আমরা, আশ্রমিকরা, রোমাঞ্চে স্তব্ধ হয়েছিলাম। আমাদের গুরুদেবকে কেউ আনন্দ বলে ডাকছে, এ অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। আরও অবাক হওয়ার ছিল—বর্ষীয়সীর ডাকে এই প্রথম চোখ মেলতে দেখলাম, আমরা মুমূর্ষ আচার্যকে, আর তাঁর চোখে জল! তিনি চোখের এককোণ থেকে মহিলার দিকে চেয়ে বললেন, তুই শেষ অবধি আসতে পারলি, ভানু?
ভানুপ্রিয়া তাঁর সারা পিঠে ছড়ানো সাদা মেঘের মতো চুলের একমুঠি দিয়ে আচার্যের চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে বললেন, কেন, ভুলে গেলি আমার যে কথা ছিল সতী হওয়ার!
হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠলেন গুরু, অমন কথা বলিসনি, ভানু। ও আমি সইতে পারব না। ভগবান তোর প্রতি কঠোর হয়েছেন বলে আমি তো হতে পারি না।
ভানুপ্রিয়া এবার আঁচলে নিজের অশ্রু মুছতে মুছতে বললেন, আমি তো জীবনে কিছুই পাইনি, আনন্দ। এই শেষ গরিমাটুকু থেকেও আমায় বঞ্চিত করবি? গুরুদেব ফের দীর্ঘ সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ভানুপ্রিয়া আমাদের দিকে ঘুরে বললেন, আমাদের একটু নির্জনতার প্রয়োজন আছে বৎসগণ। একটু সময় দেবে?
আমরা গুরুদেব ও ভানুপ্রিয়াকে প্রণাম জানিয়ে কক্ষের বাইরে চলে এলাম; আসতে আসতে আড়চোখে দেখলাম গুরুর ওষ্ঠে চুম্বন রাখছেন ভানুপ্রিয়া। অকস্মাৎ অনুভব করলাম নিভে যাওয়ার আগে প্রদীপের আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠার মতো এক নতুন জীবন—হোক
তা ক্ষণিকের—ভর করেছে গুরুদেবকে। নীলকান্তাকে বললাম, এ কাজ গহিত হলেও এ তোমাকে সম্পন্ন করতেই হবে কান্তা। পাশের কুঠুরিতে বসে তোমায় লিপিবদ্ধ করতে হবে গুরুদেব-ভানুপ্রিয়ার শেষ সংলাপ। ঈশ্বর জানেন কী বিশাল রহস্য অনাবৃত হবে সেই সূত্রে।
নীলকান্তা তার ছোট্ট কুঠুরিতে লেখনী ধরে সংলাপের অপেক্ষায় প্রথম যে ধ্বনি শুনতে পেয়েছিল তা ছিল, আমরা পরে জেনেছি, গুরুদেব ও ভানুপ্রিয়ার মিলিত কান্নার স্বর।
২.
আমরা রহস্যের আকাঙ্ক্ষাতেই নীলকান্তাকে গুরুকক্ষের সংলগ্ন কুঠুরিতে স্থাপন করেছিলাম। কিন্তু অধিক রাত্রে গুরুদেব যখন পুনরায় নীরব, নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়লেন, ভানুপ্রিয়া আশ্রমের অতিথিনিবাসে ফিরে গেলেন এবং আমরা নীলকান্তার লেখা সংলাপ গোগ্রাসে পাঠ শুরু করলাম, অমাবস্যার অন্ধকারে প্রদীপের আলোয় আমাদের হৃৎপিন্ড ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম হল গলা বেয়ে। আমরা রহস্যের প্রত্যাশায় ছিলাম; অকল্পনীয় আশ্চর্যবোধের আশঙ্কায় নয়। সংলাপের শেষ বাক্যটি পাঠ করার পর আমাদের কারওরই গন্ডদেশ শুষ্ক রইল না। কী মর্মব্যথায় গুরুদেব কামকলাকে অসম্ভব এবং পরাবাস্তব বলেছেন তার ইঙ্গিত পেলাম। সংলাপের একখানে ভানুপ্রিয়াও বলেছেন যে, সমস্ত শোক, দুঃখ, আনন্দ বিরহ, সাফল্য, গরিমা ও সাধনার মতো কামেরও নিষ্পত্তি মৃত্যুতে। বাৎস্যায়ন ও তাঁর কতিপয় পূর্বাচার্যও সম্ভবত অনুমান করেছিলেন যে, দেহমধ্যে লিঙ্গ ও যোনিই সবচেয়ে দেরিতে বৃদ্ধ হলেও, কাম ও কামনার মৃত্যু মৃত্যুতে। ভানুপ্রিয়া বলেছেন, প্রকৃত সতীদাহ স্বামী-স্ত্রীকে আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় আগুনে সঁপে দেওয়া। যাতে একের নাসিকা, ওষ্ঠ, চক্ষু, বক্ষ, হৃদয়, পাকস্থলী, অন্ত্রনালি, জঙ্ঘা, পদ ও যৌনাঙ্গ অপরের অঙ্গের সঙ্গে নিশ্চিহ্নভাবে মিশে যায়। যা তাদের অন্তিম সংগম। কিন্তু হায়!…এইখানে ফের কান্নায় ভেঙে পড়ে কপালে করাঘাত করেছেন ভানুপ্রিয়া, আমার তো সেভাবেও সৎকার হওয়া বিধেয় নয়, আনন্দ! আমি যে শিখন্ডী?
হ্যাঁ, দেবানন্দ-ভানুপ্রিয়া সংলাপের এই সেই মর্মান্তিক আবিষ্কার—ভানুপ্রিয়া শিখন্ডী। নপুংসক। উভলিঙ্গ। না পুরুষ, না নারী।
আমরা আরও আবিষ্কার করলাম গুরুদেব দেবানন্দ ভানুপ্রিয়ার পিতা আচার্য বহ্নিদেবের শিষ্য, যে বহ্নিদেব তাঁর গীতিভাষ্য অগ্নিতে নিক্ষেপ করেন যখন বার্তা পৌঁছোয় তাঁর শ্রেষ্ঠ শিষ্য দেবানন্দ সাংখ্যচর্চা পরিত্যাগ করে কামশাস্ত্র রচনায় লিপ্ত হয়েছে।
আচার্য কিন্তু মৃত্যুকাল অবধি জেনে যেতে পারেননি দেবানন্দ কেন দর্শনচর্চা পরিত্যাগ করল। তিনি এও জানেন না সহসা এক প্রাতে দেবানন্দ কেন কন্যা ভানুপ্রিয়ার সঙ্গে আশ্রম থেকে পলায়ন করল। তিনি আক্ষেপে বলেছিলেন, কন্যা ভানুপ্রিয়া যোনিবিযুক্তা। সে কী করে সমাজধর্ম পালন করবে দেবানন্দের সঙ্গে?
দেবানন্দও জানে না তার প্রেয়সীর স্বরূপ, শুধু যৌবনধর্মে ক্রমশ আকৃষ্ট হয়েছে ভানুপ্রিয়ার প্রতি। প্রথমে স্পর্শ, পরে ক্রম আলিঙ্গন—সৃষ্টক, বিদ্ধক, উদঘৃষ্টক, পীড়িতক, অবশেষে চুম্বন ও শেষের সেই ভয়ংকর দিনে—দেবানন্দ উন্মাদের মতো প্রার্থনা করেছে, ভানু এই পূর্ণিমার রাতে উদার হও, ভানু। আমি আর সইতে পারছি না। ভানুপ্রিয়া আপ্রাণ চেষ্টায় তার বসন আগলে রেখে বলেছে, ও তুমি চেয়ো না, আনন্দ। আমার দেবার কিছুই নেই। আমি অপ্রাকৃত, আমি অসম্ভবা।
এর পরদিনই ভানুপ্রিয়া সবার অলক্ষ্যে আশ্রম ত্যাগ করে। কাকপক্ষীও টের পায়নি তরুণী কোথায় গেল; শুধু দূর থেকে নীরব ছায়ার মতো তাকে অনুসরণ করে নিষাদরি অরণ্যের প্রান্ত অবধি পৌঁছে গেল দেবানন্দ। অরণ্যের মুখে যুবতীর আঁচল আঁকড়ে ধরল যুবক, বলল—এ অরণ্যে কাঠ কুড়োতেও মানুষ আসে না। তুমি এখানে কী করবে?
ভানুপ্রিয়া বলল, আমি তো মানুষ নই। আমি লিঙ্গের, তাই না-মানুষ।
