তাঁর জ্ঞান ফিরতে বনমালী যখন তাঁর সর্বনাশা কীর্তির কথা শুনলেন, তিনি তৎক্ষণাৎ রেবার জলে ঝাঁপ দিলেন। আমি আর পুরন্দরদাস মাধবীর সৎকারটুকু শেষ করলাম রেবার তীরে। পুরন্দর অতঃপর তাঁর সমস্ত কবিতা জলে নিক্ষেপ করে মুনি মহাদিত্যের আশ্রমে ফিরে গেলেন। আর বেচারা আমি! আমি না ঘরের, না ঘাটের। আমি চিরকালের মতো
প্রবাসী হয়ে গেলাম। কারণ ভরতপুরে যাওয়া মানে শূলে চড়া। আমি এখন কোথায় যে যাব আমি নিজেও জানি না। আমার এই অভিজ্ঞতা আমি কাউকে কোনোদিন প্রাণ খুলে জানাতে পারব না। কারণ রাজার চর সর্বত্র। আমি আমার সাদামাটা ঢং-এ ভাবী কালের জন্য এই বিবরণ লিখে রেবার পাড়ে রোপণ করে যাচ্ছি। যদি কখনো কেউ এটি উদ্ধার করেন তবে তিনি যেন আমার ভাষা এবং ভাবের অক্ষমতাকে ক্ষমা করেন, ইচ্ছে মতন এই বিবরণকে আধুনিক ভাষায় জনগণের সামনে তুলে ধরেন। তবে অনুরোধ, এই ঘটনা এবং নামধাম যেন তিনি অবিকৃত রাখেন। এবং এই রচনার কৃতিত্বও যেন তিনিই নেন। আমি অখ্যাত অবলুপ্ত হয়ে থাকতে চাই।
কামকল্পনা
মহাগুরু দেবানন্দের শেষনিঃশ্বাসের অপেক্ষায় তাঁর শিষ্যকুল আমরা বসেছিলাম তাঁর শয়নকক্ষে।
শ্বাস-প্রশ্বাস ঠাওরানোর উপায় নেই, তাঁর বক্ষদেশ এতই অচঞ্চল। আদুল দেহে চিত হয়ে শুয়ে আছেন যেন গঙ্গার স্থির ভাসমান। শরীরে কোথাও বেদনা থাকলেও মুখে তার ছোঁয়ামাত্র নেই। শুভ্র শ্মশ্রুগুফে আবৃত মুখটায় আভাস বলতে একটাই—ক্লান্তির। গত পূর্ণিমায় গুরু অধ্যাপনা সাঙ্গ করে হঠাৎই বলেছিলেন, ধাতুক্ষয়ের জন্যই যেমন পুরুষ ও নারীর রমণক্রিয়ায় বিরামের ইচ্ছা জাগে তেমনই আত্মবিশ্বাস ক্ষয়েই মানুষের জীবনে বিরামেচ্ছা উৎপন্ন হয়।
বলা বাহুল্য, গুরুর এই মন্তব্যে আমরা প্রমাদ গুনেছিলাম। অকস্মাৎ মহামতি বাব্যের শ্লোক প্রয়োগ করে জীবন ও রমণপ্রক্রিয়াকে এক করে দেখানোর ইচ্ছা হল কেন আচার্যের। চিরকালই তো তিনি কামশাস্ত্রকার শ্বেতকেতু, বাভ্রব্য বা গোনৰ্দীয়ের শ্লোক উদ্ধৃত করে এসেছেন পূর্বাচার্যদের সঙ্গে নিজের মতানৈক্য বোঝাতেই, বলেছেন পূর্বাচার্যেরা সুরতক্রিয়ার যান্ত্রিক তত্ত্বই উদ্ধার করতে পেরেছেন, তার দর্শনের জগৎ তাঁদের কাছে অন্ধকারাচ্ছন্ন। তাঁর পরমশ্রদ্ধেয় বাৎস্যায়ন মুনিকে গুরু দেবানন্দ বলেছেন, কামশাস্ত্রের মনোবিজ্ঞানী। কিন্তু দার্শনিক? না, ও সম্মানটুকু তিনি কৃপণের মতো গচ্ছিত রেখেছিলেন শুধু একজনের জন্যেই।
নিজের জন্য? না, তাও না। ভানুপ্রিয়ার জন্য।
এই ভানুপ্রিয়াটি কে, তা দীর্ঘ ত্রিশ বছর তাঁর সঙ্গ করে একটা ধারণা হয়েছিল আমার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মানবীর চারিত্র্য ও প্রকার সম্পর্কেও আমার অনুমানে সঙ্কট দেখা দিয়েছে। কখনো মনে হয়েছে ভানুপ্রিয়া মহাবলীপুরমের কোনো রাজদুহিতা, কখনো বারাণসীর বিধবা, কখনো রেবতীর শাস্ত্ৰশীলা অন্তঃপুরিকা, কখনো উদয়নগরের বারবনিতা, কখনো গুরু দেবানন্দের মাতা, কখনো ভগিনী, কখনো বিচ্ছিন্না স্ত্রী কিংবা রক্ষিতা। আমার গুরুভাইয়ের নিজের নিজের মতো করে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা করে নিয়েছে ভানুপ্রিয়া সম্পর্কে। তবে যেহেতু শিষ্যকুলে গুরুর সঙ্গে আমারই সংসর্গ দীর্ঘতম তাই আমার ধারণাই কিঞ্চিৎ প্রাধান্য পেয়েছে এতাবৎ।
অথচ গুরুকে মুখ ফুটে কেউ প্রশ্নও করিনি কোনওদিন : আচার্য, ভানুপ্রিয়া কে?
গুরুর বয়স অশীতিপ্রায়, অথচ জরা তাঁকে গ্রাস করেনি। উল্লিখিত পূর্ণিমায়ও তিনি পাঁচটি নবনির্মিত শ্লোক আবৃত্তি করলেন কামনার শোক বিষয়ে। বললেন, যে গভীর আনন্দবর্ধন হয় তারও নিষ্পত্তি শোকে।
আমি তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন তুলেছিলাম, এ কী কথা, দেব? সুরতক্রিয়ার তীব্র আনন্দ কি নারী বা পুরুষকে তীব্র মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন রাখে না দীর্ঘসময়?
গুরু স্নানভাবে হেসেছিলেন। তারপর বললেন, সেই মুগ্ধতাও তো স্মৃতিমাত্র। আর স্মৃতির জন্ম বিচ্ছিন্নতায়, সুখসমাপ্তিতে, শোকে। রমণস্মৃতি তাই আন্দোলনমাত্র এক ধরনের চিত্তবিক্ষেপ, পিপাসার জন্ম, যার অপর নাম শোক।
বেশ কিছুকাল যাবৎই শুরুর শিক্ষায় এই এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে : তিনি কামকলাকে অনিবার্য যন্ত্রণা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। বলেছেন, শাস্ত্রকাররা বিধান দিলেও আমি কামকে ধর্ম ও অর্থের সঙ্গে ত্রিবর্গের অন্তর্ভুক্ত করতে পারি না। কারণ ধর্ম ও অর্থের দর্শন আছে, কামের দর্শন কোথায়? সুখ যে বর্গের অন্তিম লক্ষ্য তা দার্শনিকতাশূন্য। যে সুখ শান্তির স্তরে পৌঁছোয় না তার কোনো দর্শন হয় না।
এইসময় গুরুভাই গৌতম বললে, কিন্তু আচার্য, দেহের এই অপরিহার্য সুখ ব্যতীত কি জীবনে শান্তি আসতে পারে?
গুরু তাঁর সদ্যরচিত শ্লোকগুলির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বললেন, নারী-পুরুষের জীবনে শান্তি আনে প্রেম, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সমর্থন যা ধর্মের পথে আসে কাম তার সামান্য উপকরণ মাত্র। কামজনিত অনুরাগে প্রেমের উদগম হয়, তার বিশুদ্ধিকরণ হয় ধর্মে। তবেই শান্তি।
এরপর গৌতমের মতো বাকি সবাই নিশ্ৰুপ হয়ে রইলাম। গুরু বলতে থাকলেন, মুনি বাৎস্যায়ন কামের সুস্থ সামাজিকতা দেখিয়ে গেছেন। আচারও। সংযত কামকে বলেছেন ধর্মাচার। কিন্তু সেই ধর্মাচারেও অধ্যাত্ম কোথায়? দার্শনিকের নিমগ্ন তপশ্চর্যা কোথায়? দার্শনিকের নিমগ্ন তপশ্চর্যা কোথায়? চতুর্দিকে দেখি স্থূল, পৃথুল কামকলাপ নিয়ে কবিরা কাব্যনির্মাণ করছে, এক কাল্পনিক কৃষ্ণ সৃষ্টি করে তাঁকে রতিসাগরে নিক্ষেপ করছে, বিস্মৃত হচ্ছে গীতার অবতারকে। কেবল ভানুপ্রিয়াই একটা সত্য উচ্চারণ করেছিল : কাম নিয়ে অজস্র গোপনীয়তা রক্ষা করা হয় বলেই কবিদের তাই নিয়ে এত আদিখ্যেতা। মানুষ কুকুর বিড়ালের মতো সর্বসময়ে কামে লিপ্ত হলে কে আর তা নিয়ে কাব্য ফলাত? চক্ষুলজ্জা, সমাজবিধান এই সবই কামকে কবিতা করেছে।
