আনন্দে আমার মন ধুয়ে যাচ্ছে। এ দৃশ্য আমি ছোটোবেলায় অসংখ্যবার দেখেছি বইতে আর স্বপ্নে। বাবা বলতেন, এই হচ্ছে ইংল্যাণ্ডের আসল রূপ। আসল স্বর্গ।
আমি জানি না এ দৃশ্য দেখার পর আমার কী করা উচিত। আমি কি হেঁটে নেমে যাব ওই নদীতে? পারলে ডুব দেব জলে? রৌদ্রোজ্জ্বল টিলাতে কোট মেলে দিয়ে শুয়ে পড়ব আর ধন্যবাদ দেব ঈশ্বরকে, বাবাকে, এডওয়ার্ড ড্রবকে?
সহসা পিঠের ওপর আলতো একটা হাতের স্পর্শ পেলাম। চমকে উঠে ঘুরে দেখলাম এডওয়ার্ড ড্রব! এ কী! মানুষটি তো ট্রেনেই বসেছিলেন। নামলেন কখন?
–ট্রেন ছেড়ে দেবার পর?
—হ্যাঁ চেন টেনে।
-কেন?
—ভয় হল আপনার যদি ভীষণই ভালো লেগে যায় এই দৃশ্য।
–তাতে ক্ষতি কী!
—যদি অতিরিক্ত আনন্দের ঝোঁকে আপনার এই ছোট্ট নদীতে ডুব দিয়ে মরতে ইচ্ছে করে।
গা-টা হঠাৎ শিরশির করে উঠল ভয়ে। আমার তো সত্যি ডুবে মরার ইচ্ছে জেগেছিল। উনি না এলে কী জানি হয়তো তাই করতাম। কিন্তু ড্রব সেকথা জানলেন কী করে জিজ্ঞেস না করে পারলাম না, আপনার কেন মনে হল আমি মরতে চাইতে পারি?
কারণ এর আগে একটি ফরাসি মেয়েকে আমি এই দৃশ্য দেখার জন্য বলেছিলাম। পরে কাগজে পড়লাম মেয়েটি ওই ছোট্ট নদীতে ডুবে মরেছিল। আমার মাথার মধ্যে সাঁ করে খেলে গেল সাঁকোয় দাঁড়ানো মেয়েটির মুখ। আমি সঙ্গে সঙ্গে পিছন ঘুরে সাঁকোর দিকে তাকালাম। কিন্তু সেখানে কোনো মেয়ে নেই। আশেপাশে কোথাও সে নেই। যদিও এইটুকু সময়ের মধ্যে তার পক্ষে কোথাও গিয়ে লুকিয়ে পড়া অসম্ভব। আমি ভয় পেয়েছি। আমি ডুবকে বললাম, কিন্তু কেন আপনি আমাকে বাঁচাতে চাইলেন?
কারণ আপনার মুখটা খুব সরল, নিষ্পাপ, সুন্দর। আমার মনে হল, প্রকৃতি হয়তো আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে। খুব ভয় হল, চলে এলাম।
—একটা কথা আমায় বলবেন?
–বলুন।
—আপনি কি জার্মান? আপনি কি নাৎসি আর্মিতে ছিলেন? ভদ্রলোক যৎপরোনাস্তি আশ্চর্য হয়ে বললেন, আপনি সেকথা কী করে জানলেন?
বললাম, আপনার দেওয়া রাস্তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা থেকে। ওরকম মাপা বর্ণনা নাৎসিবাহিনীর লোকেরাই নাকি দিতে পারত শুনেছি। ভদ্রলোক হাসলেন, হ্যাঁ। গা বাঁচাতে যুদ্ধের পর ইংল্যাণ্ডে নাগরিক হয়ে থেকে গিয়েছিলাম। ড্রব আমার ইংরেজ নাম। আমি জন্মাবার পর নাম হয়েছিল রাইনার স্টরাট। যাকগে, আপনি আর দেরি করবেন না, চেষ্টা করলে পরের ট্রেনটাই আপনি ধরে ফেলতে পারেন। যদি জোরে হাঁটেন! আর আট মিনিট পরে প্ল্যাটফর্মে গাড়ি লাগবে।
এরপর আমরা চুপ করে খানিকক্ষণ হাঁটলাম। ওভারব্রিজের নীচে এসে ড্রব, থুড়ি, স্টরাট বললেন, আপনি এখোন। আমি এই ট্রেনটা নেব না। আমি ওই টিলার উপরে গিয়ে একটু বসতে চাই। ইট মেকস মি হ্যাপি।
স্টরাটকে অসংখ্য অকৃত্রিম ধন্যবাদ জানিয়ে এবং বার আটেক করমর্দন করে আমি স্টেশনের দিকে প্রায় দৌড়োত লাগলাম।
বড্ড দেরি করে ফেলেছি। স্টেশনে পৌঁছেছি যখন তখনও ট্রেনের হদিশ নেই। যদিও ছোট্ট হাভানট স্টেশন রীতিমতো গিজ গিজ করছে মানুষে, পুলিশে, অ্যাম্বুলেন্সের লোকে। ব্যাপার কী? এক ভদ্রলোক নাকি ট্রেন ছাড়ার পর হুড়োহুড়ি করে দরজা খুলে নামতে গিয়েছিলেন। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপ, কিন্তু প্ল্যাটফর্মে নয়, চাকার পাশে রেলের লাইনে।
আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে লাগল। হাত, পা যেন এখুনি খসে পড়ে যাবে। মাথাটা সবে ঘুরতে শুরু করেছে। ভিড় ঠেলে আমি ছুটতে লাগলাম লাশটার দিকে। ঠিক তখনই তার মুখের ওপর টেনে দেওয়া হল সাদা লং ক্লথ। কিন্তু তার আগে এক ঝিলিক আমি দেখে নিয়েছি রাইনার স্টরাটের অদ্ভুত প্রশস্তিময় মুখ। না, উনি তো ট্রেনে কাটা পড়েননি, উনি হাভানটের একটি অলৌকিক পরিবেশে বসে অপার আনন্দে চেয়ে আছেন একটা ছোট্ট নদী আর সবুজ বনের দিকে।
সেই আশ্চর্য বাড়িটা
গৌহাটির পল্টন বাজারে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা তিনজন। শিলং যাবার জন্য ট্যাক্সি ধরব। ট্যাক্সি ড্রাইভার বলল, বাবু, আরেকটু সবুর করুন। প্যাসেঞ্জার পাবই। তাহলে ট্রিপের টাকা আপনারা চারজনায় ভাগ করে নেবেন।
আমাদের কিন্তু ভীষণ অসহ্য ঠেকছিল এই বেকার দাঁড়িয়ে থাকাটা। একবার গাড়িতে চেপে বসলেই শিলং। কিন্তু সেটাই যেন আর হবার নয়। সেই ভোর থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি, তার মানে শিলঙেও খুব একটা রোদ পাওয়া যাবে না। এ দিকে আরেকটা প্যাসেঞ্জারের জন্য যেভাবে তীর্থের কাকের মতো বসে আছি তাতে ধারণা হচ্ছে, আমরা বুঝি-বা খোদ বদরীনাথে যাওয়ার লোক খুঁজছি। চন্দন হঠাৎ বলল, শিলঙে কি বেড়ানো বন্ধ করে দিয়েছে লোক? সামনের সিটেই উদাস দার্শনিকের মতো বসে থাকা ড্রাইভার কথাটা শুনে একটু দুঃখই পেল। একটা লম্বা বিড়ি ধরাতে ধরাতে সে বলল, স্যার, এবার তো মনসুন লেগে গেল। এখন আর অত টুরিস্ট পাবেন কী করে! আসতেন মে-জুন মাসে, দেখতেন, ভিড় কাকে বলে। সারাদিন কত যে ট্রিপ যায়।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি বেলা চারটে। পৌঁছোতে পৌঁছোতে সন্ধ্যে হয়ে যাবে। অতএব কাজের কথা আগেভাগে শেষ করাই ভালো। আমি ড্রাইভারকে বললাম, শিলং পৌঁছে সস্তার হোটেলে ঢুকিয়ে দিয়ে কাট মারবে। বাপ্পা এবার সমস্যাটা আরও সহজ করে দিল, ড্রাইভারমশাই, আমাদের পকেট কিন্তু হালকা। এমন কোথাও ঢোকাবেন না যেখানে একদিন থাকলেই প্যান্ট বিক্রি হয়ে যাবে।
