আমি হয়তো জীবনে শেষবারের মতো বৃন্দাকে দু-চোখ ভরে দেখছি। আর সোমা কখন এসে হাতে ধরিয়ে দিল ডেসার্টের প্লেট।
এই রাত তোমার আমার
উত্তর লণ্ডনের বাউণ্ডস গ্রিন পল্লির এক টিপিকাল ডিট্যাচড ইংলিশ কটেজের দোতলার ঘরে একলা বসে তিন দিক মোড়া বেউইণ্ডোর কাচের বাইরের নীল আকাশ, ফর্সা মেঘ আর সবুজের উপর সবুজ চাপানো এর-ওর-তার আর ঈশ্বরের বাগান দেখছিলাম। জানলাটাকে ফ্রেম ভাবলে যেন গোটা একটা কনস্টেবল চোখের সামনে দাঁড় করানো। মন ভরানো এবং নাচানোর জন্য এর চেয়ে মারাত্মক দৃশ্য হয় না, আর তা যে হচ্ছে না, তাও হয়তো নয়। কিন্তু, থেকে থেকেই একটা মধুর বেদনা এসে সব ছেয়ে ফেলছে যখনই মনে পড়ছে আজ মহাষ্টমী।
যদ্দুর মনে পড়ে, ১৯৭৭-এ পন্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে ‘রাগ-অনুরাগ’ বইয়ের কাজ করতে লণ্ডনে গিয়ে প্রথম পুজোর সময় কলকাতা ছাড়া হয়েছিলাম। কুঁদ হয়ে ছিলাম লণ্ডনে ততদিন, যদ্দিন না পুজোর কথাটা এল; আর এল তো এল মা-এর একটা চিঠি ভর করে। সেই চিঠিরই উত্তর লিখছিলাম আমার কাচে-ঘেরা নির্জন ঘরে বসে অক্টোবরের নরম রোদের সকাল দেখতে দেখতে। মা লিখেছিলেন; অমুক অমুক তারিখে পুজো পড়েছে এ বার। শুনেছি, লণ্ডনেও বড়ো পুজো হয়, তুমি তার কোনো একটাতে সময় করে যেও। গঙ্গাতৰ্পণ তো হবে না, তবে মহালয়ার ওই তারিখটায় বাবাকে, কাকাকে মনে করে একটু ধ্যান কোরো। আর পুজোর জন্য একটা নতুন জামা কিনে নিয়ে ওই সময়টায় পোরো। কী করলে আমায় জানিয়ো।
সেটাই লিখছিলাম মাকে। লিখলাম—তোমায় লিখেছি কিছুদিন আগে যে, লণ্ডনের চেয়ে সুন্দর শহর বোধ হয় নেই পৃথিবীতে। আজ অষ্টমীর সকালে অনবরত মনে হচ্ছে পৃথিবীতে আমার জন্য কলকাতার চেয়ে সুন্দর শহর নেই। আর একটু পর কলকাতার প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে যখন আলো জ্বলে উঠবে, আমি মনে মনে ওই সব পাড়ায় পৌঁছে যাব। যদিও এখানকার বেলসাইজ পার্কের বড়ো পুজোয় আমার যাওয়ার কথা আছে একজন বিশিষ্ট বাঙালি ভদ্রলোক নিশীথ গাঙ্গুলির সঙ্গে। আর তোমার কথামতো একটা নতুন নীল সোয়েটার কিনে পরছিও, শীতের কারণে আর জামা কেনা হল না।
আমি সত্যিই মা-কে কোনো স্তোক দিচ্ছিলাম না, মা-ও জানতেন পুজোর সময় আমার কলকাতা ফেলে স্বর্গে যাওয়ারও মন হবে না। হাজার হোক, তিনশো ষাট দিন তো কলকাতায় কষ্ট পেয়ে বাঁচি পাঁচটা রাতের জন্য—পুজোর তিনটে রাত, কালীপুজোর একটা রাত আর ইংরেজি নতুন বছরের রাতটুকু। আরও ছোটো বয়সে আরও তিনটে রাতও জীবনে ছিল। সরস্বতী পুজোর আগের প্যাণ্ডেল বাঁধার রাত, বড়োদিনের রাত আর মধ্য কলকাতায় আমাদের ক্রিক রো পাড়ায় কালীপুজোর পরপর ভানু বোসের সারারাত জলসার রাত। যখন মঞ্চে রক্তমাংসের উত্তমকুমার দেখছি, শুনছি ধনঞ্জয়, শ্যামল, মানব, সতীনাথ, ইলা, আলপনা, প্রতিমা, বাঁশরী, উৎপলা। এই এত সব রাতের শুরুই হত দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর রাতে, আর শেষ হত সরস্বতী পুজোর আগের রাতে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় অবশ্যই আমাদের ভেবে গান করেননি এই রাত তোমার আমার’, কিন্তু, ওই গানটাই কেবল বোঝাতে পারে পুজোর রাতে আমাদের মনের অবস্থা। নিতান্ত কৈশোরেই, ক্রিক রো-র সংলগ্ন মহেন্দ্র সরকার স্ট্রিটের বিরাট পুজোর সন্ধ্যারতি দেখতে দেখতে, কী করেই যেন হঠাৎ একদিন টের পেয়ে গেলাম এ হচ্ছে প্রেমে পড়ার রাত। অথচ, প্রেম যে কী, সেটাই যথেষ্ট মালুম নেই।
না জেনে, না বুঝে ভালো লাগাই নাকি প্রেম। না জেনে, না বুঝে প্রেমে পড়াই নাকি পুজো। রবীন্দ্রনাথের গানে প্রেম আর পূজার গান কখন কীভাবে আলাদা হয়, সে তো আমি গীতবিতান না দেখলে বুঝতেও পারি না, আর বোঝার পরেও সবসময় মানতেও পারি না। তেমনই, দুর্গাপুজো যে কী করে, কী করে চারধারে আমার প্রেমের মরশুম ছড়িয়ে দিত, তা বুঝতে হঠাৎ দেখলাম কেমন যেন সাবালক হয়ে গেছি আর মেয়েদের দিকে অত খোলা চোখে তাকাতে পারছি না। প্যাণ্ডেলে তো থাকতেন একটাই দেবী আর দুই sub-দেবী লক্ষ্মী ও সরস্বতী। কিন্তু আমাদের সেই কিশোর চোখের উপর দিয়ে ভেসে যেত কত সে লক্ষ্মী, সরস্বতী। আমরা গালে হাত দিয়ে ভাবতাম মেয়েরা সত্যিই কী সুন্দর। তারপর আরও তলিয়ে ভাবতাম, আহা রে, সারাবছর এরা কোথায় থাকে। কারও নাম শুনছি রতু, কারও লাইট, কারও জয়শ্রী, কারও তনুশ্রী, কারও পৃথা। এই সময় আমি একটু গানকাতুরে হয়ে পড়তাম আর মাথায় খেলত পুজোর গান বলে দাগ কেটে বসা সব বাংলা আধুনিক। হেমন্তর ‘তোমার আমার কারও মুখে কথা নেই’, লতার ‘আকাশপ্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে’ মান্নার ‘আমি সাগরের বেলা, তুমি দুরন্ত ঢেউ’, শ্যামলের ‘সারা বেলা, আজি কে ডাকে’, সুবীরের ‘মোনালিসা তুমি কে, বলো না আর অতি অবশ্য মানবেন্দ্রর ‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি/ তবু মনে হয়/ কেন আরও ভালোবেসে যেতে পারে না হৃদয়। এইসব গান মনে খেললে ওই পূর্ণ আনন্দের মধ্যে একটা অভাববোধও ঈষৎ জাগত; কেন এই চলমান সরস্বতীদের মধ্যে কেউ আমাদের জন্য গায় না সন্ধ্যার প্লে ব্যাক, এ শুধু গানের দিন, এ লগন গান শোনাবার কিংবা গীতার মতো করে, ‘তুমি যে আমার, ওগো তুমি যে আমার’। প্যণ্ডেলে বসে বসে এভাবেই এক এক ঘণ্টায় আমাদের এক এক মাস করে বয়েস বেড়ে যেত। পুজো চলে গেলে, শেষে মনের যে দশা দাঁড়াত তা জ্ঞান গোঁসাইয়ের রাগপ্রধানেই কিঞ্চিৎ ধরা যায়—’শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয় ফিরে আয়, ফিরে আয়। এই পাখিটা যে বিগত পুজো, না বুকের ওপর দিয়ে ভেসে যাওয়া শরতের বাতাসটুকুর মতো ওইসব রতু-পৃথারা, তা আর স্পষ্ট করে বলতে পারব না। রবীন্দ্রনাথের গানের মতো আমাদের জীবনেও প্রেম ও পুজো মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
