কাবাব খেতে খেতে অরু ভাবল জিন! সে আবার কী? জিন কী গো মকবুল দাদা? মকবুল বলল, আদমির মওত হলে জিন পাকিয়ে যায়। মওত কী গো মকবুলদাদা? আদমি যখন লিসাস লেনা বন্দ করে দেয়। নিঃশ্বাস বন্ধ! তার মানে মরে যাওয়া। তা মরে তো বহুত লোক, তাতে কি সব জিন হয়? মকবুল বলল, ডিনা মেমসাবের ভাই তো একসঙ্গে পয়দা হয়েছিল, তাই জিন হয়ে বহিনকে ডাকছে আয়! আয়!
দুর! মকবুলটা কিসসু জানে না। ডাকছে তো ডিনা মিস নিজে। জিমি আঙ্কেল তো আসার নামই করে না। বাবাকে তো ডাকার দরকার হয় না অরুর। ছাদের ঘরে একলা থাকলেই টোকা পড়ে দরজায়, আপনা থেকে খুলেও যায় পাল্লা। বাবা এলে বাবার গন্ধ পায় অরু। বিলিতি দাড়ি কামানোর সাবানের গন্ধ। নাক ভরে নিঃশ্বাস নেয় তখন অরু। মকবুল মাংস আর কীসের গন্ধ জানে! মকবুল ধারালো ছুরি দিয়ে ছপছপ ছাত পেটাইয়ের ঢঙে মাংসের কিমা বানাচ্ছিল। আর অরুর মনে পড়ছিল জগুদাকে। মিন্টো রো-র মস্তান। সেন্ট্রাল ক্যালকাটার সেরা বীর। বাবা নেপোলিয়নের কথা বললে অরু জিজ্ঞেস করে, আমাদের জগুদার মতো বীর? বাবা তখন খুব হাসে। বলে, জগুটা খুব ভালো ছুরি খেলে, না? অরু বলে, ভী-ষ-ণ!
জগুদার ছুরি খেলা মানে ছুরি নিয়ে ম্যাজিক করা। একদিন দেখিয়েছিল কীরকম খেলা। ধারালো ছুরি পকেটে নিয়ে ঘুরতে দেখে জিজ্ঞেস করল, তাতে কী হয়? জগুদা সঙ্গে সঙ্গে ছুরিটা বার করে ছুড়ে মারল সামনের দেয়ালের গর্তে। বলল, দেখলে তো? খুলতেই হল না!
বাবার হাত ধরে অন্ধকারে আলসে ধরে ছুটতে ছুটতে অরু বলেছিল, বাবা, আমি জগুদার কাছে ছুরি খেলা শিখব? বাবার হাত কেঁপে গিয়েছিল, না, না, অরু! কক্ষনো না। তুমি বড়ো হয়ে তোমার নিজের কথা লিখবে। আমার কথা, কাকার কথা, মার কথা লিখবে। এই পাড়ার সবার কথা লিখবে। তখন খুব ভালো করে জগুর কথা লিখো। অরু জিজ্ঞেস করল, কেন, এসব কথা কেন লিখব? কার জন্যে? বাবা তখন কোলে করে ওকে নামাতে নামাতে বলল, আমার জন্যে। অরু বলল, কেন, তোমার তো কত বই! বাবা ঘাড় নাড়ল, আমি আর জ্ঞান দিয়ে কী করব, অরু? অরু জিজ্ঞেস করল, তুমি তা-লে কী চাও? বাবা ওর গালে দুটো হাত রেখে বলল, ভালোবাসা, অরু, ভালোবাসা। অরু ফের ওর অঙ্কের টেবিলে গিয়ে বসল। নীচে ছেলেরা জোর দমে খেলছে। আরও নতুন নতুন মেঘ এসে গেছে আকাশে, একটা মিষ্টি হাওয়াও বইছে। লেখাপড়ার পক্ষে খুব খারাপ সময় এটা। সব অঙ্ক ভুল হওয়ার সময়। পড়া তো পড়া! না হলে প্ল্যানচেট শেষ করে এসে স্কেল নিয়ে দক্ষযজ্ঞ বাঁধাবে ডিনা মিস। কী ভাগ্যি, এখনও ডিনা মিস প্ল্যানচেট করছে।
কিন্তু ও কী! কীসের শব্দ ওসব? হ্যাঁ, তাই তো! ডিনা মিস কাঁদছে। ব্যাকুলভাবে কাঁদছে। ভাই জিমিকে ডেকে ডেকে কাঁদছে। কী বলছে ডিনা মিস? ওর এত কী কষ্ট? বেশ আছে তো দুই বোন সারাজীবন একা একা। ওদের তো ভালোই দেখতে, কেন তা-লে ওদের বিয়ে হয়নি আজও? চুল পেকে গেল, বুড়ি হয়ে গেল, শুধু বাচ্চা পড়িয়ে পড়িয়ে…অরু ফের উঠে গিয়ে পর্দা সরিয়ে অন্ধকার হলঘরে দাঁড়াল। ডিনা মিস কাঁদছে, জিমি, আমরা তো যমজ। একবছর হয়ে গেল, কেন আমায় তুলে নিচ্ছ না? জীবনে কী আর আছে ভাই, তোমার স্ত্রী পুত্র পরিবার সবাই আলাদা হয়ে চলে গেছে। ওরা ভালোই আছে। মরছি শুধু আমি আর কুমি।
এবার কুমি আন্টি কাঁদতে শুরু করল, ভাই, বাতের ব্যথায় হাঁটতে-চলতেও পারি না। টাওয়ার অব সাইলেন্সে যখন শকুনরা তোমার দেহ ঠোকরাচ্ছিল, ভাবলাম কত অভাগা আমি। ছোটোভাই চলে গেল, আমি পড়ে রইলাম? কেন আমায় কি শকুনেও ছোঁবে না?
রাগে কাঁপছিল অরু। এই কি ভূত নামানো? অন্ধকারে চোখ-বুজে কান্নাকাটি। এরা তো মেয়েছেলের অধম। বয়সের গাছপাথর নেই, আত্মা কাকে বলে জানে না। কী হয়েছে অরু সিঁড়িভাঙা অঙ্ক জানে না তো? অরু আত্মা চেনে, চলে যাওয়া ফিরিয়ে আনতে পারে। তার জন্যে টেবিল ল্যাম্প লাগে না। অরু তাচ্ছিল্যভরে পটপট পটপট করে ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ডিনা মিসের, হোয়াট আর ইউ ডুইং, অরুণ? দিস ইজ অ্যাট্রোশস!
অরু দৌড়ে পড়ার ঘরে গিয়ে বইখাতা গোছাতে লাগল। বাড়ি যাবে। ঘুরতেই দেখে ডিনা মিস হাতে স্কেল নিয়ে দাঁড়িয়ে। কাঁপতে কাঁপতে বলছে, তুমি জানো, আজ তুমি কী করেছ?
-জানি।
–কী জানো?
—জানি যে, তোমরা কিসসু জানো না!
—কী জানি না?
—কেউ চলে গেলে তাকে কী করে আনতে হয়? দপ করে এক নিমেষে নিভে গেছে ডিনা মিসের রাগ আর মুখ। কী বলছ তুমি অরুণ? এসব কথার তুমি কী জানো? অরু বলল, সব। ডিনা মিসের পাগল-পাগল লাগছে নিজেকে —সব জানো? অরু সিঁড়িভাঙা অঙ্ক জানো না? অরু রাগতস্বরে বলল, আকাশে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি লাগে বুঝি?
—তুমি কী বলছ অরুণ? আমি তোমার কাকার সঙ্গে কথা বলব কাল। তোমার ভূতে পেয়েছে।
-তোমায় ভূতে পেয়েছে মিস। আমি মরে যাওয়া লোকদের কাছে আনতে পারি।
–বটে! কীভাবে?
-আগে মরো। ভাইয়ের কাছে যাও। তারপর দেখো আমি তোমাকে আমাদের ছাদে ডেকে আনব। তোমার সঙ্গে খেলব, গান করব, কাঠের গোলার আগুনের গল্প শোনাব।
.
সন্ধ্যে নেমেছে। সরু চাঁদ আর তারার আকাশ। চিলেকোঠার ঘরে সকালের ভুলভাল অঙ্কগুলো নিয়ে কাটাকুটি করে যাচ্ছে অরু। কিন্তু মন পড়ে আছে দরজার দিকে, বাবার টোকার জন্য। এটা বাবার সময়।
