ইতি
তোমার বৃন্দা
মূর্খ, পাষন্ড আমি। আমি চিঠিটা পড়লাম। একবার দু-বার তিনবার চারবার পাঁচবার বহুবার পড়লাম। বহুবার কলম তুলেও রেখে দিলাম। এ আমি কী করতে যাচ্ছি! সামনে পরীক্ষা আর আমি প্রেমপত্র লিখতে বসব! তাও এমন কাউকে যে না-চিনে, না-জেনে এরকম চিঠি লিখে ফেলে! যে এত খোঁজ নিয়েছে আমার শুধু প্রেম করবে বলে। পাড়ায় টিটি পড়ে যাবে না? লোকে কী বলবে? বলবে, ওপরে সাধু সাধু, পন্ডিত পন্ডিত। তলে তলে… না, এ আমি বরদাস্ত করতে পারব না। আমার সব প্রেম চাপা থাক সত্তার গভীরে, আর ওপরে আমি আমার মতোই। এ চিঠির উত্তর দেওয়া মানেই প্রেমে পড়া। যা আমি কিছুতেই পড়ব না।
আমি চিঠিটা দলা পাকিয়ে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ফেলে দুদ্দাড় করে উঠে গেলাম চিলেকোঠার ঘরে। গিয়ে জানালা খুলে বসলাম। আর দেখি স্ট্রিপ টিজে মত্ত আছে লোরেন। মনে মনে বললাম, বাঁচিয়েছে! দূর থেকে এ অনেক ভালো। আমি কারও কাছে কিছুতেই যাব না। ভাবতে ভাবতে দু-চোখ দিয়ে দু-ফোঁটা জল পড়ল। লোরেনের ঘরের গ্রাম থেকে এলভিসের রক-এন-রোল গান ভেসে আসছে। কিন্তু আমি শুনছি মনের ভেতরে মানবেন্দ্র গাইছে ‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি।
ক-দিন বাদে চলে গেলাম বোর্ডিং-এ। চিঠি না লিখে। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে এসেও কাউকে চিঠি লিখলাম না। কলেজে যাবার পথেও তাকালাম না একটা বিশেষ বাড়ির দিকে। বুঝলাম আমি ঘোরতরভাবে প্রেমে পড়েছি এমন একটা মেয়ের সঙ্গে যে এমন একটা গান ভালোবাসে, শুনলে আমার খুব অভিমান আর অহংকার হয়। রোজ ভাবি, আর একটা চিঠি যদি আসে… যা আসে না। রাগে আমি আরও একা হয়ে যাই। নিজেকে বোঝাই যে, আমার প্রেমকে নিজে হেঁটে আসতে হবে আমার কাছে। আমি কোথাও যাই না। আমার বুকে এত প্রেম আছে যে, আমার পক্ষে কাউকে প্রেম নিবেদন সাজে না। আমি অপেক্ষা করতে করতে ভুলে যাই কীসের অপেক্ষায় ছিলাম। আমি নিজের সঙ্গে প্রেমে পড়ে যাই।
যখন ঘোর কাটল দেখি খুব বিব্রত, আরক্ত মুখে বৃন্দা তখনও আমার উত্তরের অপেক্ষায়। বললাম, কেন তুমি আর একটা চিঠি লিখলে না, বৃন্দা? প্রথম চিঠিতে অনেকেই তো ভুল করে। শুধু আর একটা চিঠি যদি…
বৃন্দা মাথা নীচু করে দাঁড়াল একটু। কী ভাবল। তারপর মাথা তুলে ভীষণ দুর্বল, কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল, তাতে কী লিখতাম?
-শুধু একটা গানের লাইন।
বৃন্দা অপ্রস্তুত হয়ে ছুটে চলে গেল। আর ততক্ষণে ওর বিব্রত অবস্থাটা চালান এল আমার মধ্যে। হাতের ডিনার প্লেটটা মুছতে গিয়ে ছিটকে ফেললাম মাটিতে। ব্যস্তসমস্ত হয়ে তিনটে ভাঙা টুকরো কুড়োতে যাচ্ছি যখন একটা দমকা হওয়ার মতো ঘরে ঢুকল সোমা—এ কী! কী করছ কাকু! লিভ ইট! লিভ ইট! আমি ঠিক করে দিচ্ছি।
ব্যাজার মুখে বললাম, দেখো তো, কী একটা নিউসেন্স ঘটিয়ে বসলাম।
সোমা প্রতিবাদ করল, না, না, দিস ইজ গুড ফর আ পার্টি।
পার্টিতে কিছু একটা না ভাঙলে পার্টি কমপ্লিট হয় না।
আমি বললাম, সব ভাঙার দায়িত্ব শুধু কি আমারই, সোমা?
ভাঙা টুকরোগুলো বিন-এ চালতে চালতে পেঁপো মেয়ের মতো সোমা বলল, যারা মন। ভাঙে তাদের এটা অভ্যেস হয়ে যায়।
সর্বনাশ! মেয়েটা কখন কী শুনল? এত অনুমান শক্তি ওর কোত্থেকে এল? ও কি তলে তলে এত পাকা নাকি? আমি ভালো করে চোদ্দো বছরের মেয়েটার দিকে তাকালাম। খুব সুন্দর, মড চেহারা। কোথাও কোনো মিল নেই সেই হারানো কিশোরী বৃন্দার সঙ্গে। আবার কোথায় যেন ওরা একেবারে এক।
সোমা ফের বলল, কাকু, তুমি ড্রইং রুমে যাও। ওখানে বৃন্দা আন্টির হাজব্যাণ্ড তোমার জন্য ওয়েট করছে।
আমি তরুণ সুদর্শন ডাক্তারটির সঙ্গে দ্বিতীয় বারের আলাপেও কেন জানি না করমর্দন শুরু করে দিলাম। আমাদের দুজনের পেটেই বেশ কিছু লাগার বিয়ার পড়েছে। আমার বেশ ভালো লাগল সুমিতকে। সুমিত বলল, তা হলে একটা দিন ঠিক করুন। কবে আসবেন। আমি এসে আপনাকে নিয়ে যাব।
বললাম, ঠিক এখনই পারছি না। যদি ক-দিন বাদে একটু ফোন করেন নির্মলদার এখানে।
সুমিত বলল, নো প্রবলেম! আমি ফোন করব।
কিন্তু তারপরেও একটু প্রবলেম থাকছে। আমি যাব, যদি বৃন্দা গান শোনান।
আকাশ থেকে পড়ল যেন সুমিত। একটু থমকেই রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল, আপনি কী করে জানলেন যে ও গান জানে? নিশ্চয়ই নির্মলদা বলেছেন?
একটু চাপা গর্ব নিয়েই বললাম, আমি সেন্ট্রাল ক্যালকাটার ছেলে। আমরা লোকের মুখ দেখেই টের পাই কে, কী জানে বা জানে না। বৃন্দা বলল, না, আপনি একটু ভুলও করলেন মিস্টার মুখার্জি। সেন্ট্রাল ক্যালকাটার লোকেরা গান শোনানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও অনেক সময় আসেন না।
আমি প্রতিবাদ করে বলতে গেলাম,, না, আমি তা নই। কিন্তু কথাটা আটকে রইল জিভ আর গলার মাঝখানে কোথাও।
সুমিত হঠাৎ আমার সাহায্যে এল। বলল, মিস্টার মুখার্জিকে কিন্তু ডেট ফেল করার লোক বলে মনে হচ্ছে না। তারপর আমার হাতে ফের হাত রেখে বলল, না, না, আপনি প্লিজ আসুন।
আই উইল ফোন ইউ।
আমি বললাম, বহুদিন ভালো বাংলা আধুনিক শুনিনি। বৃন্দা কি কিছু পুরোনো আধুনিক জানেন? ঘাড় নেড়ে বৃন্দা বলল, এক কালে কিছু জানতাম। এখন রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া কিছু গাই না।
বুকে একটা চিনচিনে ভাব হচ্ছে হঠাৎ। একটা ভয়ও। হয়তো এই গানের নিমন্ত্রণও রক্ষা করা হবে না। সেন্ট্রাল ক্যালকাটার ছেলেদের দুর্নাম থেকেই গেল।
