সোমার ডাক শুনে আমার চকিতে মনে পড়ল অফিসের বন্ধু রাণাকে। ও-ই চিঠি লিখে আমার থাকার বন্দোবস্ত করেছিল লণ্ডনে। বলেছিল, থাকবি তো চার মাস। অযথা পাউণ্ড নষ্ট করবি কেন? দাদাকে লিখে দিচ্ছি—তোর বোর্ড অ্যাণ্ড লজিং ফ্রি। পকেটে যা থাকে নিজের কাজে খরচ কর। দাদাকে একটা পেনিও দেবার দরকার নেই।
একই সঙ্গে আশ্বস্ত এবং বিব্রত হয়ে বলেছিলাম, সে কী বলছ! অতদিন থাকব, একটা পয়সাও দেব না সংসারে?
রাণা বলল, এগজ্যাক্টলি! দাদার ওখানে ওটাই নিয়ম। আর দাদার সংসার বলতে তো দাদা আর সোমা। বউদি শিলঙে থাকেন, কলেজ অধ্যাপিকা। ছুটিছাটায় লণ্ডন যান। দেখবি সোমাই তোর দেখাশোনা করবে। শি ইজ এ জেম অব এ গার্ল! সোমাই ডেকে উঠল ফের, কাকু! আর আমি এই প্রথম ওর ডাকে উত্তর করলাম, যাচ্ছি! আই’ম রেডি! রীতিমতো বিব্রত হয়ে আমি ওই মেরুন জমিতে নীল পোলকা ডটের টাইটা চড়িয়ে লম্বা লম্বা স্টেপিং-এ নেমে এলাম একতলার বসার ঘরে।
কোনো অর্থেই কোনোদিন আমি পার্টি ম্যান নই। পার্টিতে লাগসই কথোপকথন আমার আসে না, ঘুরে ঘুরে বারোজনের সঙ্গে আলাপ জমাতে পারি না, কাকে, কোন পার্টিতে আগে দেখেছিলাম মনে করতে পারি না। আরও বড়ো সমস্যা, হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে একই সঙ্গে খাওয়া আর বাতচিৎ চালিয়ে যেতে পারি না। প্রায়ই দেখি আমি যখন খাবার তুলেছি হাতে তখন একে একে লোকজন আলাপে প্রবৃত্ত হচ্ছেন আমার সঙ্গে। শেষে আধপেটা খেয়ে নিজেকে দুষতে দুষতে বাড়ি ফিরি। কিন্তু আজ আমি পেট পুরে খাব বলে প্রতিজ্ঞা করেছি, কারণ দেড় দিন ধরে স্কুলের পড়ার ফাঁকে ফাঁকে পদগুলো তৈরি করেছে সোমা! আর সুযোগ বুঝে একবারটি শুনিয়েও রেখেছে, কাকু, ল্যাম্ব রোস্টটা কিন্তু তোমার জন্য স্পেশ্যালি মেড। আই মাস্ট হ্যাভ ইয়োর ওপিনিয়ন।
আর আমি এখন সেই পার্টির মাঝখানে।
নির্মলদা লণ্ডনের এক পাবলিক স্কুলের শিক্ষক বলে ওঁর অভ্যাগতদের অধিকাংশই শিক্ষক-শিক্ষিকা। যাঁদের অধিকাংশই আবার সাহেব-মেম। শিক্ষক বললেই আমাদের দেশে কিছু ভারিক্কি চেহারার বয়স্ক লোকের চেহারা মনে পড়ে। নির্মলদার সহকর্মীরা দেখলাম দারুণ হাসিখুশি, টগবগে তরুণ-তরুণী। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়েসি নির্মলদাকে যাঁরা ‘পাপা, ‘ওল্ডম্যান’, ‘গ্র্যাণ্ডপা’ বলে ডাকছেন, ঠাট্টা করেই। কিন্তু নির্মলদার কাছে ডাকগুলো ভীষণ অমায়িক ঠেকছে। নির্মলদার স্বভাবগম্ভীর আচার-ব্যবহারও দেখি বিলকুল বদলে গেছে ওঁদের সঙ্গে পড়ে। উনি ওঁদের কাছে আমাকে পরিচয় করালেন ভাইয়ের বন্ধু বলে নয়, ‘জাস্ট অ্যাবাউট মাই ইয়ঙ্গার ব্রাদার হিসেবে। বলতে বলতে হাতে ধরিয়ে দিলেন বিয়ারের একটা জাগ। তারপর নিয়ে এলেন ওঁর বাঙালি বন্ধুদের কাছে। চার-চারটি বিভিন্ন বয়সি বাঙালি দম্পতি। চতুর্থ দম্পতি বয়সে সবচেয়ে ছোটো, নির্মলদা জানালেন স্বামীটি ম্যাকেলসফিল্ড হসপিটালের সার্জেন। স্ত্রী পার্ট টাইম কাজ করে পোস্ট অফিসে। নাম বৃন্দা। আর…
আর কিছুই আমার মগজে ঢুকছে না। আমি ক্ষণিকের জন্য অসম্ভব অবাক হয়ে তাকালাম মেয়েটির দিকে। রূপে জ্বলে যাচ্ছে সারা দেহ। যেমন রূপ শুধু ছবিতেই দেখি আমরা। আর দেখলেই মনে হয়, আহা, কত চেনা মুখ! কী যেন নাম? আসলে চেনা নয় কোনোখানেই, তবু মনে হয়। আর সব মনে হওয়াটাই বিদ্যুতের এক ঝলকের মতো। কিন্তু তারই মধ্যেই বিষণ্ণ হয়ে পড়ে মনটা। আগে কোনোদিন না দেখার অনুশোচনায়, পরেও হয়তো দেখা না হওয়ার সম্ভাবনায়।
নির্মলদা আমার পরিচয় দিতে গিয়ে কীসব বলছেন আমি শুনতে পাচ্ছি না। শুধু হাসি হাসি মুখ করে ফ্যালফ্যাল করে দেখছি বৃন্দাকে। আর দেখছি বৃন্দাও আমাকে দেখছে! আর হঠাৎ কীরকম লজ্জা হল আমার। আমি বিয়ারের ঢোক গিলতে গিলতে সরে এলাম পার্টির অন্যত্র।
একটি ইংরেজ যুবতী সবার নজর কেড়ে নিয়েছে। সে তার স্কুলের ভূগোল, ইতিহাস, অঙ্ক ইত্যাদির শিক্ষকদের গলা আর হাবভাব অনুকরণ করে দেখাচ্ছে। সেইসব শিক্ষকদের প্রশ্নের জবাবে বালক-বালিকারা যেভাবে কোঁকায় সেই স্বরও ‘উই উঁই, কুঁই কুঁই করে শোনাচ্ছে। ওর আশপাশের সবাই হেসে কুটোপুটি যাচ্ছে, তাদের দেখাদেখি আমিও খুব হাসছি। আমার খুব ভালো লাগছে এই ভেবে যে, কলকাতার পার্টিগুলোতে যেরকম আজেবাজে কথা হয়, অনুপস্থিত লোকের নিন্দে হয় আর একটা-দুটো লোক বেরোয় যারা জীবনের সমস্ত কান্নাকাটি লোকজনের সামনে সেরে ফেলবে বলে তৈরি হয়ে আছে তেমন কিছুর সম্ভাবনা এখানে নেই। ভালো লাগছে এটা দেখেও যে কেউ কাউকে জোর করে বেশি বিয়ার, হুইস্কি, ওয়াইন গিলিয়ে দিচ্ছে না। আর ভীষণ ভালো লাগছে শুনতে কিছু বিশুদ্ধ অক্সফোর্ড-ইংরেজি অ্যাকসেন্টি। ক্রমে এইসব বিক্ষিপ্ত বিক্ষিপ্ত ভালোলাগাগুলোকেও ভালো লাগতে শুরু করেছে আমার। আমার মতো লোকের ভেতরে যে ধরনের বিলাত-বিলাসিতা লুকিয়ে থাকে সেটাই যেন দামি মদের মতো আস্তে আস্তে অধিকার করছে আমাকে। বৃন্দার মুখটা ভুলতে যতটা কষ্ট হবে ভেবেছিলাম তেমন কষ্ট কিছুই হচ্ছে না। তৃতীয় কিংবা চতুর্থ বিয়ার হাতে আমি নিজেকেই ভুলতে বসেছি।
আপনাদের দেশে তো খুব ময়ূর হয়। আপনি স্বপ্নে কখনো ময়ুর দেখেছেন?—আমি চমকে উঠে পাশে তাকিয়ে দেখলাম প্রশ্নটা করেছে বারবারা নামের মেয়েটি। কিছুক্ষণ আগে নির্মলদা যার সঙ্গে পরিচয় করাতে গিয়ে বলেছিলেন, জানো তো, বারবারা ড্রইং টিচার হলে কী হবে, ওর আসল প্যাশন কিন্তু সাইকোলজি। মনোবিজ্ঞানের ওপর একটা থিসিস নিয়েও ও কাজ করছে।
