অন্য এক জায়গায় দেখা গেল গুরু লিখছেন, ভানুপ্রিয়ার স্বরূপ উদ্ধারই আমাকে সাংখ্যদর্শন থেকে সরিয়ে আনল কামজিজ্ঞাসায়। কেমন হতে পারে চতুর্দশবর্ষীয় বালকের মন যখন…এর পরের রচনাংশ হাতে আসেনি বলে জানা গেল না গুরু কোন বিস্ময় বা আবিষ্কারের কথা বলতে উদ্যত হয়েছিলেন। যেমন আরেকটি প্রসঙ্গেরও নিস্পত্তি হল না। পুঁথির পৃষ্ঠা এলোমেলো রয়ে গেল বলে, যেখানে গুরু বলেছেন, আমার ব্যক্তিগত আবিষ্কারের এক গৃঢ় ক্ষেত্র হল রতি, রমণ ও স্বপ্নের সম্পর্ক। স্বপ্নের দ্বারাই আমরা রতিজীবনের জন্য তৈরি হই এবং আমাদের বাস্তব স্বপ্ন ও রতির সম্পর্ক অশ্রু ও মনোবেদনার মতো, হর্য ও হাস্যের মতো, কখনো কখনো যেমন হর্ষেও অশ্রুপাত হয়, বেদনার সঞ্চার হয় হাস্যের মতো, তেমনই সময় সময় স্বপ্ন ও রতিতেও এহেন বিহুলকর ব্যঞ্জনার উদ্ভাস হয়। ভানুপ্রিয়ার যৌনতা আবিষ্কারের দিন…হা হতোস্মি! ঠিক এইখান থেকেই পুঁথি নিশ্চিহ্ন। আমরা নীলকান্তাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করলাম পুঁথির এইসব অংশ সংগ্রহ করার জন্য। সে বললে, গুরুর শয়নকক্ষের অন্ধকারে আমি কী করে পড়ে পড়ে বার করব ও সব? হাতের কাছে যা পাই তাই উদ্ধার করে আনি।
সম্প্রতি যে-পুঁথিগুলো উদ্ধার করেছে নীলকান্তা তাতে কামকলা, যৌনতার ঊর্ধ্বে আরেক বিষয়ের কথা বার বার ফিরে এসেছে—মৃত্যু! তবে সেই মৃত্যুর আবহ হিসেবেও স্থানে স্থানে দেখা দিয়েছে যৌনতা। যেমন গুরু লিখছেন এক পর্যায়ে—ওঁ ধ্বনি ও মন্ত্রোচ্চারণের মতো পুরুষের শ্রবণেন্দ্রিয়কে যা অপূর্ব ধারায় আন্দোলিত করে তা হল স্ত্রীর শীৎকারধ্বনি। মৃত্যুপথযাত্রী পুরুষের ক্লান্ত চেতনায় মন্ত্রের মতো এই ধ্বনির স্মৃতি প্রত্যাগত হলে তা সুখের হয়। এও হল কামকলার অসম্ভবতার এক বিচিত্র, মধুর রূপ। মুনি বাৎস্যায়নের এই অভিজ্ঞতা হয়নি কারণ তিনি ছিলেন সংগমে অনভিজ্ঞ। কিন্তু আমার?
বিগত পূর্ণিমার পর গুরু দেবানন্দ অন্তিমশয্যা গ্রহণ করেছেন, সেই থেকে তাঁর বিশাল পুঁথিভান্ডার ঘাঁটাঘাঁটি করেও আমরা তাঁর জীবন সম্পর্কে কোনো নিষ্ঠ ধারণায় পৌঁছোতে পারিনি। তিনি কি কখনো বিবাহ করেছিলেন? কখনো কি নারীসঙ্গ ঘটেনি কামশাস্ত্রের এই অলৌকিক প্রতিভার? ভানুপ্রিয়া কে? সে কি জীবিত না মৃতা না নিতান্তই কাল্পনিক? তাঁর মৃত্যুকালে গুরুর শেষ অভিলাষ কী?
নীলকান্তা সেদিন বলল, মূর্ধান্বিত অবস্থায় গুরু নাকি বার বার নাম ধরে ডেকেছেন ভানুপ্রিয়াকে।
গতরাত্রে নীলকান্তা যখন গুরুর কপালে জলসিঞ্চন করতে করতে মুমূর্ষ আচার্যকে জিজ্ঞেস করল, দেব, কিছু বাসনা করেন? গুরু নাকি অতিকষ্টে বিড় বিড় করে বলতে পেরেছিলেন, ধ্বনি ধরো।
ধ্বনি ধরার অর্থ দেবনামকীর্তন। যা সেই থেকে তাঁর শিষ্য আমরা সমানে করে চলেছি। কিন্তু, আশ্চর্যের আশ্চর্য, আশ্রমের একমাত্র নারী যুবতী নীলকান্তই জানাল গুরু নামধ্বনির সঙ্গে হয়তো শীৎকারধ্বনির কথাও বলতে চেয়েছেন। ফলে গুরুকক্ষের সংলগ্ন কুঠুরি যেখানে নীলকান্তার বাস সেখানে আমরা আশ্রমিকরা একের পর এক রমণে লিপ্ত হতে চললাম নীলকান্তার সঙ্গে! জ্যেষ্ঠ শিষ্য হিসেবে সদ্য তরুণীর সতীচ্ছদ ছিন্ন করার দায় বর্তায় আমার উপর। সেই অপূর্ব সম্ভোগের স্বাদ এখনও আমার ওষ্ঠে, জিহ্বায়, চক্ষে বস্তুত সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছেয়ে আছে। আশ্রমিকদের মধ্যে আমি এবং নীলকান্তাই অবিবাহিত, ফলে কামশাস্ত্রাধ্যয়নের এক অলৌকিক প্রয়োগ আমাদের দু-জনার জীবনেই। পরে শুনেছি। নীলকান্তার শীৎকারে চাপা পড়ে গিয়েছিল কীর্তনধ্বনি এবং সে-সময় এক অপূর্ব প্রসন্নতা ফুটে উঠেছিল গুরুর মুখমন্ডলে। রমণকালেই নীলকান্তা জানায় যে, এই অভিজ্ঞতার পর অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে তার সঙ্গ করা অসম্ভব। সে কার্যত আমার স্ত্রী। ফলে সেই থেকে গুরুর ম্লান শ্রবণে শীৎকারধ্বনি প্রক্ষেপণের জন্য আমি ও নীলকান্তা নিরবচ্ছিন্নভাবে রমণে লিপ্ত আছি। এবং এই অনির্বচনীয় সুখের মাধ্যমে উপলব্ধি করছি রতি ও রমণ তত্ত্বোত্তীর্ণ। কী বাভ্রব্য, কী শ্বেতকেতু, কী গোনদ্দয়, কী দত্তক, কী ঘোটকমুখ, কী স্বয়ং বাৎস্যায়নদেব! গুরু দেবানন্দের কামদর্শনও কি…নবম বারের মতো আমার ধাতুক্ষয় হতে চলেছে…আমি আর কিছুই ভাবতে পারছি না।
আমার নিদ্রাভঙ্গ হল নীলকান্তার চুম্বনে। নীলকান্তা আমার বক্ষের উপর দেবী দুর্গার মতো ব্যাপ্ত বিস্তৃতভাবে শায়িত। বলা যায় স্থাপিতও। আমি ক্লান্ত, অবসন্ন, কিন্তু সে চিরবেগা। আমি হেসে বললাম, কিছু বলবে? সে বলল, নাথ, জাগো। গুরুর সেই ভানুপ্রিয়া এসেছেন। দেখবে না?
ভানুপ্রিয়া! মুহূর্তের মধ্যে সব ক্লান্তি মিলিয়ে গেল দেহ ও মন থেকে, আমি দিগবসনা নীলকান্তাকে কোলে তুলে উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, কান্তা, বস্ত্র দাও।
আমরা শিষ্যরা গুরুর শয্যা ঘিরে বসেছিলাম, যখন এক অপূর্ব সৌরভ বিস্তার করে ঘরে প্রবেশ করলেন ভানুপ্রিয়া। আশ্রমে পা রাখার পর দীর্ঘ এক দন্ড তিনি এক বিশেষ কক্ষে আবদ্ধ ছিলেন। বলেছিলেন, গোধূলিলগ্নে আমি দেবদর্শন করব না। আচার্যের অনিষ্ট হবে।
কিন্তু সারা আশ্রম জেনে গিয়েছিল আগন্তুকের পরিচয়। দীর্ঘকাল ধরে একটু একটু করে যে মহিলার ছবি ও ধারণা আমরা মনের মধ্যে গড়ে তুলেছি, আজ তিনি সাক্ষাৎ ধরা দিয়েছেন, রক্ত-মাংসে ধ্বনিতে সম্পূর্ণ। আশ্রমিক আমরা গুরু প্রিয় পার্বত্য লোকসংগীতে ভরিয়ে রেখেছিলাম গুরুকক্ষ, যখন শ্বেতবস্ত্র ও রক্তাভ ললাটিকায় অনিন্দ্য ব্যক্তিত্বময়ী ভানুপ্রিয়া প্রবেশ করলেন সেখানে আমরা সকলে একে একে উঠে নমস্কার জানালাম তাঁকে; তিনি কিছুটা উদাসীনভাবেই প্রতিনমস্কার করে গুরুর পদপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালেন। গুরুর পদধূলি নিয়ে কয়েকবার পূর্ণ প্রদক্ষিণ করলেন তাঁর শয্যা, তারপর তাঁর মাথার পাশে মাটিতে বসে চাপাস্বরে ডাকলেন, আনন্দ! আনন্দ! আমি এসেছি। আমি…আমি ভানুপ্রিয়া।
