’ ছবির শিল্পী অ্যালফ্রেড নিউটন জন। একটা সময়ে নিউটন জনকে বর্ণনাও করা হত, উইলিয়ম টার্নার অব দ্য ড্রইং রুম’ বলে। অর্থাৎ টার্নার তাঁর নদী, সমুদ্র, পর্বত ইত্যাদি প্রকৃতির ছবিতে যে রঙের জাদু ঘটাতেন, নিউটন জন সেটাই করতেন বসার ঘর, হলঘর, পার্টি ইত্যাদির চিত্রায়ণে। ওঁর সেরা ছবি ‘দ্য আনএণ্ডিং পার্টি’-তে অবশ্য রঙের ও রেখার খেলার পাশাপাশি আরও একটা জাদু কাজ করেছে। কালো জাদু, ব্ল্যাক আর্ট, তুকতাক। তাঁর জীবনের এই শেষ ছবিতে তিনি এঁকেছেন তাঁর প্রেয়সীকে, যাঁকে তিনি জীবনে পাননি। ছবিতে তিনি নিজেকেও এঁকেছেন এক হিংস্র, ক্ষুধার্ত যুবক হিসেবে। ছবির রং তিনি তৈরি করেছিলেন মন্ত্রপূত জল ও রক্ত মিশিয়ে। মাত্র দু-টি প্রদীপের আলোয় রাতের অন্ধকারে তিনি এই ছবি আঁকতেন। দেড় বছর ধরে এই ছবিটা নিয়ে পড়েছিলেন তিনি, যে জন্য ছবিটা টার্নার ঠাট্টা করে বন্ধুর ছবির নামকরণ করেন ‘অশেষ ভোজসভা।
ছবিটা কিন্তু বিক্রি করেননি নিউটন জন। তিনি এটি দান করেছিলেন তাঁর প্রেয়সীকে। শোনা যায় এই ছবি বাড়িতে টাঙানোর কিছুদিন পর থেকে মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে মহিলার এবং তাঁর স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। তখন লণ্ডনের শিল্পমহলে জোর গুজব ছড়ায় আলফ্রেড নিউটন জন বাণমারা ছবি আঁকেন। তুকতাক, মারণবিদ্যা তাঁর ছবির উপকরণ। এই সব কথা ওঠার পিছনে কিছুটা অবদান ছিল স্বয়ং টার্নারেরও, কারণ তিনি নিউটন জনের মধ্যে এক ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী শনাক্ত করেছিলেন। আর তিনি রুষ্টও হয়েছিলেন নিউটন জনকে ‘ড্রইং রুমের টার্নার’ বলে বর্ণনা করায়।
জীবনে বীতশ্রদ্ধ নিউটন জন এরপর আত্মহত্যা করেন। মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে। তার আগে তাঁর সব কাজ পুড়িয়ে ফেলেন। ওরা পায় শুধু ‘দ্য আনএণ্ডিং পার্টি’, যেটি তাঁর প্রেয়সীর বাড়ি থেকে হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যায়। কারও কারও ধারণা, সেই প্রেয়সীর খানসামা টোনি হ্যারিককে ছবিটা তিনি নষ্ট করতে দেন, কিন্তু হ্যারিক সেটি নিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই পাড়ি দেন ভারতে। সেই থেকে ইংল্যাণ্ডের বিশ্রুত, বিতর্কিত ব্ল্যাক আর্ট ছবিটি নিখোঁজ।
ন্যাশনাল লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে অরুণ ড্রাইভারকে বলল স্টেনরের নিলাম অফিসে নিয়ে যেতে। পৌঁছেই ম্যানেজারকে ধরল অরুণ : যে করেই হোক ছবিটা আমার চাই। ওর জন্য আমি তিরিশ হাজার টাকা দাম দেব। বাবার কালেকশন ওই ছবি নিলাম করে মস্ত ভুল করেছি।
ম্যানেজার ক্লান্তভাবে চোখ তুলে বলল, একটু দেরিই করলেন মনে হচ্ছে।
-মানে?
–আমার ফ্রেমার গিয়েছিল আরবুথনট সাহেবের বাড়িতে কাল বিকেলে। সাহেব নতুন ফ্রেম করবেন বলেছিলেন ছবিটার। কিন্তু…
উত্তেজনা চাপতে না পেরে অরুণ বলল, কিন্তু?
তিনি আর নেই। মিসেস আলবুথনটের বক্তব্য, রাতে ছবিটা স্টাডি করতে করতে সাহেবের হার্ট অ্যাটাক হয়।
—আর ছবিটা?
—মিসেস আরবুথনট ওটা ইংল্যাণ্ড নিয়ে যেতে চান। জানি না, আপনার ব্যাপারটা শুনলে আর ভালো দাম পেলে দিয়েও দিতে পারেন। চান? ফোন করব?
অরুণ কী একটা ভাবল কিছুক্ষণ, তারপর দ্বিধাজড়িত গলায় বলল, না, থাক। মনে মনে ভাবল, দু-বার দুর্ঘটনা থেকে বেঁচেছে ও, তৃতীয়বার অত সৌভাগ্যবান নাও তো হতে পারে। ওঁর বরাদ্দ মৃত্যুটাই যে আরবুথনটের কপালে ঠেকল না, কে বলতে পারে? তার চেয়ে আপদ বিদেয় হওয়াই শ্রেয়। ইংল্যাণ্ডের ব্ল্যাক আর্ট ইংল্যাণ্ডেই ফিরুক, টিঙ্কুর ঘরে বরং দুফি-র নিরাপদ প্রিন্ট ঝুলুক!
ক্যারন্ত এ আঁ
‘ক্যারন্ত এ আঁ! ক্যারন্ত এ আঁ!’ অর্থাৎ ‘একচল্লিশ!’ একচল্লিশ আমার ঘরের নম্বর। একতলার রিসেপশানে আমার ফোন এলে এভাবে করিডর মাইকে ঘরের নম্বর ঘোষণা করে হাঁক পাড়েন আমাদের ছাত্রাবাসের কেয়ারটেকার মাদাম কার্মস। ঘরের দরজা বন্ধ থাকলে অনেক সময় এই ডাক শোনাও যায় স্পষ্ট, কিংবা শুনেও মনে হয় ও ডাক আমার জন্য নয়। তখন আশপাশের কোনো ঘরের ছেলে বা মেয়ে এসে দরজায় টোকা দিয়ে ডাকে, ‘রাজীব!’ অন্য সবার বেলাতেও এই রীতি। বিশেষত আমার পাশের ঘরের গ্রিক মেয়ে মারিয়া পাপালুসের ক্ষেত্রে। যতক্ষণ ঘরে আছে হয় মন দিয়ে অঙ্ক কষছে নয়তো বিয়ার খেয়ে ঘুমাচ্ছে। মাদাম কামসের ডাক কখনো তার কানে পৌঁছোয় না।
