প্যারিস ছাড়ার পর আর কেউ তো এই কামরায় ঢোকেনি। তাহলে ইনি কখন এলেন? আর ওভাবেই বা আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ওরকম অসহায় হাসিই বা হাসছেন কেন? উনি কি আমাকে চেনেন? দুর, তাই-বা কী করে হবে? আমি ভারতীয় ছাত্র, মাত্র সাত মাস আছি প্যারিসে, আমার সঙ্গে এরকম কারও কোনো পরিচয় ঘটেনি এর মধ্যে। দু-চার জন বয়স্ক প্রফেসর ছাড়া আমি এই বয়সের বেশি লোকের ধারপাশেও ঘেঁষিনি এতদিনে। তাহলে?
একটা জিনিস আমাকে ভীষণ আকৃষ্ট করেছে ভদ্রলোকের চেহারার মধ্যে। সেটা কী? আমি অনেকক্ষণ ধরে ওর গোটা চেহারার খুঁটিনাটি নজর করে দেখলাম। কই, না তো! চেহারার কোথাও তো কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নেই— না নাকে, না চোখে, না চুলে, না ঠোঁটে। না হাতে, না দেহে, না পোশাকে, না হাবেভাবে। পাছে ভদ্রলোক বিরক্ত হন তাই এক ঝটকায় বইটা ফের তুলে নিয়ে তাতে মন দিলাম। কিন্তু না, মন কিছুতেই আর বইতে গিয়ে বসছে না। ভদ্রলোকের দিকে না তাকিয়েও আমি বুঝতে পারছি যে, ভদ্রলোকও আমাকে নিয়েই কিছু একটা ভাবছেন। হয়ত পূর্বের মতো সেরকম মিটিমিটি হাসছেনও। আমাকে নিয়েও ভদ্রলোকের মনে কিছু কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। আমার ভয়ানক ইচ্ছে হল আয়নাতে একবার নিজের মুখটা দেখার। আমি বইটা ফের সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালাম কম্পার্টমেন্টের আয়নাটার মুখোমুখি হব বলে। একটা আলতো ঝাঁকানি দিলাম কলারের টাইটায়, আর বেশ সপ্রতিভ ভঙ্গিতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম আয়নার মধ্যে। আর চমকে উঠলাম আয়নায় প্রতিফলিত দৃশ্যটি দেখে।
আমার বুঝতে এতটুকু দেরি হল না, কেন আমার সামনে উপবিষ্ট প্রৌঢ় ভদ্রলোক সমানে আমাকে দেখে যাচ্ছিলেন। কারণ ওঁর সুটের রং ও কাপড়, জামার কাপড় ও রং, টাই-গোঁফ চশমা ও টুপি হুবহু আমার মতন। আর দু-জনের চেহারা দু-টিও এক। শুধু ফরাসি ভদ্রলোকের গায়ের রংটা একটু বেশি ফর্সা, আর বয়সের জন্য চেহারাতেও কিছুটা ঢিলেঢালা ব্যাপার। নতুবা ওঁকে যেকোনো লোক দেখলে আমার ভবিষ্যৎ চেহারা আঁচ করতে এবং আমাকে দেখলে ওর বিগত যৌবন সম্পর্কে ধারণা করতে পারবে। মুখে একটু রংচং বুলিয়ে আর চোখে একটা কালো চশমা পরে আমি অনায়াসেই ওঁর হয়ে কোথাও হাজিরা দিতে পারি। আর উনিও যদি একটু রংটং মেখে যুবা সাজেন তো… না আর ভাবতে পারলাম না। আমার মাথাটা কীরকম ভেতরে ভেতরে দুলতে লাগল। আমার মনে হল আমার সামনে আমার একটা জীবন্ত ক্যারিকেচার। ভীষণ রাগও হল ওঁর ওপর, আবার কিছুটা মায়াও। আমি স্থির করলাম গোটা জার্নিতে ওঁর দিকে আর তাকাবই না। তাই ফের থ্রিলারটা উঠিয়ে নিয়ে মনসংযোগ করার চেষ্টা করলাম।
কিন্তু একেকটা সময় থাকে যখন মনসংযোগ দিয়ে কিছু করা জেগে জেগে ঘুমোনোর মতো অস্বস্তিকর, অসম্ভব ব্যাপার হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রেও আমার ঠিক তাই হল। আমি বই পড়ার বদলে সামনে বসা মানুষটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে ও তাঁর চরিত্র বিশ্লেষণ করতে লাগলাম। আমি মনে মনে বিভিন্ন পোশাকে ওকে সাজিয়ে আমার চেহারার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে লাগলাম। হঠাৎ কি ভেবে ওকে ধুতি-পাঞ্জাবিতেও কল্পনা করলাম। কিন্তু প্রতিবারই আমার গায়ে কাঁটা দিল যখন খেয়াল হল যে লোকটার সঙ্গে আমার প্রৌঢ় চেহারার কোনোই ফারাক নেই। ওই অত শীতেও আমার শরীরটা ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠতে লাগল। আমার একটা অকারণ ভয়ও হল সহসা। লোকটা আসলে আমিই নই তো?
শেষের কথাটা মনে উদ্রেক হতেই আমার স্থৈর্য চুলোয় গেল। আমি ফিরে আরেক বার ভদ্রলোকের দিকে না তাকিয়ে পারলাম না। কিন্তু যতক্ষণে মুখ তুলে ফের তাঁর দিকে তাকিয়েছি ততক্ষণে দেখি তিনি নির্বিকার আমার সুটকেসটাই র্যাক থেকে নামিয়ে নিয়ে কামরার বাইরে হন্টন লাগিয়েছেন। কারণ ট্রেন তখন এসে দাঁড়িয়েছে স্যাঁকেতা স্টেশনে।
প্রচন্ড আতঙ্ক হল ভেতরে ভেতরে। এ কি! আমার সুটকেস নিয়ে লোকটা চম্পট দিল বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে। আমি ছুট লাগালাম ওঁর পিছনে। কিন্তু করিডরে পা ফেলে লোকটা যে কোথায় উধাও হল তা এতটুকু হদিশ মিলল না। ভয়ের চোটে কোটের ভেতরের পকেটে হাত চালিয়ে দিলাম। না, পাসপোর্ট টিকিট টাকার ওয়ালেট আর অন্যান্য পরিচিতিপত্র সব ঠিক আছে। সুটকেসটার মধ্যে রাখা জামাকাপড়, বইপত্র আর শেভিং সেটটা উধাও হল।
স্যাঁকেতাঁ স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে, কিন্তু আমার প্ল্যাটফর্মে নামার সাহস হচ্ছে না। যদি ট্রেন ছাড়ে তাহলে ওঠার আর বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকবে না। এই পাগল করা শীতের মধ্যে এই স্টেশনে পায়চারি করতে হলে নিউমোনিয়াকে সঙ্গী করে কলোন পৌঁছোতে হবে আগামীকাল। আমি মানে মানে নিজের কামরায় ফিরে, নিজের জায়গাটিতেই বসে পড়লাম। আর তখনই চোখে পড়ল সামনের র্যাকে ঠিক আমার মতন একটা স্যুটকেশ, যেটা নির্ঘাৎ ওই ভদ্রলোকের ফেলে যাওয়া লাগেজ। তৎক্ষণাৎ ঠিক করলাম ওই সুটকেসটাই হস্তগত করে আমি কলোন স্টেশনে নামব।
ট্রেন এখন ফ্রান্সের বর্ডার ক্রস করে জার্মানিতে ঢুকল। আমি বুকে আঙুল টিপে দেখে নিলাম পাসপোর্ট, টিকিট সব ঠিক আছে কিনা। ভীষণ বাসনা হল সামনের র্যাকের সুটকেসটা খুলে দেখি ওতে কী আছে। আমার কাজে লাগে কিনা। কিন্তু ভয় হল। আমার চাবিতে যদি স্যুটকেসটা না খোলে তাহলে পাশের লোকজনের মনে সন্দেহ জাগতে পারে। ঠিক করলাম সুটকেসটা নিয়ে একেবারে হোটেলে গিয়েই খুলব।
