২.
অরুন্ধতী রায়-এর উপন্যাস থেকে কথাটা তো চালু হল এই সেদিন, কিন্তু চিরকালই আমরা মা দুর্গাকে জেনে এসেছি God of Small Things বলে। অর্থাৎ, ব্যাপারটা ছিল, কথাটা ছিল না। কত অজস্র টুকিটাকি জিনিসের জন্যই যে তখন আমরা ঠায় চেয়ে থাকতাম দুর্গাপুজোর দিকে। জুতোয় পেরেক উঠে গেছে, পা বাঁচিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছি, তবু জুতো কেনার কথা তুলব না, তিনটে মাস হজম করে নেব। কারণ, এখন কিনলে পুজোয় আর নতুন জুতো পরা হবে না। নতুন ক্লাসের শুরুতে, জানুয়ারি মাসে, ইশকুলের ইউনিফর্ম কেনার একটা প্রথা ছিল; এ ছাড়া সব শৌখিন জামার জন্যই অপেক্ষা থাকত পুজোর। দিদিদের দেখতাম, বছরের কোনো একসময় একটা ভালো উপহার পেলে সেটা প্রাণে ধরে বাঁচিয়ে রাখত পুজোর জন্য। পাড়ার অনেক বাড়িতেই পুজোর সময় ঘটা করে রেডিয়ো কেনা হত অধিকাংশ বাড়িতেই রেডিয়ো ছিল না—ফলে, রেডিয়ো ঢুকলে সে বাড়ির খুব মর্যাদা বাড়ত। আর যাদের বাড়িতে কলের গান ছিল, তাদেরকে তো রীতিমতো ধনী জ্ঞান করা হত। সেইসব বাড়িতে পুজোর সময় কেনার সামগ্রীর মধ্যে থাকত সে-বছরের শারদ অর্ঘ্যের কিছু রেকর্ড। আমার বাবার মৃত্যুর পর বাড়ির পুজোর কেনাকাটার বহর কমে গেলেও কাকা বা মা এই পুজোর গানের রেকর্ড কেনা বন্ধ করেননি, কারণ পুজোর সময় কলের গানে নতুন গান না বাজলে বাড়িতে পুজো ঢুকত না। পুজো আসত কিছু পুজোসংখ্যা আর বেশ কিছু বইয়ের হাত ধরেও। পুজোর অনেকখানি আগে থেকেই পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে দিব্যি বৈঠক বসে যেত কেনাকাটা নিয়ে। হ্যাঁ রে তুই কী কিনলি? ম্যাচিং ব্লাউজ কিনতে পারলি? রোলেক্স জরির শাড়ি ক-দিন চলে রে? জানিস তো, বেনেবাড়ির রুমঝুম আস্ত একটা বেনারসি কিনে বসেছে? ওর বিয়েটিয়ে আছে নাকি সামনে?—এহেন এক-শো এগারোটা মেয়েলি কথা শুনতেই হত এ-বাড়ির বারান্দায়, ও-বাড়ির উঠোনে, কী সে-বাড়ির ছাতে। কোন বাড়ির কেনাকাটা কাকে টেক্কা দিল, তাও শুনতে হত। বাবার মৃত্যুর পর আমার জামা-প্যান্টের সংখ্যা কমে যেতে আমি এইসব মা-মাসি-দিদি-বউদিদের আড্ডা থেকে পালিয়ে বাঁচতাম। নইলে তো থুতনি নেড়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করবে, সাহেবের ক-টা জামা হল এ বার? আমাকে তখন জামার সংখ্যা বাড়িয়ে বাড়িয়ে মিথ্যে কথা বলতে হবে। ভারি রাগ হত, কেউ কেন জিজ্ঞেস করে না, কী রেকর্ড কেনা হল রে? কিংবা কী বই?
আজ, এত দিন পর, ওই সব ন্যাকা-ন্যাকা কথাগুলোই বড় মধুর করে স্মৃতিতে বাজে। মনে পড়ে, একটা মাইসোর স্যাণ্ডাল সোপ হারিয়ে যাওয়াতে একটা মেয়ের সে কী কান্না! সবাই বলছে, মোটে তো দশ আনা দাম। আর একটা কিনলেই হয়। কিন্তু সে-কথা কে বোঝায় তাকে? সে শুধু বলে, পুজোর সাবানটাই হারিয়ে ফেললাম, ছি ছি! এর চেয়ে নিজেই হারিয়ে গেলে পারতাম।
বলতে নেই, পুজোতে সব ছেলেপুলেই আমরা একটু-আধটু হারিয়ে যেতাম। প্যাণ্ডেল বাঁধা দেখতে দল বেঁধে গেলাম গোমেস লেনে, তারপর সেখান থেকে সুরি লেনে, তার পর ডিক্সন লেনে, শেষে বৈঠকখানা বাজারেই। সেখানে দল ভাগাভাগি হয়ে কে যে কোথায় গেল, ভগাই জানে। তখন একে-ওকে খুঁজতে খুঁজতে কখন যে ফের পাড়ার প্যাণ্ডেলে এসে হাঁপাতে লাগলাম, সেও ভগাই জানে। শুধু মনে পড়ে দুপুরের দিকে এ-পাড়া ও-পাড়া করে এক-এক রাস্তায় এক-এক রকমের রোদের খেলা দেখা হত। নীল আকাশ থেকে সোনালি রোদের ঠিকরে এসে এক-এক রাস্তায় এক-এক স্টাইলে, অ্যাঙ্গেলে পড়া হত, এক-এক বাড়ির দেওয়ালে এক-এক চালে খেলা করত রোদ। কালো পিচের রাস্তায় রোদের ওই ওঠা পড়া দিয়েই আমরা টের পেতাম শরৎকাল কতখানি মজেছে। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে আমার সহপাঠী ও রুমমেট জন্মান্ধ দেওকিষেণ শৰ্মা— যে জীবনে কখনো রোদ দেখেনি, কী গ্রীষ্মের, কী শীতের-শরৎকে বলত হিমবসন্ত, স্রেফ গায়ের উপর রোদের ছোঁয়া বুঝে। আর, আমরা তো সেই স্বর্ণালি রোদ চোখে পান করব বলে পাড়া ডিঙিয়ে বেড়াতাম।
কিন্তু, রোদের সঙ্গে সব মাখামাখিই কিন্তু পুজোর রাতগুলোর টানে। সারাবছরে অমন স্বাধীনতা আর কটা দিনই বা, যখন ট্রামে-বাসে আর পায়ে হেঁটে শহরটাকে প্রায় চষে ফেলা যেত। পর দিন রেল মেরে বন্ধুদের শোনানো যেত ফায়ার ব্রিগেডে রমেশ পালের প্রতিমা কেমন হল, সংঘশ্রীর প্যান্ডেলের কেরামতিটা কী, কিংবা হিন্দ সিনেমার উলটো ফুটে গোপাল পাঁঠার পুজোয় কী সুন্দর দেখানো হয়েছে মায়ের সামনে রামচন্দ্রের আঁখিপদ্ম দানের উপাখ্যান। তবে, সব বৃত্তান্তই শোনানোর দরকার হত প্যাণ্ডেলের চত্বরে, যেখানে লাল-নীল হলুদ-গোলাপি ফ্রকে উদ্ভাসিত বালিকারা আপন মনে করে যাচ্ছে মধুবালা, সুচিত্রা, নূতন, ওয়াহিদার পোশাক, হাসি, নাচ ও হাঁটার গল্প। সবাই সবাইকে আড় চোখে দেখছে আর হাত-মুখ নেড়ে কথা কইছে, কেউ জানতেও পারছে না কার মনের ক্যামেরায় কার মুখের ছবি চিরতরে বন্দি হয়ে গেল। এইসব নিষ্পাপ স্মৃতিগুলোর মধ্যে একটা দৃশ্য খুব মনে পড়ে, ‘৫৫ সালের পুজোতে মাইকে বাজছে ‘আনারকলি’ ছবিতে লতার গান, ‘ইয়ে জিন্দেগি উসিকি হ্যায় বো কিসিকা হো গয়া’ আর একটা একরত্তি মেয়ে সেটা গলায় তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে আপ্রাণ।
