বাৎস্যায়নের পর যে গুরু দেবানন্দকে আমরা জগদশ্রেষ্ঠ কামশাস্ত্রী জ্ঞান করে এসেছি এতদিন তাঁর এইসব মন্তব্যে আমরা উত্তরোত্তর বিভ্রান্ত হচ্ছিলাম। কামতত্ত্বের প্রতিই যেন এক তীব্র বিদ্বেষ প্রকট হচ্ছিল তাঁর কথাবার্তা, চিন্তাভাবনা চালচলনে। একদিন যেমন দেখলাম গুরু তাঁর প্রিয় বাৎস্যায়নিক কামসূত্রের পুঁথিগুলো চেলাকাঠের আগুনে জ্বালিয়ে শেষ করেছেন। জিজ্ঞেস করতে বললেন, হর-পার্বতী কি কামসূত্র পড়ে রমণে লিপ্ত হতেন? কাম কি কবিতা যে তার একটা নির্দিষ্ট ভাব ও গঠন হবে? জনে জনে যা পৃথক তার আবার ব্যাকরণ কীসে?
আমি ইতস্তত করে বললাম, কিন্তু মনের ও শরীরের আচরণের কি ব্যাকরণ হয় না? কবিতাও তো মনের আচরণ?
গুরু আমার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলেন যেন আমি নিতান্ত বালকের মতো কথা কইছি। তারপর ফের মন দিয়ে কামসূত্র পোড়াতে পোড়াতে বললেন, কামকলার সেরা মাধুর্য কী জানো? তা হল ক্রিয়াটি সাময়িক উন্মাদনার ফলশ্রুতি। ব্যাকরণ শিক্ষা করে কবিতা রচনা যেমন অসম্ভব তেমনই অসম্ভব কামশাস্ত্রজ্ঞ হয়ে যথার্থ বেগবান নায়ক হয়ে ওঠা। কবিতার অনুপ্রেরণা আর সম্ভোগের নিয়ন্তাও এক উন্মাদনা, যার শাস্ত্র হয় না।
বললাম, তা হলে এতকাল ধরে যা শিখলাম…
গুরু বললেন, সবই সত্য, তবে অধস্তন সত্য। অর্থাৎ যা বিবরণমূলক। এবার শিক্ষা কর ঊর্ধ্বতন সত্য, যা…
উৎকণ্ঠার বশে গুরুর কথার মধ্যেই বলে বসলাম, যা?
গুরু বললেন, যা স্বপ্নমূলক, অর্থাৎ অবাস্তব, অতএব দর্শনস্পষ্ট।
গুরুর ত্রিশ বছরের সান্নিধ্যে এমন হতভম্ব আমি হইনি কখনো। কামকলা অসম্ভব?
বললাম, মানুষের নিত্যকার ব্যবহারকে অসম্ভব বলছেন, দেব?
গুরু হাসলেন, বলব না? লিখলেটা কে? বাৎস্যায়নদেবই তো? যিনি জীবনে একবারটি সংগমে লিপ্ত হলেন না। অরণ্যের উপান্তে বসে ধ্যানবলে তিনি অরণ্যের অন্ধকারকে অনুমান করলেন।
বললাম, তাতে কি কামসূত্র বাস্তবতা হারায়?
গুরু বললেন, তা হারায় না, কিন্তু অমন বৃত্তান্ত থেকে কামকলার স্বপ্নিল অবাস্তবতায় পৌঁছোনো যায় না। সংগমের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকলেই রমণের অসম্ভবতা আবিষ্কার সম্ভব। বাৎস্যায়ন যা চেষ্টাও করেননি আর…
-আর?
—আর আমি ভানুপ্রিয়ার দীর্ঘ সঙ্গলাভে বুঝলাম যে সব মানুষই এক অর্থে কামারণ্যের উপান্তবাসী, সে অরণ্যের বাইরে থেকেই অনুমানে, অনুমানে তার ধারণা গড়ে নেয়। অরণ্যে প্রবেশ করলেও তা থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে সে বিশেষ কিছু স্মৃতি বহন করে আনে না। কিছু স্বাদ, বর্ণ, ঘ্রাণের স্মৃতির অতিরিক্ত সে সঞ্চয়ে রাখতে পারে না। কালে কালে তা-ও অন্য স্মৃতির মধ্যে মিশে অস্পষ্ট হয়ে যায়। এবং একসময় হয়ে যায় সম্পূর্ণ কল্পনা। হয়তো এই কারণেই ভানুপ্রিয়া কামকলাকে বলত কামকল্পনা।
আমি বলে উঠলাম, তা হলে কি এইজন্যই আপনার কামসূত্রাবলির আপনি নামকরণ করেছিলেন কামকল্পনা?
গুরু হেসে বললেন, হয়তো। হয়তো না!
সেইদিন থেকেই একটু একটু করে আমরা শিষ্যরা গুরুর কামকল্পনার পুঁথি চুরি করা শুরু করি। সবারই একটাই ভয়—গুরুর যা মতিগতি দাঁড়াচ্ছে তাতে অচিরে এসব পুঁথিও হয়তো চেলাকাঠের আগুনে যাবে! গুরুর সম্পদ আহরণ ধীরাজ মুনির মতে নির্বাসনযোগ্য অপরাধ জেনেও আমরা এর কাজ থেকে নিবৃত্ত হতে পারিনি। আমরা ধীরাজের অভিমতের বিরুদ্ধে মনে মনে প্রয়োগ করেছি কাশীর বিশ্রুত পন্ডিত ত্রিলোকনাথের যুক্তি : শিষ্যরাই গুরুর বৈধ উত্তরাধিকারী। আর আমরা তো স্বীয় স্বার্থে নয়, গুরুর ঐতিহ্য রক্ষার্থেই এ পথ ধরেছি। গুরুর সব রচনা আগুনে গেলে আমরা কোথায় দাঁড়াব? আমাদের মধ্যে একমাত্র যে নারীআশ্রমিক সেই নীলকান্তাই এ ব্যাপারে পথ দেখাল। গুরুর নিদ্রাযাপনের পূর্বে তাঁর শির ও পদযুগল মর্দনের সময়ে সে একটু একটু করে সরিয়ে আনতে শুরু করল কামকল্পনা পুঁথির ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়, অধিকরণ ও টীকা। আমরা কি ভুলতে পারি সেইসব সুখ ও আহ্লাদের দিন যখন জনগণের সুবিধার্থে গুরুদেব স্বীয় সূত্রের টীকা রচনায় ব্যাপৃত হলেন।
কিন্তু গুরুর ওই পুঁথি অপহরণের মধ্যেই যেন যত বিপত্তির উৎপত্তি। একবার মহামূল্যবান পুঁথি হস্তগত হলে কে আর তা পড়ার লোভ সংবরণ করতে পারে! আমরাও পারিনি। আর সেইসব পুঁথি থেকেই আশ্চর্য আশ্চর্য সব তত্ত্ব উদ্ধার হতে থাকল। যেমন রমণ প্রসঙ্গে গুরু এক বিস্তীর্ণ আলোচনায় বলেছেন যে, রমণের এক প্রধান উল্লাস আবিষ্কারে। যে কারণে সমস্ত পুরুষের মধ্যে নব নব নারীদেহ আবিষ্কারের তাড়না থাকে। যা থেকে জন্মে ক্রম-অতৃপ্তি, যা কারণ হয় চরিত্রনাশের। তবে কী নারী, কী পুরুষে রতি ও রমণে প্রকৃত আবিষ্কার হল রতির সমার্থক চিন্তাদি যেমন রস, প্রীতি, ভাব, রাগ, বেগ ও সমাপ্তির পূঢ়ার্থ তথা রমণক্রিয়ার সমার্থক চিন্তাদি যেমন সম্প্রয়োগে, রত, রহঃ শয়ন ও মোহনের মর্মোদ্ধার। এই কথা ঋষি বাৎস্যায়নের কীর্তিতে আছে, কিন্তু বাৎস্যায়ন আবিষ্কার-মাহাত্মকে গুরুত্ব দেননি। ফলে অভ্যাসবশত রতি ও রমণ ঔদাস্যকেও প্রশ্রয় দেননি। গুরু দেবানন্দ এই সুখী, সফল কামসূত্রকে বলেছেন যান্ত্রিক, যার রাসায়নিক, জৈবতাত্ত্বিক, মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নিটোল, কিন্তু তাতে রহস্য নেই, দুর্লঙ্ঘ্য প্রশ্ন নেই, চিন্তার ঝাঁপ নেই।
