হাত আর মন একই সঙ্গে পাথর হয়ে গেল।
৪.
আমার হাতে ল্যাম্ব রোস্টের প্লেট ধরা, ডান হাতে ফর্কটা দিয়ে একটু ছিড়ছি আর খাচ্ছি। ঘর। ভরতি সাহেব-মেম, দু-তিনটে লণ্ডন প্রবাসী বাঙালি দম্পতি। যাঁর বাড়িতে এসে উঠেছি লণ্ডনে সেই নির্মলদা আর ওর চোদ্দো বছরের মেয়ে সোনালি একে একে সবার সঙ্গেই আলাপ করিয়ে দিয়েছে। মাইনে যেমন তেমনই হোক লণ্ডনে দেখি অধ্যাপকদের সম্মান এখনও আছে। নইলে ইংরেজির তরুণ অধ্যাপক বলে যেই সাহেব মেমদের সামনে আমাকে দাঁড় করাচ্ছেন নির্মলদা অমনি একটা সমীহ ফুটে উঠছে সবার চোখে মুখে, ওহ, রিয়েলি। দ্যাটস গ্রেট। তারপরই লাগোয়া প্রশ্ন, হোয়াট ডু ইউ টিচ? তখন যেই বলছি, ইংলিশ লিটারেচার তখন আর এক-প্রস্থ পুলকিত সমাদর, ওঃ, দ্যাটস মার্ভেলাস! আর এতে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাচ্ছে সোনালি। যার চোদ্দোতম জন্মদিন এটা।
যখন আলাপ হচ্ছিল একে একে সবার সঙ্গে তখন হাতে সবার বিয়র কিংবা হুইস্কি ছিল। এখন সবার হাতে সোনালির নিজের হাতে রাঁধা ল্যাম্ব রোস্ট। সে পদের ফরমাশটা কলকাতা থেকে টেলিফোনে ওঁর কাকা আর আমার সহকর্মী রাণার করা। রাণার জোরাজুরিতেই বলা চলে বাউণ্ডস গ্রিনে নির্মলদাদের বাড়িতে এসে উঠেছি। রাণা বলেছিল, যাচ্ছিস তো বাবা ব্রিটিশ কাউন্সিলের কিপটে স্কলারশিপে। টাকাটা বাঁচা, একটু পাবে বসে বিয়র-টিয়র খা। দু চারটে বই-টই কেন, ক্যাবারে-ফ্যাবারে দ্যাখ। দেখতে দেখতে ছ-সপ্তাহ কেটে যাবে। আর আমার ভাইঝিটি একটি রত্ন। আমি খাইনি। তবে শুনেছি দুর্ধর্ষ ল্যাম্ব রোস্ট রাঁধে। ডোন্ট মিস দ্যাট।
সেই ল্যাম্ব রোস্ট চাখতে চাখতে আমার কেবলই মনে পড়ছে উপস্থিত তরুণ দম্পত্তির ওই আগুনের মতো সুন্দর বউটার মুখ। কেবলই মনে হচ্ছে কোথায় দেখেছি যেন। নিশ্চয়ই কোথাও দেখেছি? কিন্তু কিছুতেই মেলাতে পারছি না। শেষে হাল ছেড়ে দিতে বসেছি এই স্তোক দিয়ে, আসলে সুন্দরী বলেই এতরকম চিনি চিনি ভাব করছি। এ মুখ এই প্রথমই দেখলাম।
দেখেছি সবারই খাওয়া হয়ে গেছে, সবাই একে একে নিজের নিজের প্লেট নিয়ে কিচেনের সিঙ্কে গিয়ে ধুয়ে দিচ্ছে। এদেশে কাজের লোকের চল নেই। নিজেরটা নিজে করাই নিয়ম। নেমন্তন্নেও। শেষে আমি উঠলাম প্লেট ধোলাই করতে। বাকিরা সুইট-ডিশ খাওয়া চালু করে দিয়েছে, একজন মহিলা পিয়ানোয় বসে ‘কে সেরা সেরা’ গানের সুর তুলতে শুরু করেছিল। সিঙ্কের এক ধারে দাঁড়িয়ে অন্যমনস্কভাবে আমি প্লেটে পাউডার ঘষছি।
হঠাৎ পিছন থেকে একটা সুরেলা অথচ অভিমানী মহিলা কণ্ঠ ভেসে এল, আমরা চিঠির উত্তর কিন্তু পাইনি।
আমি মুহূর্তের মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখি কিচেনের দরজায় ফ্রেম-আটা মা দুর্গার ছবির মতো দাঁড়িয়ে ওই বউটি, যার পরিচয় নিয়ে এতক্ষণ ভেবে মরছি।
আমি সত্যি সত্যি হকচকিয়ে গেছি। কীসের চিঠি? কার চিঠি? কেন হঠাৎ এই চিঠির কথা উঠছেই বা কেন? ভদ্রমহিলাও আমাকে ঠিক শনাক্ত করেছেন তো?
আমি তোতলাতে তোতলাতে বললাম, আমার কি আপনাকে চিঠি দেওয়ার কথা ছিল?
যুবতী বলল, দেওয়া, না-দেওয়া আপনার মর্জি। কিন্তু আপনি তো চিঠির কথা মনে করতে পারছেন না।
আমি ফের তোতলাচ্ছি, কিন্তু…কিন্তু…
যুবতী বলল, অবশ্য বারো বছর হয়ে গেল তো। ভুলে যাওয়ারই কথা।
আমি ফের অবাক হয়েছি বা-রো ব-ছ-র!
-হ্যাঁ, তা তো হয়েছে। তাতে একটা গান শোনানোর কথা ছিল, …
ওহ, তাই তো। গানের কথা উঠতেই চিলেকোঠার সন্ধ্যের কথা, বুড়ির বয়ে আনা চিঠির কথা, মানবেন্দ্রর ‘আমি এত যে তোমার ভালোবেসেছি’র কথা আর ওই চিঠির প্রেরিকা রানির কথা…বস্তুত স্কুল জীবনের ওই সময়কার সব কথা বন্যার তোড়ের মতো মনে বাঁধ ভেঙে মাথার মধ্যে গোলমাল পাকাতে শুরু করল। আমার হাত-পা দুই-ই অচল হয়ে গেছে, গলা বন্ধ হয়ে আসছে। তার মধ্যেই কোনোমতে উচ্চারণ করলাম, রানি।
রানি হাসল, বাঁকা ছুরির মতো ধার তাতে। আমি, ‘আই শুনুন! বলে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ হাত থেকে প্লেটটা ছিটকে মাটিতে পড়ে চৌচির হয়ে গেল। কী হল! কী হল!’ করে ছুটে এল সোনালি। আমি লজ্জায় সিঁটিয়ে গেছি দেখে আমাকে আশ্বস্ত করল, তুমি কিছু ভেবো না কাকু, একটা দুটো ভাঙাভাঙি ইজ গুড ফর দ্য পার্টি। আমি নিরুপায় হয়ে বললাম, তা বলে কি পৃথিবীর সব ভাঙাভাঙির দায়িত্ব আমার! প্লেটের টুকরোগুলো মাটি থেকে কুড়োতে কুড়োতে সোনালি বলল, যারা মানুষের মন ভাঙে তারা সবকিছুই ভাঙতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
হে ভগবান! এই চোদ্দো বছরেই মেয়েটা এতশত জানল আর শিখল কোত্থেকে? সোনালি বিন-এ প্লেটের খন্ডগুলো ফেলছিল, আমি খুব নজর দিয়ে দেখলাম বারো বছর আগের এক কিশোরীর মুখ, যারও তখন বয়স ছিল হয়তো চোদ্দো। যার নাম ছিল রানি। রানি সেন। যে আমায় একটা চিঠি লিখেছিল। যার উত্তর দেওয়া হয়নি আজও। স্বভাবদোষে সেই কিশোরী মুখটিকে ভালো করে মনে গেঁথে রাখতে পারিনি। হয়তো সে সুযোগও পাইনি, কলেজে উঠতেই তো পাড়া ছেড়ে অন্যত্র উঠে গেলাম আমরা। তারপর আর ক-বারই বা ওই পাড়ামুখো হয়েছি আমি!
আমি আস্তে আস্তে সোনালিকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের এই রানিদি কি এখনও গান টান করে?
সোনালি অবাক হয়ে গেল যেন গান? জানি না তো উনি গান-টান করেন কি না? জিজ্ঞেস করব?
