অল্প কিছুদিনের মধ্যে অরুণ আবিষ্কার করল যে, ছবিটার মধ্যে ওই মেয়েটার দিকেই যেন ওর টান বেশি। গোটা পার্টির লোকজনকে ছেড়ে ও কেবল ওই মেয়েটাকেই দেখে। এবং পার্টির ধ্বনির বদলে মন দিয়ে শোনে মেয়েটির অনুচ্চারিত নিঃশব্দ সংলাপ এবং এভাবে দেখতে দেখতেই একদিন অরুণের মনে হল, মেয়েটি ওর কানের মধ্যে ফিসফিস করে বলছে, আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাও প্লিজ!
প্রথম মুহূর্তে গায়ে কাঁটা দিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল অরুণ। সর্বনাশ! এ কী শুনল ও ছবির থেকে? একটু পরে সংবিৎ ফিরে পেয়ে ও ছবির দেওয়াল থেকে দূরে সরে গিয়ে চুপ করে দাঁড়াল। ছবিটা যেমন থাকার তেমনই আছে। মেয়েটাও সেই মৌন, বিষণ্ণ, নিঃসঙ্গ, সভার এক কোণে। অরুণ নিজের মনে একটু হেসে হল ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আর বহুদিন সেটির কাছে যায়নি।
ছবিটা ওর গাড়ির মাথায় শুইয়ে বেঁধে দিয়েছে লখিয়া। মাংতুরাম বলল, এবার আমি বাড়িটা পুরাই ডিমোলিশ করতে পারব। আর নতুন বিল্ডিং হলে আরেকবার আপনার পায়ের ধুলা দিবেন ইখানে।
অরুণ ‘আচ্ছা। নমস্কার!’ বলে গাড়িতে এসে বসল। মিন্টো রো-এর বাঁকটা ঘুরতেই ছবির ওই স্মৃতিগুলো ফের কেঁপে এল মাথায়। ও সিগারেট ধরিয়ে জানলার বাইরে দৃষ্টি মেলে বসে রইল। ড্রাইভারকে একবারটি শুধু বলল, নন্দ, বাড়ি চলল। আজ অফিস যাব না।
অনেক দিন পর ফের যখন ছবিটার নীচে দাঁড়িয়েছিল অরুণ, ওর খেয়াল হল যে, সেটি আর আগের মতো মিশছে না ওর সঙ্গে। ছবিটা আবার কীরকম ছবি হয়ে গেছে। লোকজনের হাসি, নাচের পদধ্বনি, পিয়ানো কিংবা বেহালার সুর উপচে এসে পড়ছে না ওর কানে। ছবির সাহেব-মেমরা যে-যার জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে, ছবিতে যেমন থাকে। আর মেয়েটিও সেই আগের মতো ভিড়ের এক কোণে হারিয়ে আছে সবার অলক্ষ্যে। অরুণের ভয় হল, ও আর কোনোদিন ওই ছবির উৎসবে ঢুকে পড়তে পারবে না। আর এইটা মনে হতেই গলার কাছটায় কেমন যেন কান্না কান্না ব্যথা তৈরি হল। ও চট করে একটা লম্বা টুল জোগাড় করে তাতে দাঁড়িয়ে ছবিটার মুখোমুখি হল। ছবির কাচের ওপর নাক ঠেকিয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে দেখতে লাগল দুঃখী মেয়েটিকে। সত্যিই ওর চোখে কি জল আছে? নাকি কারও বিফল প্রতীক্ষায় ঠায় দাঁড়িয়ে ও উৎসবের এক কোণে?
‘বিফল প্রতীক্ষা’ কথাটা হালে ইস্কুলে শিখেছে অরুণ। কেন ভাবল ও এই কথাটাই, ও নিজেও জানে না। একটা দশ বছরের বালক কী জানে বিফল প্রতীক্ষার ব্যাপারে। আর কেনই বা ভাবল মেয়েটা কারও অপেক্ষায় আছে? এই এতশত ভাবতে ভাবতে অরুণ ফের একটু চোখ চালাল ছবির অন্যত্র। আর তখনই চোখে পড়ল, ওর ছবির অন্য প্রান্তে এক হিংস্র চেহারার যুবক, যে দুই ভয়ংকর লোলুপ চোখে পান করছে ছবির মেয়েটির রূপ। মেয়েটি যেমন সভার সব আনন্দ-উত্তেজনা ভুলে ডুবে আছে নিজের দুঃখে, এই লোকটিও যেন সব উৎসবের ফাঁকে গভীর প্রতীক্ষায় এই মেয়েটির জন্য। অরুণ যতই দেখে সেই লোকটিকে, ওর হিংস্রতা যেন একটু একটু করে বৃদ্ধি পেতে থাকে। শেষে একসময় মনেই হল অরুণের, লোকটা সত্যি সত্যি এবার একটু একটু করে এগোচ্ছে মেয়েটির দিকে।
সর্বনাশ! লোকটা তো তা হলে ধরেই ফেলবে মেয়েটাকে। আর মেয়েটাই বা পালিয়ে যাচ্ছে না কেন? আর থাকতে পারছে না অরুণ, ও দুম দুম করে ছবির কাচে ঘুসি মারতে লাগল যেখানে দাঁড়িয়ে (নাকি চলন্ত) লোকটা। তারপর হঠাৎ অন্ধকার!
চোখ খুলে অরুণ দেখল, ওর মা, কাকা, দাদা, দিদি-রা ওর মুখের উপর ঝুঁকে। পাশে বাড়ির ডাক্তার সামন্তবাবু। কাকা ওকে চোখ মেলতে দেখে হাঁফ ছেড়ে বললেন, যাক, ভয় কেটে গেছে। এখন ওকে ফের ঘুম পাড়িয়ে দাও ডাক্তার।
দফায় দফায় কতবার কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল অরুণ, ওর জানা হয়নি। শেষে কাজের লোক চিন্তা একসময় একটু বকুনির ঝাঁঝে জিজ্ঞেস করেছিল, আচ্ছা, খোকাবাবু, তুমি টুলে চড়ে অত্তো বড় ছবিটা পাড়তে গিয়েছিলে কেন? ওটা ঘাড়ে পড়লে তুমি বাঁচতে? ফের যদি তুমি ওই ছবির কাছে গেছ তো তোমার একদিন কি আমার একদিন। অরুণ নিজের মধ্যে ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে অস্ফুট স্বরে বলেছিল, আচ্ছা।
অরুণের চটক ভাঙল ফ্ল্যাটে এসে। তিনজনে মিলে ধরাধরি করে ছবিটা এনে লাজুক লাজুক মুখে ও পৃথাকে বলল, মাংতুরাম বলে এক প্রোমোটার আমাদের বাড়িটা ভেঙে মাল্টিস্টোরিড তুলছে। বাবার এই ছবিটা ওই আমাকে নিয়ে আসতে বলল। ছেলেবেলায় যখন বাড়িটা বিক্রি হয়, ওটা নিয়ে রাখার কোনো জায়গা পাননি মা। তাই…
পৃথা দেওয়ালে ঠেকিয়ে দাঁড় করানো ছবিটা কিছুক্ষণ মন দিয়ে দেখে বলল, দারুণ ছবি, কিন্তু তবে একে রাখবে কোথায়? এতখানি দেওয়ালই তো এ ফ্ল্যাটে নেই। অরুণ মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, সমস্যা তো সেটাই। সাধে আর মা ছবিটা ছেড়ে এসেছিলেন। আবার প্রাণে ধরে বিক্রিও করতে পারেননি। পৃথা বলল, তা হলে? তা হলে আর কী? থাকুক আপাতত এই ডাইনিং প্লেসে, তারপর দেখা যাবে।
অমনি প্রতিবাদ করে উঠল পৃথা, না, না, তাই কি হয় নাকি? এত সুন্দর একটা জিনিস এভাবে পড়ে থাকবে। এটা বরং টিঙ্কর ঘরে ঠেস দিয়ে রাখা যাক এখন, পরে দেওয়াল বার করা যায় কি না দেখব।
অরুণ খুব খুশি হল মনে মনে। কারণ এরকম প্রস্তাব ও চাইছিল পৃথার কাছ থেকে আসুক। তখন ড্রাইভার নন্দ, কাজের লোক আশু আর অরুণ মিলে ছবিটা ফের ধরাধরি করে নিয়ে বসাল টিক্কর ঘরে। চার বছরের কন্যাটি তখন খেলনাপাতি সাজিয়ে বসেছিল, প্রকান্ড ছবিটা দেখে গোল গোল চোখে বলল, বাপরে, এ কী এনেছ বাপি? পিকচার?
