মাধবীর এই বাগ্মিতায় সভায় অনেকের চোখে জল এসে গিয়েছিল। স্বয়ং বনমালীই
কিছুক্ষণের জন্য বিমূঢ় হয়ে গেলেন। তাঁর ধারণা হল তিনি অতিঅবশ্যই এক সাংঘাতিক ক্ষতিকারক কবি। এবং এই ধারণার বশে তিনি সভার মধ্যে চেঁচিয়ে ঘোষণা করলেন, রাজন! এই কন্যা অতিসত্য কথা বলেছেন। আমার মতন কবিকে নির্বাসন দেওয়া গুরু পাপে লঘু দন্ড। আমাকে বরং আপনি পাগলা কুকুর দিয়ে খাওয়ান।
সঙ্গে সঙ্গে বনমালীর চেয়ে তীব্রতর কণ্ঠে আপত্তি জানালেন মাধবী। না না রাজন! আপনি ওই শঠের শাঠ্যে ভুলবেন না। ও ওই মৃত্যুর মাধ্যমে সামাজিক লাঞ্ছনা এড়াতে চায়। এতকাল আমাদের বোকা বানানোর শাস্তি ওকে দিতে পারেন উজ্জয়িনীর পন্ডিতেরা। যাঁরা ওর কাব্যকে অশ্বহ্রেষা বলে প্রমাণ করে দেবেন। রাজন! আপনি ওর চাতুরীতে বিপথগামী হবেন না।
কন্যার বুদ্ধির দাপটে একেবারে বিগলিত হয়ে গিয়েছিলেন রাজা অক্ষয়চন্দ্র। তিনি বেশ তাচ্ছিল্যের হাসি ছড়িয়ে বনমালীকে বললেন, তুমি চাইলেই আমরা তোমাকে কুকুর দিয়ে খাওয়াব? আমাদের তুমি এতই নিরেট ঠাওরেছ বুঝি! তোমার যা দোষ তাতে তো তোমাকে নির্বাসন ছাড়া কিছুই দেব না। তোমার কবি সম্মানের অপর্যাপ্ত ক্ষতি হবে তাতে। লোকে জানবে তুমি আসলে কোনো কবিই নও। তুমি কালিদাসের মতো কবি হলে তোমাকে কুকুর দিয়ে খাওয়াতাম। তাতে অন্তত আমার সান্ত্বনা থাকত যে, একজন কবিশ্রেষ্ঠকে আমি হত্যা করলাম। কবির খ্যাতির সঙ্গে আমার নামও বিজড়িত হত। কিন্তু তুমি তো ভন্ড। তোমাকে হেনস্থা করা দরকার।
মাধবীর ফন্দিই জিতল সেদিন। বনমালীকে চিরকালের মতন নির্বাসন দিল ভরতপুর। ফাযনী পূর্ণিমার উজ্জ্বল রাত্রিতে বনমালী তাঁর বগলে সামান্য কিছু বইপত্র এবং পরিধেয় বস্ত্র নিয়ে উজ্জয়িনী অভিমুখে রওনা হলেন। যাওয়ার আগে তিনি শেষবারের মতন একবার বৈরাগী নদীর ধারে এসে দাঁড়ালেন। পূর্ণচন্দ্রের প্রতিফলনে যখন বৈরাগীর জল মৃৎপাত্রে গলিত রূপোর মতন দেখাচ্ছে, নিজের একটা কবিতা উচ্চারণ করতে করতে তিনি তাঁর প্রিয় পরিচিত বৃক্ষটিকে আলিঙ্গন করতে উদ্যত হলেন। এবং অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করলেন যে-গাছটি সে জায়গায় আর নেই!
কাহিনির এই অংশেই আমার, অর্থাৎ শৌনক দত্তের আবির্ভাব। আমি বাল্যবয়স থেকেই কবি বনমালীর অন্ধ ভক্ত। আমি কবিতা বিশেষ লিখতে পারি না, কিন্তু পড়ি অনেক। আমার পিতা শিবদত্ত রাজার অমাত্যদের একজন বলে আমি বরাবরই রাজকন্যা মাধবীর সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পেয়েছি। আমি নিজের চোখে দেখেছি কবি বনমালীর কাছে পাঠ নিয়ে
মাধবী নিজের কাব্যচর্চার কতখানি উৎকর্ষসাধন করেছে। আমি সেই মাধবীর নির্দেশে কবি ধর্ষিত গাছটিকে যতদূর সম্ভব অবিকৃত অবস্থায় কাটিয়ে নিয়ে মাধবীর কক্ষে রেখে এসেছি। মূর্তিকার চন্দ্রভানু সেই কাঠ দিয়ে মাধবীর একটা মূর্তি তৈরির কাজ শুরু করেছে এবং আমার এখনকার কাজ বনমালীর পাশে বসে মাধবীর কবিতার শেষ শিক্ষাটুকু লিখে আনা।
বনমালী যখন তাঁর প্রিয় গাছটির অন্তর্ধানের রহস্য হাতড়াচ্ছেন মনে মনে, আমি অন্য এক গাছের পিছন থেকে সরে এসে তাঁর সামনে দাঁড়ালাম। করজোড়ে ভক্তি নিবেদন করে রাজকন্যার বাসনা তাঁকে জানালাম। সমস্ত শুনে স্মিত হেসে কবি বললেন, কবিতা? মাধবীকে জানিয়ে কবিতার শেষ এক গোলকধাঁধায়। যাতে প্রবেশ এবং যার থেকে নিষ্ক্রমণের পথও কবিতা। এই গোলকধাঁধার বিভিন্ন পথ উপপথ হল আকাশ নদী গাছ চন্দ্র সূর্য তারকা এবং মানুষের জীবনের মহাবিচিত্র ঘাত-প্রতিঘাত। এই গোলকধাঁধায় প্রবেশের সঙ্গী নারী এবং নিষ্ক্রমণের সারথি ঈশ্বর। কারও কারও মতে গোটা গোলকধাঁধায় প্রবেশটুকুর রহস্যই জানি। নিষ্ক্রমণের পথ তো আমার জানা নেই।
এই তত্ত্ব আমি যখন মাধবীকে জানালাম তা শুনে মাধবী প্রথমে স্তম্ভিত হল এবং পরে অবিশ্রান্তভাবে কাঁদতে থাকল। তাঁর এতকালের কবিতা চর্চায় সে বৃক্ষের রহস্য কিছুমাত্র জানতে পারেনি। তাহলে কবিতার সিদ্ধি তার আর কতদিনে হবে? কবিতার উপকণ্ঠেও যে গিয়ে উঠতে পারেনি সে আর কবে কবিতায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করবে? পারতপক্ষে সেদিন থেকেই মাধবী অন্নজল ত্যাগ করল। তার একমাত্র দাবি কবি বনমালীকে স্বদেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। এবং তা সে যেকোনো পন্থায়।
প্রবীণ কবি ফণিভূষণ বোঝাতে এলেন রাজকন্যাকে। বললেন, কবিতা মানেই ছন্দ, অলংকার, নিপুণ বাক্যবন্ধ, আশ্চর্য কল্পনার এক প্রতীক। গোলকধাঁধার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এবং নারী দেহের বর্ণনা তাতে কম থাকাই বাঞ্ছনীয়। তাতে আবালবৃদ্ধবনিতাই তার রস গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। কবির কথাবার্তা শেষ হতেই রাজকন্যা বলল, দূর হ পোড়ারমুখো! তুমি হাতুড়ে কবিও নও। তুমি সাপুড়ে।
এর মধ্যে একদিন রাজকন্যা সজোরে কোমরে লাথি মারল ভবতোষকে। মেয়ের মন রাখতে তখন রাজা নিজেও তাঁর চটিজুতো দিয়ে কয়েক ঘা মারলেন। বড়ো কথা, মেয়ের ব্যাপার-স্যাপার বুঝতে জীবনে এই প্রথম কবি কালিদাসের পাশাপাশি বনমালীর কিছু কবিতা পাঠ করলেন। এবং অচিরেই আবিষ্কার করলেন তিনি কী নিদারুণ প্রমাদ ঘটিয়ে বসেছেন। তাঁর অচর্চিত সাহিত্যজ্ঞান এবং সাহিত্যবুদ্ধি দিয়েও রাজা বুঝলেন বনমালী বড়ো আশ্চর্য
