ইংল্যাণ্ডে একটা জিনিস আমি শিখেছি। ইংলিশরা ট্রেন জার্নি তারিয়ে উপভোগ করে। কাগজ পড়ে কি বই উলটিয়ে, পাইপ খেয়ে কিংবা স্রেফ জানালার বাইরে তাকিয়ে থেকে। বাক্যালাপ করে তাদের আনন্দ নষ্ট করা ঠিক না। আর আমিও যেহেতু লাজুক, প্রকৃতি বিলাসী লোক তাই আমারও বেশ সুবিধে হয় এই ‘একলা চলো রে’ পদ্ধতিতে। ট্রেনের মধ্যে আমি নিজেই নিজেকে মশগুল রাখতে ভালোবাসি এবং সেভাবেই আমি কোকা কোলার কৌটোয় ছোট্ট ছোট্ট চুমুক আর সিগারেটে ছোট্ট ছোট্ট টান দিতে দিতে এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ সামনে বসে থাকা প্রৌঢ় ইংরেজ ভদ্রলোক বললেন, আপনি প্রকৃতি দেখতে খুব ভালোবাসেন? বহুক্ষণ নীরবতার পর একটা মানুষের স্বরে বুঝি খুশিই হয়েছিলাম, বিশেষ করে প্রশ্নটা যখন প্রকৃতির বিষয়েই। বলে উঠলাম খুব; ভদ্রলোক তাঁর পাইপটা ঠোঁট থেকে নামিয়ে বললেন, সে আপনার হাবভাব দেখেই বুঝেছি।
—কীরকম?
–প্রকৃতি দেখার আনন্দের ছাপ আপনার গোটা মুখে।
–তাই নাকি? সেটা ধরা যায় নাকি?
—বিলক্ষণ। ভদ্রলোক এবার তাঁর সবল দৃঢ় হাতটা বাড়িয়ে বললেন, আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে খুশি হলাম। আমার নাম এডওয়ার্ড ড্রব। আমি তখন ওঁর কথাটাই রিপিট করে আমার নামটাও জানিয়ে দিলাম। ভদ্রলোক তখন চমকে উঠে বললেন, আপনি ভারতীয় ব্রাক্ষণ?
—হ্যাঁ।
—তা হলে আমি কার কাছে প্রকৃতি বিলাসের ফন্দি বিতরণ করছি? গোটা ভারতই তো আশ্চর্য প্রকৃতির দেশ।
—আপনি ভারতে গেছেন?
–না, বইতেই সব পড়েছি। যা হোক আমাকে বলুন আপনি কী দেখতে ভালোবাসেন?
—সমুদ্র।
–ওঃ ফ্যান্টাসটিক! একেবারে আমারই ধারার লোক আপনি। তা কোথায় যাচ্ছেন?
—পোর্টসমাথ।
-বাঃ বাঃ চমৎকার। পোর্টসমাথ ইজ লাভলি। ইউ’ল বি ভেরি প্লিজড। রাদার ইউ’ড বি হ্যাপি। তবে তার আগে সাউথ সি দেখতেও ভুলবেন না।
ভীষণ পুলকিত হয়ে জিজ্ঞেস করে বসলাম, সাউথ সি এই পথেই? মানে চার্লস ল্যামবের প্রবন্ধে যে সাউথ সি-র কথা পড়েছি?
ড্রব এবার খুব তৃপ্তির সঙ্গে বললেন, এগজ্যাক্টলি! জানি না এরপর কতক্ষণ চার্লস ল্যামব আর তাঁর এসেজ অফ ইলায়া’-তে বর্ণিত সাউথ সি-র মধ্যে মনে মনে ডুবেছিলাম আমি। জানি না এই সময় আমি ড্রবের সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে গিয়েছিলাম কি না। জানি না কী প্রশ্নের কী জবাব দিয়েছিলাম। জানি না নিজের থেকেও কোনো অচিন্তিত প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলাম কি না।
হঠাৎ ঘোর ভাঙল ড্রবেরই কথায়। আমায় সম্ভবত সামান্য টোকা দিয়ে সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, আপনি খুব আত্মসুখী মানুষ, না? বললাম, খুব!
—তা হলে সামনের হাভানট স্টেশনে নেমে পড়ুন।
—কিন্তু আমার জন্য পোর্টসমাথে লোক অপেক্ষা করবে।
–করুক। যা বলছি করলে আপনি এক অনিন্দ্যসুন্দর সুখের মুখ দেখবেন।
–কী করতে হবে আমাকে? আপনি হাভানটে নেবে স্টেশন থেকে বেরিয়ে ডান হাতের রাস্তা ধরে পাঁচশো গজ হাঁটুন। তারপর একটা ওভারব্রিজ ক্রস করে বাঁ-দিকে নেমে আরও পঞ্চাশ গজ। দেখবেন ওখানে একটা কটেজ আছে। এবার ওই কটেজের পিছনে যে ঝিল আছে সেটার পাড় ধরে হাঁটতে থাকুন। দেখবেন রাস্তাটা ক্রমশ চড়াইয়ের দিকে যাচ্ছে। যেতে যেতে একটা টিলায় পৌঁছে যাবেন আপনি। ওই টিলার চুড়োয় চড়ে আপনি সামনের দৃশ্য দেখুন। তা হলে খুব সুখ হবে আপনার।
বুঝলাম না ড্রব আমাকে খুশি করার জন্য এরকম গজ মেপে মেপে জায়গার ডিরেকশন দিচ্ছেন কেন। আমি কী দৃশ্য দেখে সুখী হব তা কি ওঁর পক্ষে জানা সম্ভব? আর আমি সুখী হলে ওঁরই বা কী লাভ? আমি এ সবই গভীরভাবে চিন্তা করছিলাম যখন ড্রব বললেন, ওয়েল! আমি যতটুকু সাহায্য করার করলাম, এবার আপনার ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপার।
কেন জানি না প্রৌঢ়কে দুঃখ দিতে ইচ্ছে হল না আমার। মনে হল আমি হাভানটে নেমে ওই দৃশ্য না দেখলে উনি দুঃখ পাবেন। ট্রেন স্টেশনে ইন করছিল। আমি আমার জিনিসপত্র হাতে নিয়ে, সিগারেটটা ছাইদানিতে ফেলে ড্রবের দিকে হাত বাড়িয়ে বললাম, থ্যাংকস ভেরি মাচ। হোপ টু সি ইউ এগেইন।
ড্রব এবার একটু পিতৃসুলভ গাম্ভীর্যে বললেন, ইউ’ল বি হ্যাপি বয়। অল দ্য লাক!
আমি হাভানটে নেমে ড্রব বর্ণিত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে একেবারে অবাক হয়ে গেলাম। লোকটা কি ফিতে দিয়ে জরিপ করে গেছে নাকি এই রাস্তা। যেটা পাঁচশো গজ সেটা পাঁচশো গজ, যেটা পঞ্চাশ সেটা পঞ্চাশ। যেখানে যা যা বলেছেন সেখানে ঠিক ঠিক সেই জিনিস! এবং অবশেষে আমি চড়ে বসলাম টিলার সেই সর্বোচ্চ চুড়োয়। ড্রব বলেছিলেন এখানে পোঁছোতে আমার লাগবে ঠিক বারো মিনিট এবং লাগলও কাঁটায় কাঁটায় বারো মিনিট, সেকেণ্ড পর্যন্ত হিসেব করে।
আমি ড্রবের কথা ভাবতে ভাবতে এতদূর এলাম। তাই সামনে যে কী প্রকৃতি আমার অপেক্ষায় আছে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। যখন খেয়াল হল তখন মুহূর্তের মধ্যে আমার মন অবর্ণনীয় আনন্দে টইটম্বুর হয়ে উঠল। একী! এই দৃশ্যই তো আমি ছোটোবেলায় এক বইয়ের পাতায় দেখেছি। হুবহু সেই জায়গা। প্রতিটি ডিটেলে। যেন পটে আঁকা টিলার পরেই একটা সবুজ ঘাসের মাঠ। তার মধ্যিখান দিয়ে সরু একফালি নদী। নদীর ওপর ছোট্ট কাঠের সাঁকো। সাঁকোতে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জল নাকি মাছ দেখছে। নদীর ওপারে অপর একটা টিলার পিছনে গাছ, কিছু উইলো, কিছু ওক, কিছু এভারগ্রিন। আর ওই বন পেরোলেই, আমি না গিয়েই জানতে পারছি, মহান, সুবিস্তৃত সমুদ্র।
