পুরন্দরদাস এই কবিতা পড়তে পড়তে কাঁদছিলেন। কবিতা শুনতে শুনতে কাঁদছিল মাধবীও। আমি মূর্খ এই শব্দ টুকতে ঢুকতে ভাবের ঘরে ঢুকতেই পারিনি। অথচ নিয়মের খাতেই জিজ্ঞেস করে বসলাম, মাধবী, এই কবিতা তোমার কেমন লাগল? আর অমনি ভূতে পাওয়ার মতন মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের চুল ছিড়তে ছিড়তে মাধবী কান্না ধরল। এই সর্বনাশ তুমি আমার কেন করলে শৌনক? কেন তুমি আমার সঙ্গে শঠতা করলে? এরকম কবিতা আমি বাল্যে শুনেছি কবি বনমালীর কাছে। কেন তুমি আমার সেই হারানো স্মৃতি জাগাতে আজ এই কবিকে আনলে? ইনি তো আমায় নতুন কিছু শোনালেন না। আমি ভেবেছিলাম ইনি নারীর মধ্যে নারীর চেয়েও মহৎ কোনো সত্তার কথা বলবেন। সেরকম কবিতা আমি মাঝেমধ্যে স্বপ্নে শুনে থাকি! যে কবিতার মাধ্যমে আমি আমার সমস্ত অতীতকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলব, সেরকম একটা কবিতাও আমি লিখে ফেললে বনমালীর ওই শব্দের গহ্বর থেকে আমি নিষ্ক্রান্ত হতে পারব। শৌনক, তুমি জানো না আমি কী অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে কাল অতিবাহিত করছি। বনমালী আমাকে শুধু একটা নেশায় নিক্ষেপ করে গেছে। সেখান থেকে বার হবার পথ সে আমায় জানিয়ে যায়নি। আর একবারও যদি তার দেখা পেতাম। হায়, অভাগা আমি! আমার কবিতায় বনমালী যে কীরকম ঈশ্বরের মতোন অমোঘ তা যদি তাকে জানিয়ে দিতে পারতাম!
মাধবীর এই বিলাপ চলল বহুক্ষণ। পুরন্দর ঋদ্ধিযুক্ত মানুষ হলেও অন্য পুরুষের প্রশংসা বা কদর তাঁকে বিচলিত করে না। বিশেষত বনমালীর কদর তো নয়ই। শ্রাবন্তী থেকে উজ্জয়িনী আসার পথে তিনি আমায় বলেছিলেন যে, নারীর রহস্য সম্পর্কে মহাকবি অমরুর চেয়েও বনমালীর ভাবনা অনেক ক্ষেত্রে গভীর এবং আধুনিক। অথচ মাধবীর ব্যবহারে সেই পুরন্দরদাসও বেশ ভালোরকম অস্বস্তি বোধ করছিলেন। আমি নিজেও একটি বিশেষ অর্থে মাধবীর প্রণয়ী। আমি তাঁকে স্ত্রী করতে চাই না কিংবা শারীরিকভাবে পেতে চাই না। ওকে দূর থেকে একটা শিল্পের নমুনা হিসেবে দেখায় আমার বিপুল তৃপ্তি। যে আনন্দ আমি পেয়েছি উজ্জয়িনীর কোনো প্রস্তর মূর্তি দর্শন করে। কিংবা বিষণ্ণ সন্ধ্যাকালে শ্রাবন্তীর পার্শ্ববর্তী রেবা নদীর দিকে তাকিয়ে।
আমাদের দুজনের মনোভাব তখন কী করি? কী করি? অতঃপর আমিই বললাম মাধবীকে, তুমি যদি পিতার অনুমতি পাও আমি তোমাকে বনমালীর কাছে একটিবার নিয়ে যেতে পারি।
রাজাকে বোঝানো যে কী দারুণ কষ্টকর ব্যাপার ছিল তা আর না-ই বললাম। তাঁর একমাত্র কন্যা তায় অন্ধ এবং অসুস্থ, তাকে কিছুতেই তিনি আমাদের সঙ্গে ছাড়তে রাজি নন। কিন্তু মাধবীও নাছোড়বান্দা। কবি পুরন্দরও তখন অনুমতির জন্য কাকুতিমিনতি করলেন। শেষে রাজি হওয়া সত্ত্বেও আমার অভিসন্ধির ওপর নজর রাখতে তিনি আমাদের সঙ্গে ভবতোষকেও পাঠালেন। রাজার ভাবনা হল যে, পুরো ব্যাপারটাই যদি বনমালীর একটা চক্রান্ত হয় তাহলে তাঁর পরমশত্রু ভবতোষ অন্তত তাঁর সাধের গুড়ে বালি দেবে। রাজার নিজেরও ভীষণ যাবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু শ্রাবন্তীর সঙ্গে ভরতপুরের সম্পর্ক ভালো নয় দেখে তিনি আর ওদিকে এগুলেন না।
আমরা যখন শ্রাবন্তীতে এসে হাজির হলাম মাধবী এক আশ্চর্য কথা বলে বসল। ওর ধারণা ও স্বপ্নে এই নগরীতে বিচরণ করেছে। চোখে দেখে না অথচ প্রতিটি অলিগলিই যেন তার চেনা। সহসা পালকিতে বসেই সে জিজ্ঞেস করল, এই নগরীর উত্তর-পশ্চিমে রেবা বলে নদী আছে না? আমি বললাম, হ্যাঁ—সেই নদীর পাড়ে যেখানে পুরবাসীরা স্নান করে সেখানে মাধবী নামে একটা গাছ আছে না?
আমি সে-বিষয়ে কিছুই জানতাম না, তাই পালকির বাহকদেরই জিজ্ঞেস করলাম। তারা তো সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, আছে মহাজন! নিশ্চয়ই আছে। নগরীর মেয়েরা ওই গাছে নানান রকম মানত ঝুলিয়ে রাখে। কেউ কেউ বলে ওটা কোনো এক মহাকবি পুঁতে গিয়েছিলেন।
যখন মাধবীকে বললাম সেই কথা ও কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে গেল। তারপর যেন কোনো এক স্বপ্নের অতল থেকে আচ্ছন্নভাবে বলল, শৌনক, আমিই ওই গাছ।
৩.
মাধবী এবং বনমালীর সেই সাক্ষাতের দৃশ্য আমি বর্ণনা করার উপযুক্ত লোক নই। আমার কাষ্ঠশুষ্ক বিবরণে সেই মুহূর্তের তাৎপর্য কিছুতেই বোঝা যাবে না। মাধবীর দৃষ্টি নেই দেখে বনমালী চোখের জল সামলাতে পারলেন না। মাধবীর গন্ডদেশ থেকে অশ্রু মোছাতে মোছাতে কবি বললেন, মাধবী, কেন যে মানুষ কোনো কবিকে দ্রষ্টা বলে আমি জানি না। সে তো তার নিজের অধঃপতনও তার কবিতায় আঁচ করতে পারে না। তাহলে তোমার …
কবিকে কথার মধ্যেই থামিয়ে দিল মাধবী। না, না কবি, আপনি কবিতাকে ছোটো করবেন। কবিতা যে কিছু দেয় না তা আমিও বুঝি। কিন্তু কবিতা যা দেয় তা তো কেউই বোঝে। আপনিই না আমায় বলেছিলেন একসময়, ব্রহ্মার সবচেয়ে বড় সৃষ্টি কবি কালিদাস! আপনিই না বলেছিলেন কবি ত্রিকালদ্রষ্টা! আপনিই প্রমাণ করেছিলেন যে হিমালয় পর্বতের অস্তিত্বের অতিরিক্ত সত্য নিহিত আছে কবি কালিদাসের হিমালয়ের বর্ণনায়? হিমালয় স্বয়ং যতখানি সত্য তার চেয়েও মহিয়ান কবির বর্ণনা—সেও তো আপনারই তত্ত্ব নয় কি!
এইভাবে ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে উঠছিল মাধবী। কিন্তু গোঁয়ার মানুষ বনমালীও। তিনি বললেন, আমি এখন বলছি কবিতা ছায়ামাত্র। কবিতা গোলকধাঁধা। কিন্তু আমার পূর্বের ধারণার গোলকধাঁধাও সে নয়। সে গোল নয়, সরল রেখামাত্র। এর কোনো আদি নেই, অন্ত নেই। সরল রেখার মতো ভীষণ গোলকধাঁধা আর কিছুই নেই। কেউ জানবেও না যে এই রেখা কোন বিন্দুতে বিদ্যমান। তাই আমি বলি কবিতা হল শেষমেষ এক অনন্ত নির্যাতন। এক অপরূপ সর্বনাশ।
