লণ্ডনের বেলসাইজ পার্কের সেই পুজোতে দাঁড়িয়ে হাতে এক প্লেট প্রসাদ নিয়ে এই সবই ভাবছিলাম, হঠাৎ পাশ থেকে এক সুরেলা নারীকণ্ঠ-শংকর না? আমি হকচকিয়ে ভাবছি মহিলা যেন কে, কোথায় দেখেছি! সুন্দরী সুন্দর করে হাসলেন, মনে পড়ছে না তো? তুমি তো ক্রিক রো-র। আমিও ক্রিক রো-র। আর সঙ্গে সঙ্গে আমার ঠোঁট উপড়ে বেরিয়ে গেল, তুমি পৃথা না? সুন্দরী হাসতে হাসতে মাথা নাড়লেন, মনে পড়েছে তা হলে?
বললাম, মনে না পড়ে উপায় আছে? কত দেখা হত পুজোর রাতে।
কবির নির্বাসন
এক ফাযনী পূর্ণিমার রাতে কবি বনমালীকে স্বীয় রাজ্য থেকে নির্বাসিত করলেন রাজা অক্ষয়চন্দ্র। কবি হিসেবে বনমালী অবশ্যই খুবই বড়ো কিন্তু তাঁর দোষ ছিল অন্যত্র। বনমালীর কাছে কবিতার পাঠ নিতে যেতেন রাজকন্যা মাধবী। মাধবীর যৌবন এবং রূপলাবণ্যে আকৃষ্ট হয়ে প্রৌঢ় বনমালী সহসা ভয়ংকর প্রণয়মূলক কবিতা লিখতে শুরু করেন। লোকলজ্জার ভয়ে প্রথম প্রথম সেসব তিনি প্রকাশ করেননি। ক্রমশ এই স্পর্ধা তাঁর বেড়েই যায়। এবং অবশেষে তিনি মাধবীর উদ্দেশে এমনই মর্মান্তিক, রহস্যময় কবিতা লিখতে শুরু করেন যে মাধবী নিজেও ভারি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। যথাকালে বনমালীর নামে রাজসভায় নালিশ করে ভবতোষ। শোনা যায় ভবতোষের একগুচ্ছ কবিতা একবার বনমালী ‘পক্ষীর বিষ্ঠা’ বলে মাটিতে নিক্ষেপ করেছিলেন। আমার নিজেরও ধারণা ভবতোষ অত্যন্ত নারকীয় কবিতা লেখে। ওরই এক কবিতা পাঠের আসরে হৃদকম্প শুরু হয়েছিল কবি ফণিভূষণের। আমাদের ভরতপুর রাজ্যে অনেকের ধারণা কবিকুলমণি শ্ৰীভতৃহরির পর ফণিভূষণের মতো বড়ো কবি আর জন্মাননি। তবে বনমালীর মতো ফণিভূষণ প্রত্যক্ষ বচনে ভবতোষের নিন্দে কখনো করেননি, কারণ রাজপ্রাসাদে ভবতোষের যাতায়াত বড্ড বেশি। স্বয়ং অক্ষয়চন্দ্র এবং তাঁর সমুদয় অমাত্যেরা ভবতোষকে বিশেষ স্নেহ করেন।
কবিতা লেখা লেখার সঙ্গে সঙ্গে সে কবিকুলের তথা পন্ডিত সমাজের খবরাখবর তাঁদের কানে পৌঁছে দেয়। অনেকের ধারণা কবিতার চেয়ে চরবৃত্তিতে ভবতোষের মেধা অধিক।
যাই হোক, এই ভবতোষ কিন্তু বনমালী সম্পর্কে একটা অদ্ভুত খবর সভায় রটাল। বনমালী নাকি পূর্ণচন্দ্র রাত্রিতে উলঙ্গ হয়ে বৈরাগী নদীতে এক বুক জলে দাঁড়িয়ে মাধবীর উদ্দেশে তাঁর অশ্লীল কবিতা আবৃত্তি করেন। তারপর… তারপর জল থেকে উঠে পাড়ের এক গাছকে মাধবীজ্ঞানে রমন, মর্দন এবং ধর্ষণ করেন। পূর্ণিমার রাত্রির পর যে ভোর হয় তখন বলমালীকে ছিন্নভিন্ন অবস্থায় বৈরাগীর তীরে পাওয়া যায়। বেশ কিছু কাল ধরেই নাকি বনমালী তাঁর পূর্ণিমাযাপন ওইভাবেই করে থাকেন।
এই খবর প্রথম শুনে রাজা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর কন্যাকে এত সম্ভোগের দৃষ্টিতে দেখে এক প্রজা কবি! তিনি বহুক্ষণ পর তাঁর মানসিক স্থৈর্য উদ্ধার করে বনমালীকে ডেকে পাঠাতে নির্দেশ দিলেন। একই সময়ে তিনি ডেকে পাঠালেন মাধবীকেও। মাধবী কবির এই পূর্ণিমার ব্যাপার-স্যাপার জানত না। বনমালীর কবিতায় সে যে অন্তরে অন্তরে পুলকিত হত সে তো বলাই বাহুল্য। শেষ দিকের বাড়াবাড়িতে, বিশেষত কবিতায় তার নগ্ন বর্ণনায় সে যে অপ্রস্তুত হয়নি তা নয়, কিন্তু মাধবী জানত বনমালী অবশ্যই বড়ো কবি। তাই তাঁর শব্দ-বর্ণ চিন্তা দোষও মার্জনীয়। কোনো খারাপ কবি ওইসব লিখলে মাধবী অবশ্যই তাকে জুতোপটা করত। নিজে একটু-আধটু কবিতা চর্চা শুরু করে মাধবী জানতে পেরেছে দেশে সত্যিকারের কবি মাত্র বনমালী! অন্য সব কটিই হাতুড়ে। এমনকী যে ফণিভূষণকে রাজ্যের সবাই শ্রীভতৃহরির পর সবচেয়ে বড়ো পদাকার মনে করে তিনি আসলে অতিনিকৃষ্ট। ভরতপুরে ইদানীং সংস্কৃত ভাষা কিংবা পান্ডিত্যের চল খুব কম। রাজ্যের অধিকাংশ লোকই প্রায় মূখ। তারা এর-তার মুখে ঝাল খায়। তাদের যে যা বোঝায় তাই বোঝে। মাধবী এও জানে যে, রাজ্যের অন্যতম প্রধান মূখ তার পিতা অক্ষয়চন্দ্র নিজে।
বেগতিক দেখে মাধবী বনমালীর প্রাণ বাঁচানোর এক অভিনব পথ অবলম্বন করল। রাজসভার হাওয়া গরম দেখে সে টের পেয়েছিল অনুনয়-বিনয় করে বনমালীর প্রাণ বাঁচানো যাবে না। সে তখন তারস্বরে ঘোষণা করল, রাজন! এই পাপী লোভী কামুক দুর্বিনীত নিকৃষ্ট কবিকে হত্যা করাও হাত গন্ধ করা। আমি এর কাছে কবিতা শিক্ষা করতে গিয়ে টের পেয়েছি এই কবি এক অতিকায় ভন্ড। এর দুরূহ ছন্দজ্ঞান আছে ঠিকই, কিন্তু কাব্যভাব বিন্দুমাত্র নেই। আমি অবলা নারী সহসা এর চাতুরীর মর্মোদ্ধার করতে পারিনি। এতকাল ধরে তাই এত এত সময় নষ্ট করেছি। হায়! হায়! কিন্তু রাজন! আর বেশিদিন এর শিক্ষানবিশি করলে আমি বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যেতাম। পরমপিতা ভগবান আমায় বাঁচিয়েছেন। এখন আমার ইচ্ছে তাই যে, এই আশ্চর্য শঠ মানুষটিকে কালবিলম্ব না করে উজ্জয়িনীতে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। উজ্জয়িনীর সঙ্গে এই রাজ্যের সাংস্কৃতিক শত্রুতা বহুদিনের। আমরা এখন অবধি একজন কালিদাস সৃষ্টি করতে পারিনি। কিন্তু উজ্জয়িনীও যাতে আর কোনো দিন কোনো কালিদাস সৃষ্টি করতে না পারে তার জন্য এই বনমালীকে সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। এইরকম কোনো কবি যেকোনো সাহিত্যের মূলে অভাবনীয় কুঠারাঘাত করতে পারে। রাজন! এই প্রার্থনা।
