আমি আর কিছু বললাম না। সোনালি হাত ধুয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, তুমি চলে এসো কাকু। তোমাকে আইসক্রিম সার্ভ করব।
হাতে সুইট ডিশ নিয়ে এবার আমিই জটলার মধ্যে খুঁজে বের করলাম রানিকে। পাশে ওর ডাক্তার বর অমিত। বললাম, তবুও ভালো-যাওয়ার মুখে আপনাদের সঙ্গে আলাপ হল।
অমিত বলল, নির্মলদার কাছে শুনেছি আপনার কথা। এখন আলাপ হয়ে আরও ভালো লাগল। একদিন আসুন না আমাদের ওখানে, আমি আপনাকে পিক করে নেব। চাইলে নিটোল বাঙালি রান্না খাওয়াতে পারি আপনাকে। রানি ইজ আ গুড কুক।
আমি বললাম, রান্না-টান্না ঠিক আছে, তবে আপনার গিন্নি এক আধটা গান শোনালে যাওয়ার টান আরও বাড়ত।
অমিত এবার সত্যিই অবাক হয়ে গেছে—গান? আপনি কী করে জানলেন রানি গান জানে?
বেকায়দায় পড়ে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করলাম কথা ঘোরাবার। আসলে ওকে দেখেই মনে হয় ভালো গান জানেন।
এবার উত্তর করল রানি, জানতাম। সব ভুলে গেছি। গান শোনানোর মতো লোক চাইলেও তো পাওয়া যায় না।
বললাম, কেন, অমিতবাবু?
অমিতই প্রতিবাদ করল, আর বলবেন না মশাই, যা কাজের শিডিউল এখানে। নিজেও এককালে একটু আধটু রবীন্দ্রসঙ্গীত করতাম। সব চুকে বুকে গেছে।
বুকে বল সঞ্চয় করে বললাম, গিন্নিও কি বাংলা রবীন্দ্রসঙ্গীতের দিকে?
অমিত বলল, না, না, ওর গলায় বাংলা আধুনিক দারুণ খেলত। লতা, গীতা, সন্ধ্যা, হেমন্ত, শ্যামল, মানবেন্দ্র…
মুখ ফুটে অকস্মাৎ বেরিয়ে এল, বাঃ অপূর্ব। তারপর একটু থেমে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম। আচ্ছা, মানবেন্দ্রর ‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি’ গানটা কি …
আমার কথার মধ্যেই কীরকম এক সুরেলা অভিমানী কণ্ঠে বলে উঠল রানি, না না, ওই গানটা কখনো তোলা হয়নি নীতিনবাবু।
আমার হাতের আইসক্রিমের প্লেটটা যেন আরও ঠাণ্ডা হয়ে গেল। বুঝলাম, গলাটাও বসে যাচ্ছে। রানি আমার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে পার্টির অন্যদের দেখতে শুরু করল। এক আধবার হাতে ঘড়িও দেখল। যেন এক্ষুনি চলে যেতে হবে।
আমি অমিতকে একটু আসছি বলে সরে এসে কিচেনের দরজা দিয়ে পিছনের বাগানে গিয়ে তারার অন্ধকারে দাঁড়ালাম। কৈশোরের ছাদের সেই অন্ধকারগুলো ভিড় করে আসছে। মনের ওপর। ফিকে একটা সুরের ধ্বনি বেরিয়ে আসছে পাটিরুম থেকে। সেই মহিলা পিয়ানোয় এবার ধরেছেন–‘আই কুড হ্যাভ ড্যান্সড অল নাইট, অ্যাণ্ড ইয়েট বেগ ফর মোর’। আর একটু একটু করে আমার মগজে ছড়াচ্ছে একটা বাংলা আধুনিক প্রেমের গান যেটা কিশোরী রানির কন্ঠে আমার শোনার কথা ছিল, হয়নি।
একটা ক্লাসের পর একটা পিরিয়ড ব্রেক ছিল। আমি বেয়ারা সঞ্জীবকে এক পেয়ালা কফির অর্ডার করে একটা সিগারেট ধরিয়ে বসলাম লেকচারার্স রুমে। সবে দু-তিনটে টান দিয়েছি সুখ করে হঠাৎ পায়ে মৃদু স্পর্শ কীসের। চোখ তুলে দেখি প্রণাম সেরে উঠে দাঁড়াল তিস্তা।
তখনও ঠিক সোজা হয়ে দাঁড়ায়নি, আমি হাত বাড়াতেই ওর মাথাটা পেয়ে গেলাম। মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম, থাক, থাক, এখানে আর এত প্রণাম-ট্রণামের কী আছে? তারপর একটু থেমে বললাম তা কী ব্যাপার বল?
বড়ো বুদ্ধিমতী এই মেয়ে, ক্লাসে, এমন সব প্রশ্ন করে সময় সময় তা ওর বি এ সেকেণ্ড ইয়ারের তুলনায় ঢের মেচিওর্ড। ওই প্রশ্নগুলো করা ছাড়া ওর গলায় শব্দ বিশেষ শোনা যায়। ওর চেহারার মতো স্বভাবেও কীরকম একটা স্নিগ্ধ নির্জনতা লুকিয়ে আছে। হয়তো একটা অস্পষ্ট বেদনাও।
স্নিগ্ধ চাপা স্বরে বলল, স্যার, মার খুব ইচ্ছে আপনি শেক্সপিয়রের পেপারটায় আমায় একটু প্রাইভেট টিউশন দিন। অনেক বলেছি মাকে যে আপনি প্রাইভেট করেন না। তবু মা ঠিক বুঝতে চাইছে না।
কথাটা ভুল না। প্রাইভেট টিউশন ব্যাপারটাতেই আমার ঘোর আপত্তি। কলেজে পড়াচ্ছি পড়াচ্ছি। কিন্তু তার বাইরে প্রাইভেট নোট সাপ্লাই করে পয়সা কামানোকে আমি পাটোয়ারি ছাড়া অন্য কিছু ভাবি না। কলেজের বাইরে সব সময়টাই আমার নিজের। বই পড়ব, গান শুনব, চাইলে একটা উপন্যাস লিখব, কিন্তু নোট সাপ্লাই নৈব নৈব চ।
কী যেন একটা বলতে যাচ্ছিলাম, তার আগেই তিস্তা বলল, মা বলছিল মা আপনাকে চেনে।
জিজ্ঞেস করলাম, কী নাম তোমার মা-র?
কোথায় থাক তোমরা? তিস্তা প্রশ্নের উত্তরের বদলে একটা খাম দিল আমার হাতে। তাতে ছোট্ট একটা চিঠি, আমি পড়তে শুরু করলাম–
প্রিয় নীতুভাই,
আশা করি কুশলে আছ। তোমার পড়ানো আর বিদ্যার সুনাম সব সময়ই শুনতে পাই। তিস্তা তো তোমার পড়ানো নিয়ে কী পাগলামোই না করে। বলে স্যার নিশ্চয় আগের জন্মে অক্সফোর্ডের সাহেব অধ্যাপক ছিলেন। আমি শুনি আর খুব গর্ব হয় আমার। তুমি প্রেসিডেন্সিতে পড়ছ সে খবর পেয়েছিলাম, কিন্তু সেই কলেজেই তুমি ডাকসাইটে প্রোফেসর হয়েছ শুনে যে কী ভালো লেগেছিল তা বলে বোঝাতে পারব না।
আমার এই একটাই মেয়ে তিস্তা। বই ছাড়া ওর আর কোনো বন্ধু নেই। ক-বছর আগে তোমার জামাইবাবুর একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে। একটা দিক পড়ে গেছে বেচারির। আর্লি রিটায়ারমেন্টে আছেন ভদ্রলোক। কাজেই সংসারে অভাব না থাকলেও হাজার দেড় হাজার টাকা দিয়ে মেয়েকে প্রাইভেট টিউশন দেওয়ার সেই সচ্ছলতাই নেই। তিস্তার কিন্তু বড়ো আকাঙ্ক্ষা একটা ফাস্ট ক্লাস পায়। সেজন্যে তোমার কাছে পড়ার বড়ো বাসনা ওর। তাই যদি দিদির মেয়েটাকে স্নেহ করে একটু সময় দাও বড়ো আনন্দ পাই।
