দেবানন্দ বলল, পশুকুল শিখন্ডী চেনে না, তারা রক্ত-মাংস চেনে।
ভানুপ্রিয়া বলল, মানুষও রক্ত-মাংসই চেনে, কামনা-বাসনা-রতি-রমণ জানে, মানুষ চেনে কি?
দেবানন্দ বলল, আমি তো সেই মানুষের অনুসরণেই এতদূর এলাম।
—কিন্তু সে-আসা পূর্ণ হওয়ার নয়। আমি রতিতে অপরাগ।
-তা হলে কামকলাও অসম্ভব। নারী-পুরুষের ধাতুক্ষয়ে যে কলার নিষ্পত্তি তা পূর্ণ মানবিক নয়। আর যা অমানবিক তা…
এখানে সাময়িক নিদ্রাভাব আসে অনুলেখিকা নীলকান্তার। সে পুনরায় সজাগ হতে শোনে গুরু দেবানন্দ বলছেন, ভানুপ্রিয়া, তোমাকে অরণ্যের উপান্তে শিখন্ডীদের মধ্যে রেখে আর গুরুগৃহে প্রবেশ করতে পারিনি। ভেবেছি তলিয়ে দেখব মুনি বাৎস্যায়নের সূত্রাদি, তারপর রচনা করব আমার বিরুদ্ধ-কামসূত্র।
তখনই ভানুপ্রিয়া হেসে বলে, তোমার কামকল্পনা?
দেবানন্দ বলে, কামের অসম্ভব।
দেবানন্দ-ভানুপ্রিয়া সংলাপে এও উদ্ধার হয় যে, প্রেয়সী অরণ্যবাসী হওয়ার পরও সাত-সাতটা বছর গুরুদেব তাঁর কাছে নিয়মিত যাতায়াত করেন। প্রবল তর্ক ও বিতর্কে একটু একটু করে সত্যের আভাস পান। দিনমানে কবিরাজের হিসাবরক্ষার কাজ করে রাতে প্রদীপের আলোয় রচনা করেন তাঁর কামকল্পনার ভিত্তিসূত্র। ভানুপ্রিয়া প্রায়শই গুরুকে বলেছেন, আনন্দ, নারীসংগম করো, নচেৎ তোমার ধারণা আংশিক হবে। দেবানন্দ তখন বলেছেন, বাৎস্যায়নদেবেরও তো শুনেছি নারীসম্ভোগ ঘটেনি। আর তিনি লিখেছেন কামের নিয়মনীতি। কামকলার অসম্ভবতা রচনার জন্য নারীর কী প্রয়োজন?
তাঁদের শেষ সাক্ষাতে ভানুপ্রিয়া দেবানন্দকে প্রণাম করে বরমাল্য পরিয়ে দেন। বলেন, হৃদয় দিলাম, নাথ। দেহ দেব সতীদাহে।
তারপর একটু রয়ে সয়ে বলেছেন, ঢের হয়েছে নাথ-নাথ করা, তুমি শুধু আমার আনন্দ হয়েই থেকো। এই অভিশপ্ত জীবনের একমাত্র আনন্দ।
গুরু তখন প্রতিবাদ করেছেন, তোমায় সুখ দিতে পারিনি, তোমার সতীত্ব দাবি করব কেন?
ভানুপ্রিয়ার প্রত্যুত্তর ছিল, কারণ সতীত্বই কাম জয় করে। অগ্নিসম পরাক্রমশালী কামকে এই এক অনুভূতিই পদানত করে। সতীত্ব কামের অসম্ভব। সতীদাহে সেই অলৌকিক সংগম।
দেবানন্দ উত্তেজিত হয়ে বলেছেন, আমি সতীদাহ মানি না।
ভানুপ্রিয়া উত্তর করেছেন, আমিও মানি না। কিন্তু ভালোবাসা মানি।
কিন্তু ভালোবাসা মানে তো সহমরণে যাওয়া নয়।
—কিন্তু যে সহজীবন পেলে না?
এই সময় তীব্র কান্নায় ভেঙে পড়েন দেবানন্দ। বলেন, কিন্তু কে তোমাকে জানাবে আমার মৃত্যুসংবাদ?
ভানুপ্রিয়া বলেন, আমার দেহ।
–তোমার দেহ! সে কী কথা?
–জানো না বার্ধক্যে স্বামী-স্ত্রী ভাই-বোনের মতো। তাদের সংলাপও তখন ব্রীজাত ‘তুমি-তুমি’ থেকে প্রায় ‘তুই-তোকারি’ হয়ে আসে। একের মনোব্যথা, দেহবেদনার সাড়া পায় অন্যে। তাই একজন গত হলে অন্যজনও শীঘ্রই মৃত্যুর মুখ দেখে।
দেবানন্দ বলেছেন, তার মানে তুমি সংবেদ পাবে আমার মৃত্যুর?
ভানুপ্রিয়া বলেছেন, যদি তোমার যাওয়ার পরিস্থিতি হয় পূর্বে। নচেৎ তুমিও সাড়া পাবে আমার মৃত্যুর।
সংলাপের শেষদিকে গুরু দেবানন্দ জানতে চেয়েছেন, তুই কী করে বুঝলি, ভানু, আমি যাচ্ছি?
ভানুপ্রিয়া জানিয়েছেন, সহসা জীবনে বিরামেচ্ছা অনুভব করলাম, আনন্দ।
জীবনে সব কিছুর উপর আস্থা হারিয়ে ফেললাম। পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকাতে মনে হল তুই আমাকে ডাকছিস। প্রবল শ্বাসকষ্ট শুরু হল, মনে হল বুক ফেটে যাবে। আমি শ্বেতশুভ্র বস্ত্রে, কপালে সিঁদুরের টিপ পরে তোর সন্ধানে বেরুলাম।
উদগ্রীব স্বরে তখন গুরুদেব জানতে চেয়েছেন, কিন্তু আমার ঠিকানা পেলি কীভাবে?
গভীর দুঃখের মধ্যেও আনন্দের হাসি হেসে বলেছেন ভানুপ্রিয়া, যেদিকে চোখ যায় হেঁটেছি। যখনই বুকে ব্যথা উঠেছে বুঝেছি পথ ভুল হল। ফের সঠিক পথে ফিরতেই ব্যথা মিলিয়ে গেছে। মনে হয়েছে তোর হৃৎপিন্ড আমার হৃৎপিন্ডকে আকর্ষণ করছে। শেষ অবধি পৌঁছোতে পেরে সব ব্যথা কোথায় মিলিয়ে গেল। এখন শুধু শেষ শ্বাসটুকুর প্রতীক্ষা।
সংলাপ পাঠ শেষ করে আমরা আশ্রমিকরা নিস্তব্ধে একে অন্যের মুখের পানে চেয়ে চেয়ে অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার রাত কাটালাম। উষার প্রথম লগ্নে গুরুদেবের কক্ষে গিয়ে দেখলাম তিনি অপূর্ব শান্তিতে শেষ নিদ্রায় মগ্ন। আমি তাঁর বক্ষে হাত রেখে বুঝলাম তাঁর প্রাণবায়ু বহুক্ষণ নিষ্ক্রান্ত। আমি নীলকান্তাকে বললাম, যাও গুরুমাতাকে বার্তা দাও।
কিয়ৎপর নীলকান্তা ছুট্টে এসে বলল, নাথ, গুরুমাতাও দেহরক্ষা করেছেন।
শ্মশানে মঙ্গলধ্বনি উচ্চারণ করে নগ্ন, আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় গুরু দেবানন্দ ও দেবী ভানুপ্রিয়াকে চিতার অগ্নিতে সমর্পণ করলাম আমরা। আর তারপরই সেই অলৌকিক ঘটনার স্ফুরণ দেখলাম। আগুনের লেলিহান শিখায় গুরু ও গুরুমাতার দেহ দুটি অপূর্ব রমণভঙ্গিতে উথালপাথাল হতে থাকল। আর চিতা থেকে ধ্বনি জাগল বিচিত্র, ব্যাখ্যাতীত শীৎকারের। যেন এক অসম্ভব, লোকাতীত সংগমে লিপ্ত দেবানন্দ ও ভানুপ্রিয়া।
আমি জ্যেষ্ঠ শিষ্য হিসেবে মুখাগ্নি করেছিলাম গুরুদেবের গুরুমাতারও। জানি আজ থেকে আমি, জয়মঙ্গল স্বামী, গুরু দেবানন্দের কামশাস্ত্রাধ্যয়ন আশ্রমের অধ্যক্ষ। আমি নীলকান্তাকে আদেশ করলাম গুরুর কামকল্পনার তাবৎ পুঁথি চিতার পাশে এনে জড়ো করতে।
