পুজোর সময় মেয়েদের বর্ধিত স্বাধীনতার মধ্যে ছিল নতুন ড্রেসের সঙ্গে খুব গাঢ় করে ঠোঁটে লিপস্টিক, গালে রুজ মেখে বেরোনোর সুযোগ। কনক’ ও ‘কান্তা’-র যুগে এক আধ জন খুব ঈর্ষণীয় হত পাঁচ কি দশ টাকা দামের ‘ইভনিং ইন প্যারিস’ ব্যবহার করে। বাবার কিনে দেওয়া, তাই যখের ধনের মতো আগলানো, ক্যালিফোর্নিয়ান পপি’ বা ‘ইয়ার্ডলে’ মা দিদিদের গায়ে ছিটিয়ে দিতেন। আমার গায়ে একবার আদর করে ইভনিং ইন প্যারিস’ মাখিয়ে দিয়েছিলেন, তাতে একটি মেয়ে আমার গায়ে নাক ঘষে গন্ধ নিতে লাগল। আমি বদ্ধ হাবা, সেই নাকঘষার মানেই ধরতে পারেনি, ভেবেছি, কী বেজায় গন্ধ রে বাবা। বুঝিনি পুজোর রাত ওর মাথা খেয়েছে।
৩.
এখনকার মতো তখনও পুজোয় কলকাতা ছেড়ে পুরী, যশিডি, শিমুলপুর, সিমলা যাওয়ার চল দেখেছি। কেউ কেউ রাঁচিও যেত। স্টাইলের ওপর কেউ কেউ বলত, এবার পশ্চিমে চললাম। তাদের ঘটা করে যাওয়াটা আমরা বারান্দা বা জানলা দিয়ে দেখে মনে মনে হাসতাম। এত তাড়াতাড়ি রাঁচি যাওয়ার কী হল? পরে একটা ব্যাখ্যাও বার করে ফেলতাম—পুজোয় কলকাতা ছাড়লে রাঁচি ছাড়া আর কোথায় যাবে? যে প্রতিবেশী বেনেবাড়ি পুজোয় পশ্চিমে যেত তাদের ছেলে-মেয়েরা ফিরে এসেই জানতে চাইত পাড়ার রকমসকম কেমন ছিল পুজোর সময়। এক লক্ষ প্রশ্ন ওদের, ওদের ট্যুর নিয়ে আমাদের কোনো জিজ্ঞাস্যই নেই। আমরা কেবল ভরে আছি পুজোর স্মৃতিতে। আমাদের এক বন্ধুকে বাড়ির বড়োরা টেনে হিচড়ে শেয়ালদা স্টেশন অব্দি নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সে কান্নাকাটি জুড়ে প্ল্যাটফর্ম থেকে একা ফেরত আসে। কেন যাবে না? তা হলে বড়োবাজার থেকে কিনে আনা দোদমা, বোম আর তুবড়ি কে ফাটাবে? কালীপুজোর পটকা ফাটানো তো হালকা চালে শুরুই হবে দুর্গাপুজোর ষষ্ঠী থেকে।
আমরা যারা কলকাতার পুজো ছাড়া বাঁচতে পারতাম না তাদের বাড়িতে একটু স্থানাভাব হত পুজোর সময়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আত্মীয়স্বজনরা ওই সময় থাকতে আসতেন আমাদের বাড়িতে। তাদের মুখে কত গল্প—খুলনার রূপসা নদীর, গোয়ালন্দ বন্দর কি বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তের। জায়গায় টান পড়ত বলে ফরাশ পাতা হত, আমরা ছোটোরা গাদাগাদি করে শুয়ে রাতের বেলায় না-দেখা পিতৃভূমি, মাতৃভূমির গল্প শুনতাম। আর অতিথিদের খালি খোঁজ পুজোয় মায়ের নতুন চেহারা কী? সুচিত্রা-উত্তম কি বিয়ে করেছে? বিধান রায় কি সত্যিই নাড়ি টিপে রোগ ধরেন? অর্গাণ্ডি আসলে কী কাপড়? আর তারপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সওয়াল : ভাগ্যশ্রীর সম্বন্ধ চাই, মনা তোমাদের এহেনে ভালো পাত্তর আছে?
স্বজন আসত অনেক বাড়িতেই উত্তর আর পশ্চিম ভারত থেকে। তারাও খুঁজছে পাত্র বা পাত্রী। পুজো শেষ হলে আমাদের বাড়িতে পূর্ববঙ্গস্থিত মামা-মাসিদের মেয়েদের পাত্রী হিসেবে দেখানো হত। পরে শীত-বসন্তে তাদের কয়েক জনের বিয়েও হয়েছে। তারা চলে যেতে নির্জনে চোখের জল মুছেছি। তারপর নতুন করে দৃষ্টি মেলেছি আগামী পুজোর দিকে।
পুজো মানে ছিল সিনেমা এবং থিয়েটার। মা-মাসিদের জন্য ম্যাটিনি শোয়ের অ্যাডভান্স টিকিট কিনে আনায় হাতযশ ছিল দাদার। পাড়ার উঠতি যুবাদের এলেম ধরা পড়ত লাইন দিয়ে সুচিত্রা-উত্তমের বায়োস্কোপের টিকিট জোগাড়ে। সেজন্য সেই যুবারা একটা করে পাঁচ সিকের টিকিট বখশিস পেত। পুজোর সময় পাড়ার অনেক যুবাই প্রতিবেশী যুবতীদের সঙ্গলাভের আশায় মা-মাসিদের দলে ভিড়ে যেত।
বাল্যে মা-এর সঙ্গে পুজোর সময় ম্যাটিনি শোয়ে প্রাচী সিনেমায় রানি রাসমণি’ দেখতে গিয়ে দেখি পাড়ার ডানপিটে ছোকরাদের ভিড়। কী ব্যাপার? তারা কোনো না কোনো মহিলা দলকে এসকর্ট করে এসেছে। বলা বাহুল্য, সেইসব দলে কিছু ক্লাস নাইন, ক্লাস টেনের কুমারী তো আছেই! আমার মা সরল মানুষ, অতশত বুঝতেন না, বললেন দ্যাখো, সবাই ওদের বকাঝকা করে, কিন্তু ওদেরও কীরকম ধর্মের টান।
দুর্গাপুজো নিয়ে একটাই অভিযোগ চিরকাল আমার। পুজোটা কেবল আসে আর যায়, এই এল এই গেল। তিনশো ষাট দিনের অপেক্ষার পর এই ক্ষণিকের উন্মাদনা পোষায়? মহালয়া থেকেই কীরকম হৃৎকম্প শুরু হয়ে যায়, আর ষষ্ঠী এলে তো প্রতিজ্ঞাই করে বসি, বাকি চার দিন আর একফোঁটা ঘুমোব না! প্যাণ্ডেলে প্রতিমা জেগে থাকবে আর আমি ঘুমোব!
পুজোর রাতগুলোয় তাই এক ভূতেও ভর করত আমাদের। জানলা খুললে কি ছাদে দাঁড়ালে আলোর ঢেউ এসে আছড়ে পড়ত চোখে-মুখে, মনে। গ্লোব লাইট, টুনি বালব, কি পাইপ লাইটের উদার বিকিরণ। সংগতে মাইকে হেমন্ত, সন্ধ্যা, লতা, গীতার গানের ধ্বনি। গোটা জগৎ তখন যেন সহজ হয়ে আসে। রতু, পৃথা তনুশ্রীরা পুজোর জামাতেই প্যাণ্ডেল ছেড়ে এসে ভিড় করেছে জানলায়, বারান্দায়। চোখ ভরে দেখছি পুজো ওদের কত সুন্দর করেছে। দেখছি বেপাড়ারও কত সুন্দরী দলে দলে রাস্তা বেয়ে চলেছে। মনে হচ্ছে এই রাতটাই শেষরাত, চলে গেলে আর আসবে না। চলে গেলেই ছেলেরা মেয়েরা সবাই কী ভীষণ আলাদা হয়ে যাব। একসঙ্গে ফুচকা খাওয়া, মিষ্টি বরফ বা আইসক্রিম খাওয়া, জলযোগের দোকানে বসে লুচি-ছোলার ডাল খাওয়া শুধুই স্মৃতি হয়ে যাবে। ভিড় ঠেলে পুজো দেখতে দেখতে কেউ বলবে না, আমার হাতটা ধরো। জুতোয় হিলটা বোধ হয় ভেঙে গেল।
