কবিতার এই নিন্দে শুনতে শুনতে শিবনিন্দায় আর্ত সতীর মতন মাধবী ধীরে ধীরে স্তব্ধ হতে থাকল। তারপর মনের এক মোহাচ্ছন্ন পরিমন্ডল থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারণ করল :
পত্রমর্মরও তার বেদনা বোঝেনি,
যার বাস শ্রাবন্তীর সীমানা পেরিয়ে,
দিবসের প্রথম বিহঙ্গ তাকে দেখেছে ক্কচিৎ,
শোনায়নি গান তাকে বিহ্বল বাতাস।
আমি তার যাত্রাপথে থাকি, যদিও পিছিয়ে,
আমি দেখি গমনাগমন কত মানুষের
মৃত্যু ও শোকে।
আমি দেখি পশ্চিমা বায়ু
কীভাবে মত্ত করে বন,
কীভাবে পালিত পশু প্রাণপণ
ধরে রাখে নিজেদের প্রাণ!
মর্ত্যভূমি বড়োই কঠিন ঘর,
যাওয়া-আসা নিয়ত আছেই,
যারাই যত্নে বাঁধে সুখনীড়
তারাই ভাঙে তা কালে দু-হাতে।
সব শোকই যাত্রাপথে আছে
সব সুখই যাত্রা পথে রয়
যতদূর যাত্রা করা যায়।
তিনি আর কতদূর যান?
আমি আর কতখানি যাব?
এ তো শুধু যাওয়া, শুধু যাওয়া,
আমার হৃদয় শুধু পথ।।
তার উচ্চারণ শেষ হওয়ার পরও মাধবীর ঘোর কাটল না! অনুরূপ এক ঘোরের মধ্যে ছিলাম আমরাও। কবি বনমালীও বুঝলেন রাজকন্যার কী সর্বনাশ তিনি করে দিয়েছেন। কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে তিনি কেবল নিজেকেই ধিক্কার দিতে থাকলেন। বললেন, মাধবী আমি পাষন্ড। আমি নরাধম। আমি কবিতার অনুপ্রেরণার জন্যই তোমাকে প্রতীক করে ব্যবহার করেছি। আমি তো তোমায় ভালোবাসিনি। আমি তো কাব্যের খাতিরে তোমার নাম, তোমার ব্যক্তিত্বের মূৰ্ছনাকে কাজে লাগিয়েছি। আমার কবিতার মাধবী আর তোমার জীবন্ত সত্তার মধ্যে তো দুস্তর ফারাক। তুমি জীবন্ত, তুমি ভগবানের সৃষ্টি। আমার কবিতার মাধবী তো ছায়া, একটা মানুষের কল্পনার পরিণতি। আমার কবিতার মাধ্যমে তুমি নিজের বিন্দুমাত্র সত্য দেখতে পাও না। তুমি ফিরে যাও। তুমি এই ভয়ংকর, মর্মান্তিক কল্পনার পথের যাত্রী হয়ো না মাধবী। তোমার তো সব আছে। যাদের কিছুই নেই সেই ভিখারিরাই এই কবিতার নকল জগতে আসে। যারা কিছুই পায়নি জীবনে তারাই শব্দের, ধ্বনির জগতে নকল রাজা সাজে। তারা যে নকল তারা তা নিজেও জানে না। আমি যে গাছটিকে মাধবী বলে স্নেহ করতাম সে তো কখনো মাধবী হবে না। তেমনি আমার কবিতা।
গাছের প্রসঙ্গ আসতে মাধবী ইশারা করে থামিয়ে দিল কবিকে। কবি, আপনি যে গাছটিকে মাধবী জ্ঞানে প্রণয় করতেন তাকে আমি শিল্পীর দ্বারা মাধবী করেই আমার কক্ষে রেখেছি। সেও আমার মতনই সত্য।
না, সে শুধু প্রতিকৃতিমাত্র। সে কখনো তুমি নও। কল্পনার তো শরীর হয় না।
কিন্তু আপনিই না বলেছিলেন শরীরের সত্য মুছে গেলেও কল্পনার সত্য জেগে থাকে।
তাহলে বলি। আমি রেবার পাড়েও একটি গাছকে মাধবী মনে করে স্নেহ করে থাকি। সেও কি মাধবী তাহলে?
হ্যাঁ, সেও মাধবী। যদি আপনার কল্পনায় প্রাণ থেকে থাকে, যদি আমার বাস্তব এবং আপনার কল্পনার পরমপ্রণয় থেকে থাকে।
মাধবীর এই কথা শোনামাত্র কবি বনমালী ত্রস্ত পায়ে রেবার কূলের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তাঁকে অনুসরণ করলাম আমি, মাধবী, পুরন্দরদাস এবং ভবতোষ। তখন বেলা পড়ে এসেছে। কূলে এসে সমস্ত বস্ত্র ছুড়ে ফেলে ঝাঁপ দিলেন জলে। একটু বাদেই ভেসে উঠে এক গলা জলে দাঁড়িয়ে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতাগুচ্ছ আবৃত্তি করতে লাগলেন। ক্রমে গোধূলির শেষ রশ্মিও বিলীন হল। নির্জন কূলে দাঁড়িয়ে তিনজন মন্ত্রমুগ্ধের মতন সেই অনির্বচনীয় কবিতা শুনতে থাকলাম। একসময় চন্দ্রোদয় হল! চন্দ্রের আলোকে উদ্ভাসিত হল কবির মুখ, কবির দেহ। তিনি যন্ত্র চালিতের মতন সমস্ত লাজ-লজ্জা ভুলে কূলে উঠে এলেন এবং পাড়ের গাছটির সঙ্গে সংগমে নিমগ্ন হলেন। আমরা স্তম্ভিত হলাম দেখে যে অদূরে রাজকন্যা মাধবীও তার সমস্ত বস্ত্র একে একে ত্যাগ করে সম্পূর্ণ নিরাবরণ মাটিতে কাতরাতে লাগলেন। তার শরীরের ভাব দেখে মনে হল বুঝি বা কোনো অদৃশ্য প্রাণী তার সঙ্গে অলৌকিক এক রতিক্রীড়ায় মগ্ন হয়েছে। আমরা আরও আশ্চর্য হলাম দেখে যে, যে ভঙ্গিতে বনমালী গাছটিকে আকর্ষণ করছেন, তার শরীরে নিজেকে প্রয়োগ করছেন, তারই সংগতি যেন মাধবীর অঙ্গভঙ্গিতে!
আমি জানি না আমরা কতক্ষণ এই দৃশ্য দেখেছি। আমাদের বক্ষ বিদীর্ণ হয়েছে বেদনায় যখন আমরা দেখলাম একেবারে উন্মাদের মতন কবি বনমালী তাঁর গাছকে নিগ্রহ করছেন। তাঁর দুই হাতের পেষণে তখন বৃক্ষের সমস্ত শরীর যেন বাষ্পরুদ্ধ। যেন ছটফট করছে। আমরা দৌড়ে গেলাম তাঁকে বৃক্ষের থেকে আলাদা করে দিতে। কিন্তু হায় নিয়তি! ততক্ষণে অদূরে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণত্যাগ করেছে রাজকন্যা মাধবী। আমরা তার শরীরের পাশে গিয়ে দেখলাম তার কণ্ঠদেশে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে দশ আঙুলের দাগ। আমি তার মাথার কাছে ঝুঁকে ডাকলাম, মাধবী! মাধবী! কিন্তু মাধবী তখন গাছ। কিংবা গাছের মতন।
এই তার শ্রেষ্ঠ সুযোগ বুঝে ভবতোষ ‘খুন! খুন!’ বলে চিৎকার করে নগরীর দিকে দৌড়োতে লাগল। তার জীবনের যা কিছু প্রাপ্য দাক্ষিণ্য তখন নির্ভর করছে বনমালীকে খুনি প্রমাণ করার মধ্যে। সেইসঙ্গে আমাকেও চক্রান্তের অংশীদার করায়। কারণ কোন সভা বিশ্বাস করবে মাধবীর অলৌকিক সংগম এবং মৃত্যুতে? আমার শুধু দুঃখ হয় হতভাগ্য ভবতোষ এই পরম অলৌকিক দৃশ্য দেখার পরও চরিত্রগতভাবে এতটুকু বদলাল না!
