মাসিমা জানালা বন্ধ করে দিলেন। তারপর মেয়েকে বললেন, এসো টুম্পা। তারপর হাত ধরে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। বুড়িমা সব দেখে বলল, বউটা রেগে গেল মনে হচ্ছে। কী হল আবার?
আমি বিরক্তির সঙ্গে বললাম জানি না। কে বলেছিল আসতে।
৩.
সময় কী করে কেটে যায় ভগবান ছাড়া কে আর জানতে পারে। সেই যে মাসিমা টুম্পার হাত ধরে বেরিয়ে গেলেন আমার পড়ার ঘর থেকে ঠিক তখনই মনে হয় আমার ওই নিজস্ব সিনেমা হলের সব আলো জ্বলে উঠল। খেল খতম।
টুম্পা আর পড়তে আসেনি তারপর। শুধু শুনেছি এর-ওর মুখে ও বলেছে আমি নাকি খুব ভালো পড়াতে পারি। তাহলে আর পড়তে এল না কেন কোনোদিন? এর কোনো উত্তর পাইনি। লজ্জার মাথা খেয়ে কখনো জিজ্ঞেস করতেও যাইনি। কেবল যেদিন বোর্ডিং-এ থাকতে যাব সেদিন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে ছিলাম। ওদের জানালার দিকে। দেখা গেলে হাত নাড়ব বলে। সারাদিনে একটিবারের জন্যও জানালাটাও খুলল না কেউ।
মাসিমার সেই হেঁটে যাওয়ার পর থেকে নানা জানালায়, নানা বারান্দায় কে কখন দেখা দিচ্ছে তার হদিশ রাখিনি। আর আজ তিন বছর পর হায়ার সেকেণ্ডারির ফাইনালের পর করব বলে ফের উঠে এসেছি আমার চিলেকোঠায়।
ঠিক আজ উঠিনি, ক-দিন ধরেই উঠেছি। শীতের দুপুরের রোদ কীভাবে আকাশ বেয়ে এধার থেকে ওধার হয় সব খেয়াল করি বই পড়তে পড়তে। বইয়ের পাতার ওপরই কীভাবে একটু একটু করে আলো বদলায় তা আমি ধরতে শিখে গেছি।
টুম্পারা বছর খানেক হল পাড়া ছেড়ে আলিপুরে উঠে গেছে। আর বছর দুই হল নতুন বাড়ি করে আমাদের বাড়ির উলটোদিকে কয়েকটা বাড়ির পর এসে উঠেছেন ডক্টর চন্দ্রকান্ত সেন। দিদি বলছিল, ওর মেয়ে রানি নাকি এই বয়েসেই ফাটাফাটি সুন্দরী। আমি সব শুনে চুপ করে থেকেছি। স্কুল ছাড়ার পরীক্ষার তিনমাস আগে মেয়েদের সৌন্দর্য নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। মনে মনে বলেছি, এক সুন্দরীর পাল্লায় পড়ে ঢের শিক্ষা হয়েছে আমার।
আর আজ সেই রানির এক চিঠি হাতে করে নিয়ে এসেছে বুড়িমা। বলেছে, ওই সেন ডাক্তারের মেয়ে রানি লিকেচে গো। তুমি উত্তর দিলে আমি পৌঁছে দেব। চিঠিটা হাতে করে নিয়ে ছাদের ঘরে এসে পড়তে গিয়ে আমার দম আটকে যাওয়ার শামিল। সে লিখছে :
কী বলে সম্বোধন করব জানি না। ক-দিন হল তোমাদের ছাদে তোমাকে ঘোরাঘুরি করতে দেখি। কিন্তু তোমার কথা শুনে আসছি অনেক দিন ধরে এ পাড়ায় যে আমার বেস্ট ফ্রেণ্ড ছিল সেই টুম্পার কাছে। ও চলে যেতে তাই বড়ো একলা লাগে। ওরও লাগত, তুমি বোর্ভিঙে চলে যেতে। বলেছিল তুমি কী সুন্দর পড়িয়েছিলে দুটো ইংরেজি কবিতা।
টুম্পার কথায় বুঝতে পারতাম ও তোমায় ভালোবাসত। ও বলত তোমার প্রিয় গান মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি। ঠিক বললাম তো? এই গানটা আমারও খুব প্রিয়। তুমি যদি একদিন ওয়েন আর ওয়ালটার ডি লা মেয়ারের কবিতা দুটো আমায় পড়ে শোনাও তাহলে ওই গান আমি তোমায় গেয়ে শোনাব। তবে তোমার ওই চিলেকোঠায় নয়, আমাদের এই বসার ঘরে। আমার অন্ধকার আর ভূতে বড়ো ভয়।
যদি আসো তাহলে বুড়িমার হাতে একটা চিঠি দিয়ো।
রানি
জানি না, কী উত্তর লিখব এর! এর উত্তর দেওয়া তো প্রেমে পড়ে যাওয়ার শামিল। পরীক্ষার মুখে কি আমি এই করব!
চিঠিটা একটা পুরোনো ব্যথা আর একটা নতুন রাগও খুঁচিয়ে তুলেছে। পুরোনো ব্যথা হল টুম্পার স্মৃতি আর নতুন রাগ হল আমার চিলেকোঠার প্রতি রানির খোঁচা। কেন, কী দোষ করেছে আমার চিলেকোঠা? এখান থেকে লোরেনের নাচ দেখতে পাওয়া যায়, এই তো? নিশ্চয়ই টুম্পার কাছে শোনা কথা এসব। তাতে বয়ে গেল আমায়। আমি অভিমানের বশে চিঠিটা দুমড়ে মুচড়ে বাইরে ফেলে জানালা খুলে লোরেনের নাচের অপেক্ষায় রইলাম।
কতক্ষণ বসেছিলাম এভাবে খেয়াল নেই, শেষে লোরেনের নাচ শুরু হল ক্লিফ রিচার্ডের গানের সঙ্গে। আমি মেয়েটিকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। কী অপরূপ সুন্দরী আর লাস্যময়ী হয়ে উঠেছে মেয়েটি এই তিন বছরে। দিদি বলছিল ও পড়াশুনো ছেড়ে দিয়ে ফুলটাইম ক্যাবারে ডান্সার হয়েছে। নাম নিয়েছে লাশিয়াস লোলা। কলকাতা তো বটেই, সারাভারতেই নাকি ওর জুড়ি নেই। আর কিছুদিন পরই ও দিল্লির ইন্টারকন্টিনেন্টালে পাড়ি দেবে।
আমি স্তম্ভিত হয়ে লোরেনকে দেখছি। ওর নাচের সঙ্গে একের পর এক বেজে যাচ্ছে প্যাট বুন, ফ্র্যাঙ্ক সিনাট্রা, জিম রিভস, কিন্তু আমার মগজে ক্রমাগত বেজেই চলেছে ওই একটাই গান—’আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি।‘ বুঝতে পারছি না সাহেবদের ওই গানে না লোরেনের সৌন্দর্যে না মানবেন্দ্রর গানে মনটা ভিজে জল হয়ে যাচ্ছে। জল আসছে চোখেও, যেন প্রেমে পড়ছি।
শেষে দড়াম করে জানলা বন্ধ করে লজিকের বই খুলে বসলাম। এভাবে চলতে থাকলে আমার পরীক্ষা ডকে উঠবে। নিকুচি করেছে ওই রানির। আমি ওকে চিনি না, আর চিনে কাজও নেই। সেই তো টুম্পার মতো এক ঝড় বইয়ে মিলিয়ে যাবে মহাকালে। তার চেয়ে চাচা আপন প্রাণ বাঁচা।
আমি লজিকের সিলোজিসমে ডুব দিলাম। কিন্তু চোখের পাশটা সমানে খচ খচ করে যাচ্ছে। রানি কি খুব কষ্ট পাবে?
হাত নিশপিশ করছে কলম তুলে একটা চিঠি লেখার জন্য। কিন্তু মনের কোণে সারাক্ষণ ভয়। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করছি, নীতু, তুমি কি প্রেম করার জন্যই অ্যাদ্দিন পর নিজের ডেরায় ফিরে এলে?
