—কিন্তু.কিন্তু…আমি তো…
–বারো বছর হয়ে গেছে তো! তাই মনে পড়ছে না। বৃন্দা এবার ঠাট্টার হাসি হাসছে। আর আমি মনে করার চেষ্টা করছি বারো বছর আগে কোনো মেয়ের চিঠি…
বৃন্দা ফের বলল, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের একটা গান শোনার অনুরোধ করেছিলাম। আপনি খুব মানবেন্দ্র-ভক্ত ছিলেন, না? হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই তো! তাই তো! তাই তো! আমি ভুলিনি। আমার সব মনে আছে… আমার সব মনে থাকে… চিঠির ভাষা থেকে হাতের লেখা থেকে প্রেমিকার মুখ থেকে গানের বাণী থেকে গানের সুর থেকে চোখের জল থেকে… আবার কী করে, কী করে যেন সব ভুলেও যাই। যেমন ভুলেছিলাম বৃন্দাকে।
পাড়ার ডাকসাইটে কার্ডিওলজিস্টের কিশোরী কন্যা বৃন্দা। পটে আঁকা ছবি থেকে নামানো শরীর পূর্ণ প্রস্ফুটিত নয়, কিন্তু কী রূপ! আমি বোর্ডিং স্কুল থেকে ছুটিতে বাড়ি ফিরেছি হায়ার সেকেণ্ডারি টেস্টের পড়া করব বলে। চাইলেও বোর্ডিংয়েই থেকে যেতে পারতাম। কিন্তু বেশি বেশি পড়া করতে গেলে আমার বাড়ির ছাদের চিলেকোঠাটা খুব দরকার। দারুণ নিরিবিলি। আড় চোখে আকাশ আর ঘুড়ি দেখি। পড়তে পড়তে ক্লান্ত হলে ছাদ ঘুরে ঘুরে পায়রাদের দানা খাওয়াই। কাদের পায়রা এরা জানি না। কিন্তু দানা ধরলে হাতে এসে বসে। আমি তখন দার্শনিকের মতো ইণ্ডাক্টিভ লজিকের সিলোজিজম কষি মনে মনে। সব প্রাণীই মরণশীল; সব মানুষই প্রাণী; কাজেই সব মানুষই মরণশীল।
পড়তে পড়তে সন্ধ্যে নামলে আমার আর একটা বিনোদন আছে। চিলেকোঠার পিছনের জানালাটা খুলে দিয়ে স্থির হয়ে বসা মেছো বাড়ির পিছনে অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান মেয়ে লোরেনদের বসার ঘর পরিষ্কার দেখি তখন। ঘরে গ্রাম চালিয়ে আপন মনে স্টেপিং প্র্যাক্টিস করছে লোরেন, কখনো কখনো স্ট্রিপ টিজ অভ্যেস করছে। পুরো মাত্রায়! তখন আমি আমার ঘরের লাইট নিবিয়ে ও তুলোর মতো সাদা আর লাস্যে ভরা দেহটাকে চোখ ভরে দেখি। অদ্ভুত রোমাঞ্চ হয় শরীরে, যা আমার ভালো লাগে। মিশনের ছাত্র আমি, এই বুঝি স্থলন— ভাবি আমি। পরক্ষণেই ভাবি এও তো জীবন। লোরেন যেমন এসব করে আমাকে বিব্রত করতে, আমি দেখি কারণ আমার বিব্রত হওয়ার চেয়ে ভালো লাগাটা বেশি। আমি নারী দেহ দেখছি। বিশেষ কাউকে দেখছি না। ওই দৃশ্য আর আমার ভাবনায় শরীর গরম হয়, ঘামি। কিন্তু আমি নিজেকে বলি—এ আমার পরীক্ষা। আমি পাস করবই। তারপর একসময় আমি ঘরের জানলা বন্ধ করে, লাইট জ্বালিয়ে লজিকের বই নিয়ে বসি।
কিন্তু সেদিন একতলায় পড়ছিলাম স্বৰ্গত পিতার বন্ধ সেরেস্তায়। সামনে খোলা সংস্কৃত বই। যখন ঘরে ঢুকে কাজের লোক বুড়িমা একটা ছোট্ট খাম দিল হাতে। বলল, ডাক্তারবাবুর মেয়ে বিন্দি দিয়েছে। বলেচে দাদাবাবুর কাচ থেকে উত্তর এনো।
আমি বুঝলাম না কে বিন্দি, কেন চিঠি লিখেছে, কী উত্তর চায়। আমি চিঠিটা নিয়ে বুড়িমাকে বললাম, ঠিক আছে। তুমি যাও। তারপর রাইটার্সের কেরানির উন্নাসিক ঔদ্ধত্যে পড়পড় করে খাম ছিঁড়ে বার করে ফেললাম চিঠিটা। আর পড়তে গিয়ে…না, কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না ওই কিশোরী বৃন্দা আমাকে এই চিঠি লিখেছে। এমন এক চিঠি যার কোনো উত্তর হয় না। অন্তত আমি জানি না। কিংবা, জানলেও নিজের মাথা খুইয়ে লিখতে বসতে পারব না। বস্তুত, পড়তে পড়তেই আমি যেন কীরকম হয়ে যাচ্ছি। ও লিখছে—
প্রিয়
শেষে চিঠি লিখিয়েই ছাড়লে। ছাদ থেকে কেন তাকিয়ে থাকো না আমাদের ছাদের দিকে? যাতে আমায় দেখতে পাও বা আমি তোমায় দেখতে পাই। খুব পা-ভারী লোক তুমি কিন্তু। সবাই তোমার খুব সুখ্যাতি করে। বলে তুমি খুব পন্ডিত। খুব ভালো ইংরেজি জানো। আমিও সুখ্যাতি করি। বলি, ও কোনো মেয়ের দিকে তাকায় না। খুব ভালো লাগত যদি বলতে পারতাম, শুধু আমার দিকে ছাড়া।
শুনেছি তুমি খুব গান শোনো, গান ভালোবাসো। আমিও ভালোবাসি। আমার বান্ধবীরা কেউ গান জানে না, আমি ছাড়া। কিন্তু আমি কখনো বাইরের লোকের সামনে গাই না। তুমি যদি এ চিঠির উত্তর দাও তাহলে আমি কোনো একদিন তোমায় একটা গান শোনাতে পারি। আসলে তোমার সঙ্গে খুব ভাব করতে ইচ্ছে করছে। তোমায় রাস্তা দিয়ে যেতে দেখলে খুব ভালো লাগে। ইচ্ছে হয় ডাকি, তারপর বুক ধড়ফড় করতে থাকে। জানি না তো তুমি কীরকম মানুষ। নিশ্চয়ই খুব গম্ভীর। কিন্তু রাগী নও। আমি সেধে আলাপ করলে হয়তো পাত্তাই দেবে না। সেদিন যখন চঞ্চলার মুখে শুনলাম তুমি সপ্তাহ খানেক পর বোর্ডিং-এ ফিরে যাবে তখন বাধ্য হয়ে চিঠি লিখে ফেললাম।
কে যেন বলছিল যে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যয়ের ‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি’ গানটা তোমার সবচেয়ে প্রিয় বাংলা আধুনিক। শোনা অবধি কীরকম যে করছে বুকের ভেতরটা তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। এই গানটা জীবনে সবচেয়ে ভালো লেগেছে। শুনলে কীরকম যে হয়! আর ওই গানটাই তোমার এত প্রিয় জেনে আর থাকতে পারলাম না। রোজ দু-বার করে গ্রামোফোনে শুনছি আর ভাবছি, ইশ! থাকত যদি ও এখানটায়! খুব বেহায়া ভাবছ নিশ্চয়ই আমাকে। যা আমি মোটেই নই। ছেলেদের ভালোবেসে ফেলা যে কী তা কোনোদিন জানতাম না। আর নতুন করে জানতেও চাই না। একবারই ঘাট হয়েছে আমার।
যদি চিঠির উত্তর দাও তোমাদের বুড়িমার হাতে পাঠিও। আর যদি না দাও আমি…না, আমি তোমাকে কিছু বলব না।
