জানো মিস, কী আগুন, কী আগুন! সব পুড়ে ছারখার। বলতে বলতে মিসের বাড়ি ঢুকেছিল অরু। কোথায় জিজ্ঞেস করবে, ক-জন মরল? দমকলের ক-টা গাড়ি দেখলে? তা না সটান বই ধরিয়ে বলল, এই নাও, সিঁড়িভাঙার অঙ্কগুলো করে ফেলো। সত্যি-সত্যি অরুর মন ভেঙে গেল তৎক্ষণাৎ। সিঁড়িভাঙার অঙ্ক কষে কে কবে খুব উঁচুতে উঠেছে। মিসের বাড়ি চারতলা, এ পাড়ার সবচেয়ে উঁচু বাড়ি। ছাদে উঠলে হাওড়ার ব্রিজ, মনুমেন্ট দেখা যায়, অথচ ওঠার লোক নেই। ফ্ল্যাট বাড়িতে সবাই নিজের ফ্ল্যাট সামলাচ্ছে। দোর এঁটে বসে ম্যাজিক আই দিয়ে তোক দেখে।
সবাই যখন আগুন দেখতে ছুটল, মনে হল এটা সপ্তমী। কুড়ি দিন আর বাকি কই। কাকা অমৃতবাজার পত্রিকা পড়তে পড়তে হুংকার দিল, অরু! বাড়ির বাইরে যাবে না। ওই রাস্কেলগুলো আগুন দেখতে যায় যাক। তুমি একটু কাগজ পড়ো। দেখেছ, রাশিয়া কত উন্নতি করেছে রকেটে। খুব শিগগির মানুষ যাবে মহাকাশে। এখন কুকুররা যাচ্ছে।
অরুর কান্না পাচ্ছিল। এর চেয়ে রাশিয়ার কুকুর হয়ে জন্মানোও ভালো ছিল। দেশে আগুন লাগবে তাও দেখতে পাব না? আমার চোখে কী হয়েছে। আমি তো সব দেখতে পাই। কোথায় মুখপোড়ার সঙ্গে বাঁধান খেলছে পেটকাটা, জগুদার মাঞ্জায় মাঞ্জায় লাট খেলছে মিন্টো লেনের সিরিলের লেজঝোলা, কাপমার ঘুড়ি। অরু তো… মনে হতেই মনে-মনে জিভ কাটল অরু। কাল চিলেকোঠার ঘরে বসে কী সব্বোনেশে ব্যাপার দেখে ফেলল অরু। পড়ছিল ‘ট্রিম অব টাইম’ বই থেকে জুলিয়াস সিজারের হত্যা, হঠাৎ এলভিসের লাভিং ইউ’ গান ভেসে এল লোরেনদের বাড়ি থেকে। অরু জানালা খুলে দেখে লোরেন একটা ঢাউস তোয়ালে পরে গানের সঙ্গে নেচে নেচে জামা ইস্তিরি করছে। গায়ের উপর দিকে কিছু নেই।
অরু মনে মনে বলল, কাকা, তুমি জানো অ্যাংলোরা কী সুন্দর! বিশেষ করে লোরেন। কী সুন্দর বুক, কাকা, ওর। পরিদের মতো। সাদা দুধের মতো, মাঝখানে…। ধ্যাৎ! নিজের বোকামিতে নিজেই লজ্জা পেয়েছিল অরু। কাকার কথায় খুব ব্যথা পেয়েছে অরু। আগুন দেখতে কেউ কি আগুনের মধ্যে গিয়ে ঝাঁপায়? কাকাটাই বা কী? এত বয়স হয়েছে, একটু আগুন দেখতেও মন চায় না? একটা গোটা কারখানা তো রোজ পোড়ে না! তাও কাঠের গুদাম, এসব তো পোড়ার জন্যই করা।
ডিনা মিসটাই বা কী? অঙ্ক দিয়ে চাকরের মতো বসিয়ে রেখে ভূত ডাকছে! আর তাও কে? না, ভাই জিমি। সবে এক বছর হল যমজ ভাইটি গেছে, তাই কী ডাকাডাকি! আরে, যে আসার সে এমনিই আসে। কেন, অরুর বাবা চলে গেছে চার বছর হল, কিন্তু রোজ সন্ধ্যেকালে ছাদের আলসের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেই বাবা আসে। হাতে হাত ধরে, আকাশের তারা চেনায়, হিটলার নেপোলিয়নের কথা বলে, অঙ্কের কথা কক্ষনো বলে না…তারপর অরুকে…তুলে দেয় আলসের ওপরে আর বলে ছোটো! তখন ডান হাতে বাবার হাত ধরে অনবরত আলসের এদিক থেকে ওদিক ছুটোছুটি করে অরু। গা দিয়ে ঘাম ছুটে যায় শেষে, কিন্তু বাবা ক্লান্ত হয় না।
কেউ এসব দেখতে পায় না, রাতের দিকে ছাদ মাড়ানো অভ্যেস নেই কারও। ছুটতে ছুটতে অরু দেখে হাওড়া পোলের ডগায় আলো, বড়য়া বেকারির চিমনির ধোঁয়া, গ্যাঁজাদের বাড়ির পায়রার খোপ, ফটিকদের ছাদে বিয়ের ম্যারাপ, পারসি বাড়ির বাগানে বটগাছের মাথা, বেনেবাড়ির ভাঙা পিয়ানোর সাদা-কালো রিড, ডাক্তার সাহার একতলার চেম্বারে রোগীর ভিড়, বটকেষ্টর মুদির দোকানে গামছায় মোড়া গুড়, রাখাল উকিলের ফিয়েট গাড়ির ফাটা টায়ার, অঞ্জুদের বাড়িতে প্রাইভেট টিউটরের শিঙাড়া খাওয়া, সিরিলের সঙ্গে গিন্নি মরিনের ঝগড়াঝাঁটি আর বাড়ির পিছনপাটে এসে গ্রাম চালিয়ে লোরেনের নাচ। মাঝে মাঝেই ঘুরে ঘুরে অরু বাবাকে দেখে…কখনো উকিলের সুটে, কখনো ফুলহাতা জামার সঙ্গে ধুতি, পাম শুতে, কখনো গলাবন্ধ কোট আর পায়জামায়।
বাবাকে দেখলেই অরুর গলা বন্ধ হয়ে আসে কান্নায়। কেন সবাই বলে অরুর বাবা নেই। কার বাবা রাত্তিরে ছেলের হাত ধরে আলসে দিয়ে দৌড়োয়? কার বাবা অন্ধকারে তারার দিকে তাকিয়ে কবিতা বলে? কার বাবা অন্ধকারে গাইতে পারে ‘ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কী সংগীত ভেসে আসে’? কার বাবা হাত ধরে থাকলে সে পাখির মতো উড়তে পারে রাতের আকাশে? বাবা থাকলে এই রাতেরবেলায়ই আলসে দিয়ে চলতে পারে অরু। দিনেরবেলা এক পা-ও যাওয়ার ক্ষমতা নেই ওর ওখান থেকে। বাবা আবার নিষেধ করে, মা বা কাকাকে বোলো না যেন! তা হলে ছাদে উঠতে দেবে না।
বাবা কি খেপেছে! তাই কখনো বলা যায় মাকে, কাকাকে? এমনিতেই হাত ছেড়ে রাস্তা পার হতে দেয় না। তার ওপর জুটেছে এই ডিনা মিস, পড়িয়ে পড়িয়ে মাথাটা খারাপ করে দিল অরুর। মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছে করে। বেঁচে থাকার এই ছিরি! আর এখন দ্যাখো এই বুড়ি মিসকে! সিঁড়িভাঙা অঙ্ক ধরিয়ে প্ল্যানচেট করতে বসেছে। অরু ফের গুটি গুটি হলঘরে গেল। দুই বোন চোখ বুজে কীসব বকে যাচ্ছে। হয়তো জিমি এসেছে। ভাইয়ের সঙ্গে তো ওরা গুজরাটিই বলে। বোসো জি, চলো জি, খানা খেয়ো জি… যা-ই বলবে একটা ‘জি’ জুড়ে দেবে।
আলোর লাল আভায় গল্পের বুড়িদের মতো লাগছে দু-জনকে। অরু ভাবল কাছে গিয়ে হালুম! বলে একটা চিৎকার জুড়ে দেয়। কিন্তু তা আর হল না, তার আগেই বাবুর্চি মকবুল এসে কুতা যাইচ্চো? কুতা যাইচ্চো? করে ওকে প্রায় পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে গেল কিচেনে। সেখানে একটা কাঠের বাক্সের ওপর বসিয়ে দিয়ে বলল, ই লাও হাণ্ডি কাবাব, বউত আইসসা আচে। উখানে তো জিন আছে, মিসিবাবা!
