একটু পরে আখেন স্টেশনে জার্মান পুলিশ এসে পাসপোর্ট চেক করতে লাগল। আমার কাছে আসতেই আমি পাসপোর্টটা কোটের ভেতরের পকেট থেকে বার করে দিলাম। পুলিশটা কোনো ছাপ না মেরেই আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ডাঙ্কেসন! অর্থাৎ থ্যাঙ্ক ইউ।
আমি পাসপোর্টটা হাতে নিয়ে বোকার মতন বসে রইলাম খানিকক্ষণ। তারপর সেটাকে পকেটে গলিয়ে দেওয়ার বদলে খুলে ফেললাম। আসলে একটা গুপ্ত ভয় তখন আমার বুকের মধ্যে লাফালাফি করছে। লোকটা আমার পাসপোর্টে ছাপ মারল না কেন?
ইউরোপের কোনো নাগরিক হলে ট্রেনে অন্তত ওই ছাপটাপ মারার রেওয়াজ আর নেই। কারণ ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ভিসার চল উঠে গেছে অনেক দিন যাবৎ। কিন্তু আমি তো ভারতীয়, আমার বইতে তো ছাপ মারতেই হবে। আমি ভয়ে ভয়ে চোখ চালালাম পাসপোর্টের পরিচয়পত্রের অংশের দিকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই আমার ভেতরের রক্ত প্রায় হিম হয়ে বসল। আমি দেখলাম আমার পাসপোর্টে নাম লেখা আছে মঁসিয়ুর মার্সেল রেমঁ এবং ছবির জায়গায় সাঁটা আছে কিছুক্ষণ পূর্বেও আমার সামনে বসা ভদ্রলোকটির ফটো। যে চেহারা আমার আশঙ্কা, আমারই হয়ে উঠবে আর বছর ত্রিশেক বাদে। আমি দড়াম করে পাসপোর্টটা বন্ধ করে বুকপকেটে গুঁজে দিলাম। আমার সমস্ত শরীর ঘেমে উঠেছে। আমার ভেতরে মৃত্যুভয়ের সমতুল্য একটা ভয় জেগে উঠেছে।
এরপর কখন কোন স্টেশন পার হলাম, কখন, কাকে টিকিট দেখালাম, কখন রাত দুটো বাজল আর কখন, কীভাবে কলোন স্টেশনে নেমে ট্যাক্সি ডেকে পূর্বনির্ধারিত এক হোটেলে এসে মার্সেল রের্মর নামে ঘর বুক করে এই ঘরে এসে উঠলাম—আমার আর সঠিক মনে পড়ছে না। এইমাত্র আমি আমার চাবি ঘুরিয়ে রের্মর সুটকেস খুলে দেখলাম আমারই জামাকাপড় বইপত্র ও শেভিং সেটে ওঁর সুটকেস বোঝাই। বুঝতে পারছি না কিছুতেই, সুটকেসটা ওঁর না আমার।
কিন্তু এখন আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখছি ওতে আমার নয়, মার্সেল রের্মর প্রতিবিম্ব পড়েছে। কিংবা বলা চলে আমি সাত ঘণ্টার মধ্যে ত্রিশ বৎসর বেশি বয়সের একটা মানুষ হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছি। আমার চুলে ইতস্তত পাক ধরেছে, চামড়া কিছুটা আলগা হয়ে গেছে, চোখের পাওয়ার কিছুটা বেড়েছে এবং গায়ের রং কিছুটা ফর্সা হয়ে গেছে। আমি রাজীব মিত্র, একজন বয়স্ক সাহেব বলে কলোনের এক নামী হোটেলের কক্ষে প্রশস্ত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
আমার ভয়ানক ক্লান্তি বোধ হচ্ছিল। আমি জামাকাপড় খুলে উলঙ্গ হয়ে বিছানায় টান হয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুমিয়ে পড়তে পড়তেও আমার মনে হল এই ঘুম থেকে আমি হয়তো আর জাগব না।
কিন্তু জাগলাম। প্রতিদিনের মতোই জাগলাম। ঠিক সাতটায়। শুয়ে শুয়ে বিছানায় বেড-টি খেলাম। আরেকটু পরে ব্রেকফাস্টের সঙ্গে সকালের কাগজ এল। ওমলেট আর চা খেতে খেতে জার্মান কাগজের পাতা ওলটাতে লাগলাম। পড়তে তো পারছি না। হঠাৎ একটা ছবি ও খবরে এসে দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। এ কী! এ তো আমারই মুখ ছাপা হয়েছে কাগজে! কেন ছাপল? কোথায় পেল আমার ছবি?
আমি বেল টিপে ওয়েটারকে ডাকলাম। বললাম, এই খররটা পড়ে আমার ইংরেজিতে মানে করে দাও। ছেলেটি ওর ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে মানে করতে গিয়ে বলল, প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের ছাত্র ভারতের রাজীব মিত্র গতকাল রাত্রে স্যাঁকেত স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে নিজের নেকটাই দিয়ে একটি ফরাসি মেয়েকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে এবং পরে ওই নেকটাই নিজের গলায় বেঁধে ওয়েটিং রুমের সিলিং-এ ঝুলে পড়ে। জানা যাচ্ছে ফরাসি মেয়েটির সঙ্গে রাজীবের প্রেম ছিল। ওদের দেখা করারও কথা ছিল স্যাঁকোঁয় রাত সাড়ে নটায়।
ওয়েটার চলে গেছে। আমি আমার ব্রেকফাস্ট ও সকালের কাগজ হাতে নিয়ে খাটে বসে আছি। আমি জানি না আমি এরপর কোথায়, কেন যাব। আমার ভীষণ দুঃখ হচ্ছে নিজের জন্য। আমার চোখে জলও ভেসে উঠছে। কেন আমি অকারণ অন্য একটা লোকের বাকি জীবনটা অতিবাহিত করতে যাব? আমি তো তাঁর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়বর্গ, পারিপার্শ্বিক কিছুই চিনি না। এটা কি কোনো জীবন হতে পারে?
হঠাৎ আমার নজরে পড়ল আমার গলায় নেকটাইটা। বাঁচালে এই খুদে জিনিসটাই আমাকে বাঁচাতে পারে। আমি হঠাৎ উৎসুক হয়ে সিলিং-এ একটা আংটা খুঁজছি। আছে কী? না থাকলে?
সিঁড়িভাঙা অঙ্ক
ডিনা মিস প্ল্যানচেট করছে।
মস্ত মস্ত পর্দা টেনে রেখে ঘর অন্ধকার। গোলটেবিলের এক ধারে ফুলকাটা রেশমি কাপড়ের শেড করা টেবিল ল্যাম্প। এক ধারে ডিনা মিস, অন্য ধারে তার দিদি কুমি। ল্যাম্পের আলোয় দুই বৃদ্ধার রুপোলি চুল সোনালি হয়ে আছে। থেকে থেকে কুমি আন্টির সোনালি চশমার ফ্রেমে ঝিলিক দিচ্ছে আলো। অরু শুধু জানে প্ল্যানচেট মানে ভূত নামানো। অরু ফের বিরক্ত হয়ে পাশের ঘরে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসল। ডিনা মিস কেন ভূত নামাতে যাচ্ছে? ডিনা মিসকেই তো ভূতে পেয়েছে। ধুস! বলে অঙ্কের বই-খাতা বন্ধ করে অরু জানালা দিয়ে শরতের আকাশ দেখতে লাগল।
কী সুন্দর নীল হয়েছে আকাশটা! সাদা মেঘগুলো এই সময়েই এত সাদা হয় কেন? নীচে ইংরেজি ইশকুলের মাঠই বা অত সবুজ হয় কী করতে। অরু দেখল মাঠে ছেলেরা বল নিয়ে নেমে পড়েছে। চার নম্বর ফুটবল। অনেকেরই পায়ে হোজ আর ফুটবলের বুট। এত বলেও কাকার থেকে ফুটবলের বুট আদায় হল না অ্যাদ্দিনে। চোখ খারাপ বলে একটা গোটা ফুটবলও চোখে দেখতে পাবে না অরু? কিন্তু কে বোঝাবে কাকাকে? বললেই হাঁ হাঁ করে উঠবে—সে কী, মাঠে ঘাড় উলটে পড়লে কে দেখতে যাবে? কোথায় মাঠ, কোথায় পুজোর আকাশ, সাদা মেঘ, তা না দিন-দুপুরে বইখাতা নিয়ে পারসি মিসের বাড়ি গিয়ে অঙ্ক কষো। বারোটা অঙ্ক দিয়ে দিনটার বারোটা বাজিয়ে বুড়ি এখন প্ল্যানচেট করছে! আর একটা অঙ্কও মেলার নয়। উত্তর দেখাচ্ছে শূন্য, আর অরুর কষায় হয়ে গেল সাঁইত্রিশ। কী করে সম্ভব! যেমন অঙ্ক, তেমন এই মিস। অরুর ইতিহাস পড়তে, ইংরেজি পড়তে কত সুখ হয়, অঙ্ক কষে কে কবে বড়ো হয়েছে? কাকা বলবে, অঙ্ক কষো, অঙ্কই সব। ডিনা মিস বলবে, অঙ্ক কষলে মাথা খুলবে কী করে? কিন্তু কে বুঝবে, ক-টা বাজে অঙ্ক কীভাবে অরুর একটা গোটা দিনকে নষ্ট করে দেয়? অথচ কী সুন্দর হয়েছিল দিনটা। ঘুম থেকে উঠতেই পাড়াজুড়ে রব শুনতে পাচ্ছিল ‘আগুন! আগুন!’ উঠোনমুখে এসে অরু দেখল, সারাপাড়া খালি হওয়ার জোগাড়। ছেলে-বুড়ো দাদা-দিদি জ্যাঠা-মাসি—যার যা পরিচয়—সবাই ছুটছে মৌলালির দিকে। সি আই টি-র শেষে দু-নম্বর পোলের ওপাশে কাঠের গোলায় আগুন লেগেছে। অ্যান্তো বড়ো আগুন! ভাবল অরু। পুবের আকাশ লাল হয়ে গেছে, যেন আরেকটা সূর্য উঠবে ওই কোণ থেকে। লকলক করে শিখা বেরোচ্ছে, আরেকটু পর ধোঁয়ার মেঘও ছড়াবে। শনিবারের সকালে ছুটির হাওয়া বইয়ে দিয়েছে আগুন। কোথাও আগুন ধরলে, গুণ্ডায় গুণ্ডায় সোডার বোতল চললে, মস্তান ধরতে পুলিশ নামলে পাড়ায় ছুটির হাওয়া লাগে। অরুরও তখন মনে হয়, এরকম পাড়া হয় না।
