কিন্তু টোকা না-পড়েই দরজা খুলে গেল। অমনি বই ছেড়ে অরু ছুট লাগাল ছাদের দিকে। বাবা টুক করে ওর ছোট্ট দেহটা তুলে দিল আলসের উপর আর হাত ধরে আস্তে আস্তে হাঁটা শুরু হল দু-জনার। কিন্তু বাবার সেই দীর্ঘ, পুরুষ্টু পাঞ্জা এত সরু, নরম হয়ে গেল কেন হঠাৎ। বাবার কি শরীর খারাপ? অরু কাঁপা কণ্ঠে ডাকল, বাবা! আর তাকাল বাবার দিকে…
কিন্তু বাবা কই? এ তো ডিনা মিস! পিঙ্ক ফ্রেঞ্চ জর্জেট শাড়ি আর কালো ব্লাউজ, পায়ে কালো হিল-তোলা জুতো। হাতে সরু সোনার বালা, সোনার ঘড়ি। আর ধবধবে ফরসা মুখে আর লিপস্টিক-ঘষা ঠোঁটে প্রাণজুড়ানো হাসি। বলল, অরুণ, আমি পেরেছি। আমি পেরেছি অরুণ। কতদিন এই চাঁদের আলো আমি দেখিনি। কতকাল ছাদে উঠিনি রাতে। নাও ইউ মাস্ট টিচ মি টু রান। অরু, আই মাস্ট রান। ফ্লাই।
ডিনা মিসের হাত ধরে আলসে দিয়ে অরু ছুটছে আর নীচে দেখছে, বড়য়া বেকারি, পারসি বাগান, অ্যাংলোদের ঝগড়াঝাঁটি, টিউশন মাস্টারের শিঙাড়া খাওয়া, অ্যালসেশিয়ান কুকুর নিয়ে জগুদার পায়চারি, বেনেবউয়ের লুচি রান্না, খোট্টাদের রান্না, রাখাল উকিলের গাড়ি স্টার্ট, রঙ্গুলাল পোপার খিস্তিখেউড়, ছাদে লুকিয়ে মেলামেশা তাপস আর করুণার, পিছন দিকে গ্রাম চালিয়ে উদ্দাম নাচ লোরেন সুইনটনের।
কিন্তু কিছুই টানছে না আর অরুকে। কত উঁচুতে ছুটছে ও, আকাশের কাছাকাছি, যেখান থেকে মন চাইলেই রাস্তায় গিয়ে নামা যায়। সিঁড়ি লাগে না, সিঁড়িভাঙা অঙ্কও না। ডিনা মিস কিন্তু সিঁড়িভাঙা অঙ্কের সূত্র বলছে।
বড়মাস…BODMAS…প্রথমে ব্রাকেটগুলো খুলে দাও, একের পর এক। তারপর ভাগ, গুণ, যোগ, বিয়োগ। ফাস্ট ব্র্যাকেট, সেকেণ্ড ব্র্যাকেট, থার্ড ব্র্যাকেট। গুণ ভাগ যোগ বিয়োগের তো পরম্পরা আছে…
বিরক্ত হয়ে অরু বলল, মিস, তুমি কি অঙ্ক কষবে? তোমার কি মরেও ক্ষান্তি নেই। তা হলে এলে কেন? আমি কি তোমায় প্ল্যানচেট করেছি? সহসা শাড়ির ভাঁজ থেকে স্কেল বার করেছে ডিনা মিস, অরুণ, ফাস্ট লার্ন টু স্পিক উইথ ইয়োর এল্ডার্স। আই অ্যাম নট গোইং টু স্পেয়ার ইউ। ইফ ইউ ডোন্ট লার্ন ম্যানার্স অ্যাণ্ড অ্যারিথমেটিক, বলেই আলসে থেকে নামিয়ে হাতে দু-ঘা।
অরুর এখন সত্যিই দু-চোখ বেয়ে জল নেমেছে। ছাদের শান্তিটাও চিরকালের মতো গোল্লায় গেল। ব্যথায় আর বেদনায় অরু ডুকরে উঠল। বাবা। আর তখনই চোখে পড়ল আকাশের পূর্ব কোণে সকাল বেলার সেই অগ্নিকান্ডের শেষ ধিকি ধিকি শিখা। অরু চট করে মিসের হাত টেনে নিয়ে বলল, দ্যাখো, মিস, আমি মিথ্যে বলিনি। কাঠের গুদোমে সত্যিই আগুন লেগেছে। তখন তুমি আমাকে বিশ্বাস করলে না।
ডিনা মিস অরুর মার খাওয়া তালুতে হাত বুলোতে বুলোতে বলল, আমি তোমায় বিশ্বাস করি অরুণ। বিশ্বাস করি বলেই তো আজ এখানে আসতে পারলাম। বিশ্বাস করি বলেই তো মাংসকাটা ছুরিটা বুকে নিয়ে শুয়েছিলাম দুপুরে। তারপর কখন…
ডিনা মিস শাড়ি সরিয়ে নিয়ে ওর ব্লাউজটা দেখাল। বুকের রক্তে ভেসে যাচ্ছে সেটা।
চোখ বড়ো করে অন্ধকারে ওই দৃশ্য দেখতে দেখতে অরু বলল—রক্ত! শাড়ি দিয়ে বুকটা ঢেকে দিতে দিতে ডিনা মিস বলল, না অরুণ, ভালোবাসা!
সুখ
আমি লণ্ডনের ওয়াটারলু স্টেশন থেকে ঠিক দুপুর বারোটার ট্রেন ধরলাম পোর্টসমাথের দিকে। ইংল্যাণ্ডে তখন গ্রীষ্ম, কাজেই সন্ধ্যা হতে হতে সাড়ে নটা, দশটা। রাত এগারোটাতেও গোধূলির মতন একটা আভা ছড়িয়ে থাকে আকাশে। গ্রীষ্মকালে দুপুর বারোটা, তাই রীতিমতো সকাল-সকাল ব্যাপার। তার ওপর দিনটা ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল, আকাশ নীল, বাতাসে সামান্য একটা ঠাণ্ডা কামড়। ইংল্যাণ্ডের পক্ষে খুব অসাধারণ কম্বিনেশন। আমি ইচ্ছে করেই স্লো-ট্রেন বেছে নিলাম যাতে দু-ঘণ্টার জায়গায় ধিকিয়ে আড়াই ঘন্টায় পৌঁছোতে হয় পোর্টসমাথ।
পোর্টসমাথ ইংল্যান্ডের এক আশ্চর্য সুন্দর বন্দর শহর। ওখানে থাকেন আমার মাসি যিনি বিয়ে করেছেন পোর্টসমাথ বন্দরের কমিশনার সাহেব জেফরি পিনচেসকে। জেফরিকে আমি দেখিনি, তাই জেফরি আমাকে দেখার জন্য ব্যাকুল। টেলিফোনে জানিয়েছেন তিনি গাড়ি নিয়ে বারোটার ট্রেনটির জন্য অপেক্ষা করবেন স্টেশনে। কিন্তু আমি ব্যাকুল মূলত মাসির দুই ছেলে এবং মেয়েকে দেখার জন্য, যারা কথা দিয়েছে আমাকে পোর্টসমাথ হারবারে রাখা লর্ড নেলসনের জাহাজ ‘ভিকটরি’ দেখাতে নিয়ে যাবে এবং স্টিমারে করে বেড়াতে নিয়ে যাবে আইল অফ হোয়াইটে।
আমি স্বভাবকুঁড়ে লোক। সময় রক্ষা আমার দ্বারা হয় না। কোনোমতে একটা স্যাণ্ডউইচ চিবোতে চিবোতে ছোট্ট একটা অ্যাটাচি আর কোকা কোলার কৌটো নিয়ে যখন আমি কামরায় উঠলাম ঠিক তক্ষুনি ছেড়ে দিল ট্রেন। ভাবলাম, যাক! তা হলে মেসো-মাসিকে সমস্যায় ফেলা হল না।
কামরায় তোক বেশ কম। আমি জানালায় পাশেই একটা সিট বেছে বসে পড়লাম। সুন্দর দিন আর বাইরের সুন্দর গাছপালার দিকে চোখ পড়তে নিজেকে ভারি সুখী সুখী লাগল। ওই দৃশ্য দেখব বলে আমি আর বাক্সে রাখা আগাথা ক্রিস্টির বই বার করলাম না। আড়াই ঘণ্টা ধরে ইংল্যাণ্ডের প্রকৃতি দেখাই বিরাট আনন্দ আমার কাছে। ইংল্যাণ্ডের গ্রামের দৃশ্য মুহূর্তের জন্য আমাকে কখনো ক্লান্ত করেনি কোনোদিন। দেখতাম আর ভাবতাম, এ তো গ্রাম নয়, শিল্পী কনস্টেবলের আঁকা কোনো ছবি।
