প্রতিভার মানুষ। চতুর্দিকে লোক ছোটালেন বনমালীকে সসম্মানে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু কোথাও তাঁকে খুঁজে পেলেন না। এমনকী উজ্জয়িনীতেও না। উজ্জয়িনীর রসিকসমাজও বনমালীকে পাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে দেখা গেল। কিন্তু তাঁরাও কোনো খোঁজ পান না। আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে শিখলাম গোটা জগৎটাই একটা মস্ত গোলকধাঁধা। কোথায় এর প্রবেশ দ্বার, কোথায় বেরুবার পথ তা কেউ জানে না।
দিনের পর দিন যায় কিন্তু মাধবী অন্নজল বিশেষ স্পর্শ করে না। যদি কখনো ইচ্ছে হয় তো গুটিকয়েক ফলমূল মুখে দেয়। কিন্তু সে-ইচ্ছাও তার বিশেষ একটা হয় না। মাঝে-মধ্যে খড়ি দিয়ে ঘরের মেঝেতে দু-টি চারটি কীসব লেখে। তারপর নিজের চোখের জল দিয়েই সব ধুইয়ে দেয়। সাদা কাপড়ে ঢাকা সাগরের ফেনার মতো গায়ের রং। এক অদ্ভুত বৈধব্যের ভাব আসে মাধবীর চেহারা থেকে। আমি শেষকালে আর অশ্রুসংবরণ করতে পারলাম না। মায়ের অনুমতি নিয়ে বনমালীর খোঁজে বেরুলাম উত্তরের দিকে।
উত্তরের পাঠ শেষ করে একদিন দক্ষিণে গেলাম। তারপর একবার পূর্বে, একবার পশ্চিমে। তারপর ঘুরতে ঘুরতে একসময় ভরতপুরেই এসে উপস্থিত হলাম। গত চার বছরে রাজ্যের বহু কিছু বদলেছে। ইতিমধ্যে দেহ রেখেছেন আমার স্বজাতির অনেকেই। আমার কথা ভেবে ভেবে মা শয্যাশায়ী। বিবাহিতা বোনই এসে এসে তাঁকে দেখে যায়। আমার পিতা আমার উপর ক্ষুব্ধ। তিনি আমার সঙ্গে বাক্যালাপই করলেন না। আমাকে চিনতে পারল না স্বয়ং মাধবীও।
রাগে-দুঃখে আমি আবার দেশত্যাগ করলাম। এবার আর বনমালীর সন্ধানে নয়, নিজের দৃপ্ত যৌবনের সমুদয় আকাঙ্ক্ষা নিবৃত্তির জন্য। এবং মাসান্তে উপস্থিত হলাম শ্রাবন্তীর এক পানশালায়। দেহের সমস্ত কোষ আমার তখন মদের স্পর্শ, নারীর স্পর্শ চাইছে। আমি সবচেয়ে বড়ো পাত্রের, সর্বাধিক মূল্যের মদ হাতে নিয়ে ক্রমশ অন্ধকারে বারবধূ চিত্রাঙ্গিনীর ঘরের দিকে এগোলাম। শ্রাবন্তীতে চিত্রাঙ্গিনীর বিপুল খ্যাতি। তার রূপের, বাক্যালাপের এবং রঞ্জকতা গুণের কথা মানুষের মুখে মুখে। সবাই তাকে স্নেহ করে চিত্রা বলে ডাকে। আমি কড়া নাড়তেই সে নিজের দ্বার খুলে দিল। আমি সেই রাত্রের মতো তার সঙ্গকামী জেনেও সে কিছুতেই আমায় নিতে চাইল না। অবশেষে অনেক অনুরোধের পর হাতের মদটুকু আমাকে তার ঘরে বসে শেষ করার অনুমতি দিল। আমি ঘরের আবছা আলোয় মদে জল মেশাতে গিয়ে খেয়াল করলাম চিত্রার বিছানার ওপর হাতে পানপাত্র নিয়ে তুরীয় আনন্দে বসে আছেন কবি বনমালী!
প্রথম প্রথম তো আমাকে চিনতেই চান না বনমালী। অনেক বুঝিয়ে-কয়ে যখন তাঁকে সুস্থির করা গেল তিনি বললেন, আমি তো কবিতার কিছুই জানি না! আমি জানতাম কোনো কবি নারীকে সঙ্গে করে কবিতায় প্রবেশ করে ঈশ্বরের সান্নিধ্যে সেই পরিবেশ থেকে উত্তীর্ণ হন। কিন্তু দেশত্যাগ করার পর এই শ্রাবন্তীনগরে আমার সঙ্গে পরিচয় হয় কবি পুরন্দরদাসের। তিনি একুশ বছর মুনি মহাদিত্যের আশ্রমে বৈদিক কবিতাচর্চা করেছিলেন। তিনি নিজেও ছিলেন অতি উৎকৃষ্ট কবি। কিন্তু তিনি কেবল ঈশ্বরকে নিয়ে কবিতা লিখতেন। যার গভীর তত্ত্ব খুব কম লোকই বুঝে উঠতে পারত। এবং আশ্চর্য! এই পুরন্দরদাস কিন্তু ভিখারির মতন মা সরস্বতীর কাছে বাঞ্ছা করতেন নারী সংক্রান্ত কবিতা লেখার কৌশল। শেষে একদিন তিনি আশ্রম ত্যাগ করে শ্রাবন্তীর এই রঙ্গিনীর কাছে এসে কাম মাহাত্মের অভিজ্ঞান প্রার্থনা করলেন! দেশত্যাগের মর্মাতনায় আমিও তখন চিত্রার ঘরে। আমাদের অর্থ সম্বল নিতান্তই সামান্য। আমরা নিজের নিজের কবিতা পাঠ করে চিত্রার অঙ্গসুখের মূল্য দিলাম। এবং প্রত্যুষের আলোর আভায় আমরা একে অন্যকে নিজের কবিতা শোনালাম।
এতক্ষণ কথা বলতে বলতে রীতিমতো শিহরিত, কিছুটা উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন বনমালী। এবার আমার হাত চেপে ধরে বললেন, শৌনক! দু-জনের কবিতার মধ্যে আমরা দু-জনেরই কবিতার পরিণতি দেখলাম। আধ্যাত্মিক কবি পুরন্দরদাস দেখলেন তাঁর ঈপ্সিত কবিতার মূর্তি আমার কাব্যে। রূপলাবণ্য এবং প্রকৃতির কবি আমি আমার শেষ দেখলাম তাঁর কবিতায়। আমরা বুঝলুম আমরা কেউই তৃপ্ত নই, কেউই পূর্ণ নই। আমরা কবিতার গোলকধাঁধার দুই ভিন্ন পথ ধরে তার মধ্যবিন্দুতে এসে যথার্থই দিশেহারা!
সেদিন দু-জন দুজনকে ধরে সারাটা সকাল কাঁদলাম। আমাদের ঘোর ভাঙল যখন তিতিবিরক্ত চিত্রা এক কলস জল আমাদের মাথায় ঢেলে দিল।
সেই থেকে আমি আর কবিতা লিখি না। কিন্তু হায়! মূর্খ পুরন্দরদাস এখনও তাঁর প্রণয়ী কবিতা রচনা করে চলেছেন। আমি আজকাল শেঠ বানারসী দাসের ব্যাবসার খাতা লিখে জীবিকা অর্জন করি। পুরন্দরদাস তাঁর কবিতার পাশাপাশি শ্রাবন্তীর স্বনামধন্যা গণিকাদের জীবনী এবং এই দেশের গণিকাবৃত্তির ইতিহাস লিখে প্রভূত আয় করে যাচ্ছেন। আমার ধারণা তিনি ভাবী কালের কাছে অমর হয়ে থাকবেন তাঁর এই গবেষণার জন্য। তাঁর কবিতা সবাই ভুলে যাবে।
কিন্তু আমি শৌনক দত্ত অতীব নাছোড়বান্দা। আমি জেদ ধরলাম মাধবীর প্রাণরক্ষার্থে বনমালীকে একবার অন্তত ভরতপুরে ফিরে যেতে হবে। এবং ততোধিক কৃতসংকল্প দেখলাম কবি বনমালীও। যে রাজ্য তাকে নির্বাসিত করেছে সে রাজ্যে তিনি কিছুতেই পা রাখবেন না। আমার কাতর মিনতি শুনে চিত্রাও অশ্রুসিক্তা হল। সেও মিনতি করল কেবল একবারের জন্য বনমালীকে দেশে ফিরতে। কিন্তু কে কার কথা শোনে!
