গুরুভাইরা সকলেই উৎকণ্ঠার সঙ্গে প্রশ্ন করল, এ কী করেন, প্রভু? কামকল্পনা দাহ করবেন? আমি পুঁথিপত্র একে একে আগুনে সঁপতে সঁপতে বললাম, দৈব কৃপায় অসম্ভব চাক্ষুষ হয়, যেমনটি আজ দেখলে। তার কি শাস্ত্র হয়? এই অসম্ভবের কাহিনিটুকুই লিখে রাখা যথেষ্ট।
কোথাকার ছবি
বাড়িটার আট ভাগের ছ-ভাগই ভেঙে নামানো হয়ে গেছে, বাকি আছে শুধু এই হলঘরটা। হলঘরটায় এককালে একটা মস্ত ঝাড়লণ্ঠন ঝুলত। এখন চারপাশ থেকে রোদ ঢুকেই আলোয় স্নান করাচ্ছে ঘরটাকে। দু-বিযে খোলা জমির মধ্যে কীরকম আনমনে দাঁড়িয়ে আছে হলটা। শাবল আর গাঁইতিতে ধ্বস্ত হওয়ার অপেক্ষায়। তারপর…
পাশ থেকে গলা ভেসে এল প্রোমোটার মাংতুরামের, ‘কিবল আপনার জন্যই এই হলটা এখনও ভাঙলাম না, অরুণবাবু হাঁ, আপনি লিখলেন কি সবুর করার জন্য, তাই সবুর করলাম। আপনি মানী রাইটার আছেন, তাই আপনাকে একবার আপনার বার্থপ্লেসটা দেখিয়ে দিতে চাইলাম, হাঁ। আমাদের কমুনিটির মধ্যে রাইটার লোগদের জন্য খুব রেসপেক্ট আছে, হাঁ। এখন দেখে লিন কি আপনার কোনো জিনিস আপনি লিবেন কি না।
অরুণ হাঁ করে তাকিয়েছিল হলের দেওয়ালে ধূলিধূসর হয়ে ঝুলে থাকা বিশাল পেন্টিংটার দিকে। তিন ফুট উচ্চতা আর ছ-ফুট দৈর্ঘ্যের কালো ফ্রেমে বাঁধানো সাহেবের আঁকা ছবিটা জন্ম থেকে দেখে এসেছে অরুণ। কে, কবে ছবিটা আমদানি করেছিল অরুণের ধারণা নেই, তবে বাবাকে ও কখননো সখনো চুপ করে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে উপভোগ করতে দেখেছে শৈশবে।
আর উপভোগ করার মতনই ছবিটা, অন্তত এরকম ধূলিধূসর হওয়ার আগে অবধি তাই ছিল। সাহেবের আঁকা ছবিটা একটা পার্টি সিন। ভিক্টোরীয় বা তারও আগের কোনো যুগের এক বিপুল ভোজ ও নৃত্যসভার দৃশ্য। পরমাসুন্দরী সব মেমসাহেব আর নায়কোচিত চেহারার সব সাহেবদের মিলনসভা। কারও হাতে পানীয়ের গেলাস, কারও হাতে আঙুর, কোনো সাহেবের বাহুবন্ধনে কোনো রূপসী চোখ বুজে এলিয়ে আছে, অনেকেই হাত ও কোমর ধরাধরি করে বল নাচে ব্যস্ত। এক-আধজন পুরুষ আপন মনে দীর্ঘ, সরু পাইপে তামাক সেবনে বাঁদ, কোনো রমণী আবার আলতো করে চুমু দিচ্ছেন প্রিয় পুরুষের ঠোঁটে। আলো ঝলমলে সভায় নারী-পুরুষের পোশাকে রঙের উৎসব চলছে। কেবল একটি কোণে একটি যুবতী কীরকম মলিন মুখে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে। অরুণের মনে পড়ল, বাল্যে কীভাবে ও চুপিসাড়ে এসে দাঁড়াত ছবিটার নীচে, আর আস্তে আস্তে কী যেন একটা ঘটে যেতে ওর শরীরে, মনে। ওর মনে হত, ও নিজেও ওই ছবির বাইরে নয়। ছবিরই একটা মানুষ ও, বাইরে এসে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অরুণের ঘোর কাটল মাংতুরামের কথায়, কী অরুণবাবু, ছবিটা আপনি লিবেন? তো লিয়েই যান। উ দিয়ে আমার কোনও পারপাস সার্ভ হবে না। আপনি রাইটার লোগ, আপনি উর মিনিং বাহির করতে পারবেন। বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁক দিল মাংতুরাম, এ লখিয়া, ই পিকচারকো উতারো অউর সাহেবকো গাড়িমে ডাল দো। দেখ উসকো ডামিজ না হোয়। মেহেঙ্গা পিকচার হৈ।
অরুণের মাথায় খেলল না, এই এত বড়ো ছবিটা ও ওর ফ্ল্যাটে নিয়ে কোথায় রাখবে। ঠিক এই ভেবেই তো আজ থেকে তিরিশ বছর আগে ওরা ছবিটা ফেলেই চলে গিয়েছিল ফ্ল্যাটবাড়িতে। জন্মভিটের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ সত্ত্বেও মধ্য কলকাতার এই বাড়িটায় আর কখনো পা রাখেনি অরুণ। মাঝেমধ্যে এ পাড়া দিয়ে যেতে যেতে হয়তো আড়চোখে চেয়েছে বাড়িটার দিকে আর লজ্জায় চোখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। অত সুন্দর বাংলো প্যাটার্নের বাড়িটার কী দশাই না হয়েছে মাড়োয়ারিদের হাতে। বাড়িটার স্টাইলই ঝেড়ে বদলে ফেলে সেটাকে একটা কুৎসিত কারখানার চেহারা দিয়েছে। আর এতদিন পর চিঠি দিয়ে জানাল যে, বাড়িটা ভেঙে সেখানে আটতলা ফ্ল্যাটবাড়ি তুলবে প্রোমোটার মাংতুরাম। অরুণবাবু চাইলে এসে একবার শেষ দেখা দেখে যেতে পারেন ওঁর জন্মভিটেকে।
স্মৃতির বাড়িটাকে দেখতে আসার সময় অরুণ কল্পনাও করতে পারেনি, হলঘরের ওই পেন্টিংটা আজও টিকে থাকবে মাড়োয়ারিদের নজর এড়িয়ে। একটু অবাকই হয়েছিল অরুণ—অ্যাদ্দিনে কেউ এটাকে পেড়ে নামিয়ে দেখতে চাইল না, ছবিটাকে বেচা যায় কি না! উলটে আজ মাংতুরাম যত্ন করে সেটাকে নামাচ্ছে অরুণের গাড়িতে তুলে দেবে বলে। অতবড়ো ছবি তো গাড়ির রুফে শুইয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায়ও নেই। আর সে যেমন করে হোক নিয়ে গেলেও ওটাকে অরুণ ঝোলাবে কোন দেওয়ালে? ওর ফ্ল্যাটে তো একটাও দেওয়াল নেই ছবিটিকে ধারণ করার।
তবু ছবিটা ওকে নিতেই হবে। ছবিটার দিকে তাকালেই বাবার স্মৃতি ভেসে আসে। বাবার মৃত্যুর দিনেও ওঁর দেহটাকে শোওয়ানো হয়েছিল এই হলঘরে, এই ছবিটার নীচে। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বালক অরুণের কেবলই মনে হচ্ছিল, হঠাৎ করে বাবা হয়তো দাঁড়িয়ে পড়ে তাকাতে শুরু করবেন ছবিটার দিকে।
কিন্তু ছবিটার আসল রোমাঞ্চ বিস্তার আরম্ভ হল বাবার মৃত্যুর পর থেকে। অরুণ একলা বোধ করলে, মন খারাপ হলে পর নিঃশব্দে দাঁড়াত গিয়ে ছবিটার নীচে। চোখ তুলে চেয়ে রইত লাল-নীল-হলুদের বন্যায় ভেসে যাওয়া নারী-পুরুষের দিকে। নীরব ছবিতে আস্তে আস্তে বেজে উঠত বাজনার ধ্বনি, হাসির হররা, নাচের ছন্দ, আর খানিক পরে অরুণের মনে হত, সেও ওই পার্টির অংশ। শুধু পার্টিতে হাজির থেকেও ওই পার্টি বা পরিবেশের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা থেকে যেত ওই মলিন মুখের একলা মেয়েটি। যেন কেউ ওকে নাচতে ডাকেনি, পানীয় অফার করেনি বা কাছে গিয়ে যেচে কথা বলেনি।
