রাতে শুয়ে আছি, চোখে ঘুম নেই। একটু আগে বেডল্যাম্প জ্বেলে নীরস বই পড়েও ঘুম আনানোর চেষ্টা করেছি, কাজ হয়নি।
পাশ ফেরার বহর দেখে মনে হচ্ছে বৃন্দার চোখেও ঘুম নেই। বোধহয় তিস্তার সমস্যা এখন আমাদের দুজনের ওপরই ভর করেছে। হঠাৎ শুনি অন্ধকারে বৃন্দার গলা, সব শুনলে ওর সমস্যা?
বললাম, শুনলাম তো। দেখি ওর মার সঙ্গে কথা কয়ে।
বৃন্দা বলল, লাভ নেই।
-কেন?
—সমস্যা যে মেটার নয়।
—কেন, ছেলে কি খারাপ?
—চমৎকার ছেলে। ফুসফুসটা খারাপ। লিমাদির আসল আপত্তি ওইখানে, তিস্তা চেপে গেছে।
-ফুসফুঁসের কী হল আবার?
—সাসপেক্টেড প্লুরিসি। কিছুদিন হল ধরা পড়েছে।
—এই বয়সে যক্ষ্মা?
—ছেলেটা যে বাল্যকাল থেকে অপুষ্টিতে ভুগছে। বাব নকশাল, মা নকশাল। আণ্ডারগ্রাউণ্ডে থেকে থেকেই তো সংসার করেছে। ভালো চাকরি খুইয়েছে। ছেলেটার বোধহয় ভালো করে দুধও জোটেনি কোনোদিন। পিসিমার কাছে বড়ো হয়েছে।
–তা তুমি এতসব জানলে কোত্থেকে?
—তিস্তার কাছেই শুনেছি। যাকগে তুমি এখন ঘুমোও। কাল দশটায় ক্লাস আছে। মনে আছে?
আমি অন্ধকার ঘরের মধ্যে আরও গভীর এক অন্ধকারে পথ হাতড়াতে হাতড়াতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম খেয়াল নেই। ঘুম ভাঙল চা নিয়ে বৃন্দার ডাকে, ওঠো সাড়ে ছটা বেজে গেছে।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে কী ভাবছিলাম জানি না, বৃন্দা স্টেটসম্যানটা নিয়ে এসে আমার সামনে রাখল। কাগজটা উলটেপালটে দেখবারও উৎসাহ পাচ্ছি না। শুনি, বৃন্দা বলছে। আচ্ছা প্লুরিসি সারে না? আমি হেসে ফেললাম, কী যা-তা বলছ? চিকিৎসা হলেই সারবে। কথা হচ্ছে, সেজন্য পয়সা লাগবে।
বৃন্দা বলল, সেটাই তো কথা। বেকার ছেলে কোথায় পাবে? বললাম, আর শুধু তো চিকিৎসা নয়, ভালো পথ্যও চাই।
হঠাৎ বৃন্দা বলল, আচ্ছা তুমি পার না ওকে এই সাহায্যটা করতে?
আমি হাসলাম। টাকা তো সব তোমার কাছেই থাকে। তুমিই তো ভালো জান আমার কতটুকু কী সম্বল। মাস গেলে আরও দু-আড়াই হাজার টাকার কমিটমেন্ট তো ইয়ার্কি নয়।
তা ঠিক। বলে আরেক কাপ চা আনতে উঠে গেল বৃন্দা। আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম আমার শরীরে হঠাৎ এক অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। তিস্তার সমস্যার সমাধানের একটা আশা যেন দেখতে পাচ্ছি সহসা। বলতে গেলে তিস্তাই হদিশটা দিয়ে গেল নিজের অজান্তে।
ও চা নিয়ে ফিরতেই আমি সমাধান বাতলে দিলাম, বৃন্দা বাড়তি দু-তিন হাজার কিন্তু সমস্যা হওয়ার কথা নয় আমার কাছে। কথার মাথামুন্ডু ধরতে না পেরেও ও বলল, কীরকম?
-কেন প্রাইভেট টিউশনি?
—টিউশনি! তুমি টিউশনি করবে, যাতে তোমার এত ঘেন্না, আমার স্কুলের টিউশনিও ছাড়িয়ে দিলে যে কারণে।
বললাম, প্রয়োজন। প্রয়োজনে মানুষ সব করে। কথায় আছে না? অল ইজ ফেয়ার ইন লাভ অ্যাণ্ড ওয়ার। প্রেম ও যুদ্ধে সবই বলিদান দেওয়া চলে। আমি না হয় ছ-আট মাস কি এক বছরের জন্য আমার নীতিকেই উৎসর্গ করলাম।
বৃন্দা বলল, তো এই নীতি বর্জন যুদ্ধ না প্রেমের জন্য?
বললাম, প্রেম। তিস্তার প্রেম।
মনের ভিতর খেলে গেল দূর অতীতের দুই বন্ধুর দিদির জন্য ক্ষণকালের এক প্রেমের স্মৃতিও। লালিমার খোলা বুকে শিশুর মতো হাত ছুইয়ে বসে এক স্বর্গের স্বাদ। ঠিক সময় জানালা দিয়ে দিনের প্রথম রোদ্দুর এসে বৃন্দার মুখে পড়ে ওকে উদ্ভাসিত করে তুলল।
আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি
আমি বরাবরের সেই ল্যাবেণ্ডিস মার্কা রাজুই থেকে গেলাম। নীচে পার্টির সব অভ্যাগতই এসে গেল, আমার এখনও টাই বাছা হল না। সাদার ওপর নীল পিনস্ট্রাইপ শার্টের ওপর নীল ব্লেজারটা চাপালেই মেরুনের ওপর স্কাই ব্লু পোলকা ডটের ওই টাইটা উঠে আসবেই গলে। এভাবেই চলে আসছে গত সাত দিন; ভেবেছিলাম আজ নতুন একটা টাই বেছে ফেলবই।
আর এখন আমি আধ ডজন টাই নিয়ে গলায় ঘোরাচ্ছি। আর এইমাত্র
-রাজুকাকু! প্লিজ গেট রেডি। সব্বাই এসে গেছে। উই আর অল ওয়েটিং ফর ইউ। দরজায় টোকা মেরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকছে আমায় সোমা। ভাবছে অত না চেঁচালে আমার ঘুম ভাঙবে না। মেয়েটার ধারণা আমি দোর দিলেই কম্বলের নীচে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ি। ওর ভাষায়-কাকুর লণ্ডন ঘুম!
আর আমি আধ ডজন টাই হাতে আলমারির আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। আমি কোনোদিন মানুষ হব না।
এক মাসও হয়নি আমার নির্মলদার বাড়িতে, কিন্তু কারো আর জানতে বাকি নেই আমি কী অসম্ভব স্নান, নিদ্রা আর আত্মবিলাসী। যদি বাথটাবে সাবান জমিয়ে স্নানে নামলাম তো ঘড়ি স্থির হয়ে গেল। যদি ঘুম লাগালাম তো নাওয়া-খাওয়া চুলোয় গেল। আর যদি এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে জানালার পাশে বসলাম তো আমার থেকে ‘আমি’টাই উধাও হল। আমি একটা রক্ত-মাংসের স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। তখন ক-বার সোমা নীচের থেকে হাঁক দিল, নির্মলদা দোতলার টয়লেট ব্যবহার করতে এসে মৃদুকণ্ঠে ক-বার ডাকলেন ‘রাজু! রাজু!’ আমার খেয়াল থাকে না। কিন্তু এই বিশ্বকুঁড়েমির সঙ্গে এক বিশ্বকপালও আমার জুটেছে। সবাই আড়াই দিনের মাথায় আমার ভাবগতিক বুঝে নিয়ে তৃতীয় দিন থেকে আমার সাতখুন মাফ করতে থাকে। সোমা আর ওর বাবাও আমাকে প্রশ্রয়ের সুরে ইদানীং ডাকে ফিলোসফার বলে। ওদের ধারণা আমি সম্ভবত ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও ভাবি।
সত্যিই যদি ওরা দেখতে পেত আমার ভিতরটা। আমি যখন স্নানে কিংবা নিজের মধ্যেই ডুবে থাকি তখন আসলে আমি কিছুই ভাবি না। শুধু একটা স্বপ্ন স্বপ্ন ভাব ছেয়ে থাকে আমার চোখে, যা আমি আনমনে দেখি। আবার দেখিও না। কিন্তু ভীষণ সুখ অনুভব করি। বাবার কথা মনে পড়ে, যিনি থেকে থেকেই বলতেন, রাজুকে আমি অক্সফোর্ডে পড়াব। কিন্তু হঠাৎ একদিন মামলার ফাইল দেখতে দেখতে সেরেব্রাল স্ট্রোক হল বাবার। ফলে কথা রাখা হয়নি। লণ্ডনে এসে অজস্র সুখের মধ্যে একটা সুখ হল মনশ্চক্ষে বাবার সেই মুখটা দেখতে পাওয়া। একেক দিন গলায় টাই বাঁধতে বাঁধতে আমি আপন মনে হেসে ফেলি। কারণ আয়নায় তখন আমি আমার মুখের জায়গায় দেখতে পাই বাবার মুখ। কোর্টে যাওয়ার আগে তড়িঘড়ি টাইয়ের নট ফাঁসাতে গিয়ে লেংথ মিস করছেন!
