আমি তিনদিন চিত্রার আতিথ্য গ্রহণ করে শেষে দেশে ফিরলাম পুরন্দরদাসকে সঙ্গে নিয়ে। পুরন্দরদাস মাধবীকে মুগ্ধ করার মধ্যে নিজের প্রেমের কবিতার সার্থকতার সম্ভাবনা দেখলেন। আমি তাঁকে বোঝালাম মাধবীর অনুমোদন পাওয়াই কোনো প্রেমের কবিতার উত্তীর্ণ হওয়ার লক্ষণ বলে ধরে নেওয়া যাবে। এইরকম নানান তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে আরেক ফাযনী পূর্ণিমার রাত্রে আমরা দু-জন বৈরাগীর তীরে এসে উপনীত হলাম। আমি গোটা পরিবেশটাকে বনমালীর কবিতার অনুপ্রেরণা বলে ব্যাখ্যা করলাম। পূর্ণিমার রাতে বৈরাগীর রূপ দেখে ভাবাবিষ্ট পুরন্দরদাস তাঁর প্রেমের কবিতা উচ্চৈঃস্বরে আবৃতি করতে লাগলেন। জলে প্রতিফলিত পূর্ণচন্দ্রের মাধুর্যের সঙ্গে তাঁর কবিতার লালিত্য একাকার হয়ে যেতে থাকল। আমরা কবিতায় এবং প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় অবগাহন করে একটা রাত কাটিয়ে দিলাম। ভোরের আলোয় আবার হঠাৎ একটা খেয়াল হল যে, যে গাছটির সঙ্গে কবি বনমালীর অজস্র প্রণয় ছিল, এবং যেটিকে মাধবীর নির্দেশে বহুদিন আগে আমি সমূলে উৎপাটিত করেছিলাম ঠিক সেখানেই একটা শুচিস্মিতা মাধবীলতা জেগে উঠেছে। সেই লতার সর্বাঙ্গে ভোরের শিশির ভিড় করে এসে জমেছে।
আমি এবং কবি যখন প্রাসাদে মাধবীর কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে, আমাদের কানে এল মাধবীর অস্ফুট কন্ঠে বেদ গানের মতন কিছু একটা। আমি দ্বারে আঘাত করে ডাকলাম, মাধবী! দ্বার খোলো। আমি তোমার জন্য কবিকে এনেছি।
বহুক্ষণ পার হয়ে গেল কিন্তু মাধবী দ্বার খোলে না। আমি তখন বাগানের দিকে মাধবীর ঘরের যে জানালা আছে সেইদিকে নিয়ে গেলাম কবিকে। বাগানে তখন ফাযনের ফুলের ঐশ্বর্য। সূর্যের কিরণে কবি পুরন্দরদাসকে সাক্ষাৎ কোনো দেবদূতের মতোন ঠাওর হচ্ছে। গায়ে তাঁর গৈরিক বসন, যাতে বৈরাগ্যের চেয়ে ধর্মের আভাই বেশি। তাঁর অত্যুজ্জ্বল চক্ষু, উন্নত শির, তীক্ষ্ণ নাসিকা এবং স্পন্দমান ওষ্ঠ পৌরুষের সমস্ত আবেগকে যেন জীবন্ত করে তুলেছে। ক্ষণিকের জন্য আমার মনে হল পুরন্দরদাস বুঝি কোনো নাটকের চরিত্র, লিখিত পৃষ্ঠার থেকে উৎসারিত হয়ে দেহধারণ করে আজ এইখানে। আমি আবার সজোরে ডাকলাম, মাধবী!
নিজের মাধবী ডাকে নিজেই মুগ্ধ হয়েছিলাম। দেখিনি কখন মাধবী এসে জানালায় দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সে চেয়ে আছে অনন্তের দিকে, আমাদের দিকে তার নজর নেই। আমি বললাম, মাধবী! আমি তোমার জন্য কবি এনেছি। কবিতায় এঁর সিদ্ধি কবি বনমালীর চেয়েও বেশি। ইনি তোমার জন্য কবিতা লিখেছেন, তুমি শুনবে?
হারানো সখাকে খুঁজে পেলে মানুষের মনে যে ভীষণ বিস্ময় এবং আনন্দের উদ্ভাস হয় ঠিক সেই রকম কিছু ঘটে গেল মাধবীর মধ্যে। সে শিশুর মতন বেণী আকর্ষণ করতে করতে বলল, এ তুমি কী দারুণ কথা শোনালে শৌনক! তুমি এখনই কবিকে নিয়ে এসো আমার কক্ষে। আমার তো দৃষ্টি শক্তি আর নেই, আমি ওঁর কবিতার মাধ্যমে চিনে নেব আমার পুরোনো জগৎকে। তুমি এক্ষুনি নিয়ে এসো ওঁকে।
আমার বুকের মধ্যে রক্ত সহসা হিম হয়ে গেল। নিরন্তর অনাহার এবং অশ্রুপাতে মাধবীর চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। আমি ওর সামনাসামনি এসে বললাম, তুমি নিজের একী সর্বনাশ করেছ মাধবী? তুমি কবিতার জন্য নিজের সব খুইয়ে দিলে?
মাধবী ম্লানভাবে হাসল। বলল, কবিতা তো কখনো কিছু দেয় না। যেটুকু তুমি সাধনা করে কবিতার থেকে নিতে পার তার অনেক বেশি কবিতাই তোমার থেকে নিয়ে নেয়। কিন্তু সে কথা যাক। আমি কবিতা শুনতে চাই। কবি পুরন্দর, আপনি আপনার কবিতা শোনান।
মাধবীর উপস্থিতিতে কীরকম আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন পুরন্দর দাস। তিনি বিনয়ী কণ্ঠে বললেন, আমি জীবনের অধিকাংশ সময় আধ্যাত্মিক কবিতাই লিখেছি। প্রেমের কবিতা ক বছর মাত্র। যদি ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকে আপনি ক্ষমা করে দেবেন।
এর পর কবি পুরন্দর তাঁর কবিতা পড়তে শুরু করলেন। আমি তো কবি নই, তা-ও ওই সময়ে যতখানি পেরেছি তাঁর কবিতা টুকে রাখার চেষ্টা করেছি। আমার লেখায় কবির কাব্যগুণ যথাযথ না এলেও তার ভাবটুকু আসবে। আমি তাই শোনাচ্ছি আপনাদের। কবি পড়লেন :
চন্দন চর্চিত তোমার আনন প্রিয়ে
অরণ্যের প্রায় কোনো অনন্য উপমা।
ক্লান্ত পথিক যেন হারিয়ে গিয়েছে কোনো আলোকিত দিনে
সে রহস্য তুমিই জেনেছ প্রিয়তমা।
আমরা পান্থশালে, নিতান্তই আশ্রিত জীব,
আমরা জানি না কেন তোমার প্রভঙ্গে কাঁদে মেঘ,
তোমাকে বাঁধার মতো কোনো রঞ্জু আমাদের নেই,
তোমাকে বন্দনা করে সেরকম কবিও চিনি না।
তোমাকে ব্যাখ্যা করে যারা
সে ফুল আজ ফোটে না এখানে;
তোমার গাছের মতো গাছেরাও বি
গত খরায় মারা গেছে।
আমরাই পড়ে আছি শুধু, তোমার পূজারি,
রাজকোষে নিয়মিত অর্থ দিয়ে যাই,
আমাদের পরিবারে নানা শোক,
সে তোমার না জানাই শ্রেয়।
তোমাকে যে চন্দ্র করে আলোকসম্পাত,
সে কেবল আমাদের উন্মাদই করে,
আমরা দুঃখী লোক দুঃখ দিয়ে তোমাকে গড়েছি।
তারপর বসে আছি রাজকীয় কোনো কালিদাস
এসে কবিতার তীব্র অসি হেনে
চিরে দেবে আমাদের বুক,
অশ্বপৃষ্ঠে তোমাকে বসিয়ে, নিয়ে যাবে অনেক সুদূরে।
আমাদের ভাগ্য প্রিয়ে এই,
চিরকালই ভাগ্য এই ছিল,
আমাদের মধ্যে কেউ কবি হতে চায়নি কখনো,
কালিদাস নামে কেউ বেশিদিন বাঁচে না এখানে।
