আমি বারবারার কথায় কীরকম বোকার মতো হয়ে গেলাম। ময়ূর! ময়ূর দেখিনি যে তা নয়। তবে স্বপ্নে? আমি এক ঢোঁকে জাগের বাকি বিয়ারটুকু শেষ করে দিয়ে একটু বা আমতা আমতা করে বললাম, ময়ূর খুব সুন্দর ঠিকই, কিন্তু আমার প্রিয় পাখি কিছু নয়। ছেলেবেলায় দেখেছি কি না মনে নেই, এখন অন্তত স্বপ্নে ময়ূর, বক বা হাঁস-টাস দেখি না।
—তুমি কি স্বপ্নে কোকিলের ডাক শুনেছ?
–কোকিল তো এখানকার খুব ডাকসাইটে পাখি।
বারবারা হা হা হি হি করে হাসতে শুরু করল।
হাসতে লাগলাম আমিও। আর কোত্থেকে উঠে এসে নির্মলদা মেয়েটিকে বললেন, রাজু কিছু বাজে কথা বলে ফেলল বুঝি? বারবারা বলল, হ্যাঁ! ও বলতে চায় ও স্বপ্নে পাখি দেখে না। আমার ধারণা ও সাপ দেখে। কথাটা বলেই খুব গম্ভীর করে ফেলল মুখটা। যেন শেষের কথাটা মনোবিজ্ঞানের ভিত্তিতেই বলেছে। যা দেখে ভেতরে ভেতরে হোঁচট খেলাম আমি। কারণ আমি তো সত্যিই বিরাট বিরাট সবুজ সবুজ ময়াল সাপ দেখি স্বপ্নে। কী যে তার মানে তা কেবল ফ্রয়েড সাহেবই জানেন। নির্মলদা বারবারার কথার সংশোধন করে বললেন, দুর! রাজু কেবল বড়ো বড়ো স্বপ্ন দেখে। ও সাপখোপ দেখবে কেন? ও কুমির দেখে।
আমরা ফের জোরে জোরে হাসতে লাগলাম। আর তখনই বসার ঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে কেতাদুরস্ত উচ্চারণ আর মধুঝরা সুরে সোমা ঘোষণা করল, ডিনার ইজ সার্ভড। শ্যাল উই মুভ টু দ্য ডাইনিং প্লেস? নির্মলদার স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমিস্ট্রেস শার্লি পাইন্টার ছুটে গিয়ে সোমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলেন, ও! হোয়াট আ ফাইন পিস অব ইনফর্মেশন। সাউণ্ডস লাইক মিউজিক!
আমি এইমাত্র প্লেটে উঠিয়ে নিলাম আরেক পিস ল্যাম্ব রোস্ট। উঃ কী ভীষণ ভালো বেঁধেছে পদটা সোমা। মেয়েটা সত্যিই একটা জিনিয়াস। তেরো-চোদ্দো বছরের একরত্তি মেয়ের মধ্যে অবলীলায় মিশে আছে একটা মা, একটা মেয়ে, একটা বোন। যেমন বাবাকে তেমনি এই উড়ে এসে জুড়ে বসা কাকুটিকে খাইয়ে-পরিয়ে যত্ন-আত্তিতে জিইয়ে রেখেছে। এ ক-দিনের মধ্যেই ওর বাবার দশা আমারও। সোমা না থাকলে চোখে অন্ধকার দেখি। শুনেছি ক-দিন বাদে স্কুলের এক্সকার্সনে স্কটল্যাণ্ডে যাবে। তখন যে কী হাল হবে আমাদের এক ভগাই জানে। আমি ল্যাম্বের দ্বিতীয় টুকরোটা ছুরি-কাঁটায় ছিড়তে ছিড়তে ইতিউতি তাকালাম সোমাকে ডাকব বলে। সাঙ্ঘাতিক একটা প্রশংসা ওর প্রাপ্য। কিন্তু কোথায় সোমা? লোকের ভিড়ে মিউনাইট ব্লু গাউন পরা মেয়েটিকে তো কোথাও দেখছি না। নিশ্চয়ই ডেসার্ট প্লেটগুলো রেডি করতে গেছে। মেয়েটার মাথার মধ্যে একটা রোলেক্স কি ওমেগা ঘড়ি গাঁথা আছে নিশ্চয়ই। আমি একটা ল্যাম্বের টুকরো পুরলাম মুখে।
লণ্ডনের বাঙালি ও ইংরেজ পরিবারে দুটো-একটা ডিনারে আমন্ত্রণ পেয়েছি এর মধ্যে। দেখেছি খাওয়ার শেষে অতিথিরা নিজের নিজের প্লেটগুলো সিঙ্কে নিয়ে ধুয়ে দেন। দেশের মতো এখানে তো আর কাজের লোক রাখার বিলাসিতা বিশেষ নেই। দিনে ঘণ্টা দুয়েকের জন্য কাজের লোক রাখলে যে দক্ষিণা গুনতে হবে তাতে মনিবের কামাই ফুরিয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়। ফলে এসব ক্ষেত্রে সবখানেই দেখি আপনা হাত জগন্নাথ। এ বাড়িতে আমার আবির্ভাবের প্রথম দিনেই নির্মলদা যে দু-চারটে ব্যবহারিক শিক্ষা আমায় দিয়েছিলেন তার একটা হল গরম আর ঠাণ্ডা জল মিশিয়ে, প্লেটে গ্লাসে ওয়াশিং পাউডার ঢেলে নিজের বাসন ধুয়ে, ন্যাকড়ায় মুছে জায়গা মতো গুছিয়ে রাখা। অনেক দিন বাসন ধুতে ধুতে সিঙ্কের পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করেছি নির্মলদা কি সোমার সঙ্গে। নির্মলদা বলেন, সিঙ্কের পাশের এই জায়গাটা আমাদের উঠোন। এখানে দাঁড়ালে পরনিন্দা-পরচর্চা আপনা-আপনি আসে। আর আস্তে আস্তে এও দেখেছি যে, এ জায়গাটায় একলা দাঁড়িয়ে বাসন মাজার সময় আমার মনে পড়ে দেশের কথা। মায়ের কথা। মা কোনোদিন অন্যকে দিয়ে নিজের বাসন ধোয়ায় না।
ক্রমে ক্রমে সবাই নিজের নিজের বাসন ধুয়ে, জায়গা মতো রেখে আইসক্রিম কেকের প্লেট নিয়ে ড্রইং রুমে চলে গেছে। পার্টিতে শেষ ঢুকেছিলাম আমি, ডিনারও সবার শেষে হাসিল করলাম আমি। তাই কিছুটা লজ্জার সঙ্গেই গুটিগুটি হাতের প্লেট আর কাঁটা-চামচ নিয়ে চলে এসেছি রান্নাঘরের এক প্রান্তে বসানো ডিশ ধোয়ার সিঙ্কে। লজ্জা আরেকটা কারণেও; এখনও কাঁটা-চামচে পরিপাটি করে খাওয়া রপ্ত করতে পারলাম না। চিকেনের পদটা প্রায় অনাস্বাদিতই থেকে গেল আমার হাতুড়ে মার্কা খাওয়ার পদ্ধতিতে। কাঁটা-চামচের খটখটাং আওয়াজ বার করি না ঠিকই, কিন্তু সামান্য কুটকুট আওয়াজেও আহার সারতে পারি। কাঁটা-চামচ ধরলেই স্যুট-বুটের ভেতর থেকে আমার ভেতো বাঙালি সত্তাটা এখনও উঁকিঝুঁকি দেয়। প্লেটে খাবারের অবশিষ্টাংশের স্থূপ দেখে জিভ কাটতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ পিছন থেকে… আমার চিঠির উত্তর পাইনি কিন্তু।
সুরেলা, মেয়েলি কণ্ঠে কে বলল একথা? চকিতে ঘুরে দেখি কিচেনের দরজায় একটা অভিমানী হাসি মেখে দাঁড়িয়ে আছে বৃন্দা। চিঠি! কীসের চিঠি! কার চিঠি! কেন! আকাশ পাতাল ভেবেও কিনারা করতে পারছি না। আমতা আমতা করে বললাম, আমায় বললেন, বৃন্দা।
বৃন্দা এক রতি অভিমানও ত্যাগ না করেই বলল, আবার কাকে?
