অরুণ হাসতে হাসতে বলল, সাহেব-মেমদের পিকচার। দেখছে কীরকম ডান্স করছে? গাইছে। হাসছে।
টিঙ্কু ছবিটার সামনে হাঁটাহাঁটি করে খুঁটিয়ে সব দেখে হঠাৎ বলল, বাপি, ওই মেয়েটা কিন্তু হাসছে না। মেয়ের কথায় রীতিমতো চমকে গিয়েছিল অরুণ, কিন্তু কিছু একটা ওকে বলা দরকার বলে একটু কেশে নিয়ে বলল, তাতে কী? তুমি না হয় ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ওকে হাসাবে!
টিঙ্কু কোনো জবাব না দিয়ে ফের মন দিয়ে ছবিটা দেখতে লাগল, যেন বিশাল একটা ম্যাপ স্টাডি করছে।
রাতে যখন টিঙ্কু ওর ছোট্ট বিছানায় নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে আর পৃথা বসার ঘরের সোফায় টেবিল ল্যাম্পের আলোয় একমনে পড়ে চলেছে একটা শারদীয় সংখ্যা, অরুণ আস্তে আস্তে মেয়ের ঘরে ঢুকে টর্চের আলোয় খুঁটিয়ে দেখতে লাগল ছবিটা। ছেলেবেলায় ছবির যে দুটো জিনিস দেখার কথা মনে আসেনি কখনো, সেই দু-জায়গায় প্রথমে আলো ফেলল অরুণ। প্রথমে শিল্পীর নামে। দেখল অ্যালফ্রেড নিউটন জন। না, এ নামের কোনো শিল্পীর কথা তো শোনেনি কখনো। তারপর ছবির টাইটেল–’দ্য আন এণ্ডিং পার্টি। অর্থাৎ অশেষ ভোজসভা। কিন্তু অশেষ কেন?
অরুণ এবার আলো ফেলে ফেলে দেখতে লাগল গোটা ছবিটা, যদি কোনো সূত্র পায় শিরোনামটার। কিন্তু এ কী! সেই হিংস্র লোকটা তো আর তার জায়গায় নেই! কোথায় সে? আর ওই অসহায়, নিঃসঙ্গ মেয়েটিই বা কোথায়? দেখতে দেখতে ফের গান আর নাচের শব্দ পেতে শুরু করেছে অরুণ, জোরকদমে পার্টি চলছে, সাহেব-মেমরা আপন মেজাজে নেচে চলছে, কারও খেয়ালই নেই, সভার দুটো মানুষ কখন, কোথায় উধাও হয়েছে।
অরুণ সমস্ত ছবির ওপর টর্চ ঘোরাতে শুরু করেছে, কিন্তু কোথাও ওই দুটি প্রাণী নেই। হঠাৎ খেয়াল হল, এ কী, এক ধারের মোটা ভেলভেটের পর্দা ওভাবে ঝাপটাচ্ছে কেন? ওর পিছনে কী ঘটছে? অরুণ হাত দিয়ে পর্দাটা সরাতে গিয়ে বুঝল, ছবির কাচে হাত আটকে যাচ্ছে। পার্টি চলছে, সব নারী-পুরুষ নাচে-গানে বিভোর। কিন্তু পর্দাটাও ঝাপটাচ্ছে, নিশ্চয়ই সাঙ্ঘাতিক কিছু ঘটছে ওর আড়ালে। তা হলে কি ওই লোকটা ওই মেয়েটাকে…?
আর ভাবতে পারছিল না অরুণ, ওর ডান হাতে ধরা টর্চ দিয়ে দমাদ্দম মেরে কাচটাকে ভেঙে ও ছবির ভেলভেট পর্দাটা সরাতে গেল…কিন্তু হাত আটকে গেছে, দেখে পৃথা ওর হাতটা ধরে রেখে বলছে, কী হল তোমার? এত সুন্দর ছবিটাকে তুমি নষ্ট করে ফেলছ?
তাই তো! নখ দিয়ে আঁচড়ে ও একটা ছবির পর্দা সরাতে যাচ্ছিল কেন? তা কি যায়? উলটে কাচ ভাঙতে গিয়ে হাতের পাশটাও কেটেমেটে একাকার। গলগল করে রক্ত গড়াচ্ছে কড়ে আঙুলের পাশ বেয়ে।
অরুণের কোনো উত্তর জোগাল না, এই খ্যাপামির কী ব্যাখ্যা দেবে ও?
পরদিন নন্দ আসতে অরুণ বলল, নন্দ, ছবিটা আরেকবার গাড়িতে তুলতে হবে। অত বড়ো ছবি এভাবে এক কোণে ফেলে রাখা ঠিক হবে না।
পাশ থেকে পৃথা বলল, তা হলে ছবিটা কি বেচে দেবেই ঠিক করলে? কথার উত্তর না দিয়ে অরুণ একবার হাঁটু গেড়ে বসল ছবিটার সামনে, দেখল দুঃখী মেয়েটি আর হিংস্র যুবকটি দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে যে-যার জায়গায়, যেন অরুণকে বোকা বানানোর জন্যই। হঠাৎ করে রক্ত চড়ে গেল ওর মাথায়। বলল, বেচব না তো কী করব? এই মাল ঝোলাবার জায়গা আছে বাড়িতে?
শুষ্ক গলায় পৃথা শুধু বলল, তা হলে আর এত ঝুঁকি নিয়ে বয়ে আনার কী দরকার ছিল? রাগ হজম করতে করতে অরুণ বলল, আমার বুদ্ধি!
ছবিটা বার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যখন, অরুণের বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল টিঙ্কুর কথায়, পিকচারটা নিয়ে যাচ্ছ কেন বাপি? কী সুন্দর নাচ-গান হচ্ছে ওতে!
অরুণ বলল, দেখি, পার্টির একটা ছোট্ট ছবি এনে দেব তোমাকে। অ্যাতো বড়ো ছবি কোথায় রাখব বলো সোনা?
অফিসের পথে প্রথমেই স্টেনর-এর দোকানে নামল অরুণ ছবিটাকে নিলামে দেবে বলে। পরের দিন শনিবার, নিলামের দিন। ছবির দর রাখা হল দু-হাজার, তারপর যত দূর ওঠে উঠবে। কাগজপত্তর তৈরি হতেই অরুণ ফের রওনা হল অফিসের দিকে। মাথায় ঘুরছে একটা চিন্তা : টিঙ্কুর জন্য ফরাসি শিল্পী দুফি-র আঁকা কার্নিভালের একটা দৃশ্য কিনতে হবে। অক্সফোর্ড বুক শপ-এ দুফি-র প্রিন্ট পাওয়া অসুবিধে হবে না। দুফি-র ছবিগুলোর মধ্যে এমন সব রং, আঁকার এমন টঙ, এমন মেজাজ, তা ছোটো-বড়ো সবারই মন ভরিয়ে দেয়।
বাড়ি ফেরার পথে দুফি-র প্রিন্ট পেয়ে যেতে সত্যি খুব স্বস্তি আর আনন্দ হয়েছিল অরুণের। কিন্তু তার চেয়ে ঢের বেশি চাঞ্চল্য হল সোমবার অফিসের পথে স্টেনরে নামতে। এক গাল হেসে ম্যানেজার যখন বলল, আপনার ছবি তো দারুণ প্রফিট দিয়েছে, মিস্টার সেন?
অরুণ একটু অবাক হয়ে বলল, কীরকম?
-কীরকম মানে? নিট ষোলো হাজার টাকা!
—তাই বুঝি? কে কিনল?
-জেফার্সন ব্রাদার্সের আউটগোয়িং ভাইস প্রেসিডেন্ট মিস্টার আরবুথনট। বললেন, এরকম একটা ছবির জন্যই অপেক্ষা করছি এতদিন।
কমিশন কেটে টাকাগুলো গুনে অফিস যেতে যেতে ফের কীরকম উদাস হয়ে গেল অরুণ। কোত্থেকে যে কে ছবিটা ওদের বাড়িতে এনেছিল জানা নেই। এতকাল বেঘোরে পড়ে পড়ে ধুলো কুড়িয়েছে ছবিটা অন্যের ঘরে। অবশেষে অন্য আরেকজনের ঘরে চলে গেল অরুণকে এককাঁড়ি টাকা উপহার দিয়ে। ছেলেবেলার এই ছবি দেখতে দেখতে পড়ে যাওয়ার, ক-দিন আগে হাত কাটার সব ব্যথা, বেদনা এক নিমেষে উবে গেল ওর। আর কীরকম একটা মনখারাপ, মনখারাপ ভাব জাগল হঠাৎ। ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যেন কিছুটা বাল্যকালও হারিয়ে গেল অরুণের। ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা সিগারেট ধরাল।
