তোমার জামাইবাবুর অসুস্থতার পর থেকে উত্তরপাড়ার এই সাহেব বাড়ির উঠোন ছেড়ে কোথাও যাওয়া হয় না আমার। কিন্তু তুমি যদি ভালোবেসে এই দিদিটাকে একদিন দেখতে আসো বড়ো শান্তি পাব। তিস্তাকে যদি একান্ত পড়াতে নাই পার একবারটি অন্তত আমাদের দেখতে এসো। ঈশ্বর তোমার অনেক খ্যাতি, সম্মান আর দীর্ঘজীবন দিন, এই প্রার্থনা করি।
ইতি–
লালিমা
চিঠিটা পড়তে পড়তে বুকের ভেতর একটা অব্যক্ত ব্যথা টনটনিয়ে উঠল। আমি চিঠিপড়া শেষ করেই তিস্তার মুখের দিকে তাকালাম। তাই তো সেই গমের মতো গায়ের রং। সেই টানাটানা, বড়ো বড়ো চোখ। গালে সেই টোল। সেই লাজুক হাসি। এমনকী চুলের বিনুনি আর শাড়ি পরারও সেই একই টং।
আমি চিঠিটা পাট করে খামে ভরে পকেটে রেখে বললাম, তিস্তা, তুমি সামনের সপ্তাহ থেকে মঙ্গল আর শুক্রবার সন্ধ্যে ছটায় আমার বাড়ি চলে এসো। এই নাও ঠিকানা।
তারপর কী একটা ভেবে ফের বললাম, কিন্তু তিস্তা, সন্ধ্যে আটটা সাড়ে আটটার পর তুমি উত্তরপাড়া ফিরবে কী করে?
বোধহয় এই প্রথম তিস্তা এত জোরের সঙ্গে জবাব দিল, স্যার ও আমি পারব। এত কিছু দূর নয় উত্তরপাড়া। কত বাস। কত ট্রেন। মার একটু চিন্তা হবে ঠিকই কিন্তু মা-ই তো চাইছে।
তিস্তা ফের টেবিলের তলা থেকে আমার পা খুঁজে বার করে প্রণাম করল। আমি বললাম, থাক থাক। তারপর গলাটা একটু নামিয়ে বললাম, মাকে বলবে কোনোরকম মাইনে দেওয়ার চেষ্টাও যেন না করা হয়। তাহলেই পড়ানো বন্ধ। তিস্তা হাসল, ওর ওই মায়ের মতো লাজুক চোরা হাসি।
কী করে, কী করেই যে সময় কেটে যায়। আজ তিস্তার সেকেণ্ড পার্টের রেজাল্ট বেরিয়েছে। প্রথম পার্টে মাত্র নয় মার্কের জন্য ফার্স্টক্লাস মিস করেছিল বেচারি। দ্বিতীয় পার্টে সব মেক আপ করে সিক্সটি ফোর পার্সেন্ট নিয়ে ওভারল শুধু দীপ্তিময় বসু।
কলেজ থেকে বাড়ি ফিরেই শুনি বৃন্দা বলল, তিস্তা ফোন করেছিল। ফার্স্ট ক্লাস সেকেণ্ড হয়েছে। একটু পরেই দেখা করতে আসছে। তুমি বেরিয়ে যেয়ো না কিন্তু।
আমি গা ধুয়ে পাজামা-পাঞ্জাবি চাপিয়ে সবে এসে বসার ঘরে বসেছি তিস্তা ঢুকল বিরাট মালপত্তর নিয়ে। আমি অবাক হয়ে বললাম। এসব কী রে তিস্তা? তিস্তা ওর বস্তা-টস্তা আমার পায়ের কাছে রেখে, প্রণাম সেরে বলল, কিছু না।
বললাম, কিছু না তো এসব বগলে করে আনলি কেন? তিস্তাকে এখন তুই’ করেই বলি, ও-ও স্যার-টার ঝেড়ে ফেলে ডাকে মামু। ও বলল
মামু, এসব মা-র কীর্তি, আমি কি জানি না।
দেখতে দেখতে ঝোলা থেকে বেরুল আমার ধুতি, পাঞ্জাবি, সুট লেংথ। বৃন্দার জন্য শাড়ি, এইচ এমটি ঘড়ি আর আমাদের কন্যা নন্দিনীর জন্য এক গুচ্ছের খেলনা। সেইসঙ্গে ভীমনাগের সন্দেশ।
বৃন্দাও ঘরে ঢুকে এতসব দেখে হতবাক। আমি বললাম, তিস্তা তোকে পড়ানোর জন্য তো কোনো টাকার কথা হয়নি। তাহলে এসব করতে গেল কেন তোর মা?
তিস্তা বলল, মামু আপনাদের কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই ঠিকই। কিন্তু মা-রও তো কিছু দিতে ইচ্ছে করে।
আমি চুপ করে গেলাম। বৃন্দা বলল, দাঁড়াও তোমাদের কফিটা করে আনি।
ও চলে যেতে তিস্তাকে বললাম, হ্যাঁরে, বাবা কেমন আছেন?
ও বলল, বাবা ঠিকই আছে। মা ভালো নেই।
তিস্তা বলল, আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা।
-তোকে নিয়ে দুশ্চিন্তা! কেন ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিস বলে?
–না, সৌম্যকে বিয়ে করতে চাই বলে।
—সৌম্য কে?
—ফিলজফির সৌম্য। গতবারে এম এ পাস করেছে।
—তাতে কী হল?
—ছেলেটার চালচুলো নেই। মার ভীষণ আপত্তি।
জিজ্ঞেস করলাম, চাকরি করে?
তিস্তা মাথা নীচু রেখেই বলল, কলেজ টিচার্স প্যানেলে নাম উঠেছে, এখনও পোস্ট পায়নি।
—তা হলে?
–আপনাকেই বোঝাতে হবে মাকে।
–মা কী বলে?
-বলে, তোর জন্য অনেক কষ্ট করেছি জীবনে। ছোটো থেকেই কষ্ট করছি। তোরও কষ্ট দেখলে মরে যাব।
বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল আমার। লালিমার কষ্ট তো আমি নিজেও দেখেছি। হে ভগবান, ওই কষ্ট যেন তিস্তার ওপর না গড়ায়।
বললাম, সৌম্য, ছেলে কেমন?
তিস্তা বলল, অপূর্ব! তবে প্র্যাক্টিক্যাল সেন্স কম। না হলে উচ্চমাধ্যমিকের স্ট্যাণ্ড করা ছেলে ফিলোজফি পড়তে যায়? এদেশে এই সাবজেক্ট নিয়ে অধ্যাপনা ছাড়া কিছু জোটে?
-কেন অধ্যাপনা খারাপ পেশা? আমি করি না?
–ও-ও আপনার মতোই বলে, জীবনে টিউশনি করব না, নোট বেচব না।
—তাহলে শুধুই পড়াবে?
—আর বলে শংকরাচার্য নিয়ে গবেষণা করবে।
আমার বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠল ব্যথায়। জীবনে কত বাসনা ছিল কান্ট-এর দর্শন নিয়ে গবেষণা করব। পড়াতে পড়াতে কীভাবে সময় চলে গেল। ইংরেজির লোক হয়েও দর্শনের ওপর এই মোহ আমার কাটল না অ্যাদ্দিনে। টিউশনি যে করি না তার একটা কারণও দর্শন পড়ার জন্য সময় বাঁচানো।
আবার আনন্দও হল সৌম্যর কথা ভেবে। আজকের এই র্যাট রেসের দিনেও একটা ছেলে শংকরাচার্য নিয়ে পড়তে চাইছে। আমার চটকা ভাঙল তিস্তার কথায়। মামু, আপনি মাকে বোঝাবেন।
বললাম, বোঝাতে পারব কি না জানি না। তবে চেষ্টা করব।
কফি আর খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকে বৃন্দা বলল, তোমরা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলে কেন? ফার্স্ট ক্লাস সেকেণ্ডেও মন ভরছে না?
আমি কফির পেয়ালা হাতে নিতে নিতে পরিবেশ হালকা করার জন্য হিন্দি সিনেমার চালে বললাম, সমস্যা গম্ভীর হ্যায়।
