মীর আনন্দের আতিশয্যে তখন কী বলবে কিছু ঠাওরে উঠতেই পারল না। আলবৎ, আলবৎ বলতে বলতে আরও তিনবার কুর্নিশ করে ফেলল। আর তখনই জীনাত ওই ছুরিটা ওর হাতে দিয়ে বলল, এই নিন শেখ সুলেমানের ছুরি। এটা দিয়েই তিনি খোদা বক্সকে দ্বন্দ্বে হারিয়েছিলেন। এই ছুরি নিয়ে কেউ কোনোদিন হারে না। এই ছুরি দিয়েই সুলেমানের দাদু ওয়ারেন হেস্টিংস সাহেবের বন্ধু ইলিংওয়র্থকে খুন করেছিলেন আবধে। এই ছুরি দিয়েই কাল
সবার সামনে আপনি ঘাউস মহম্মদের ছেলেকে দ্বন্দ্বে আহ্বান করবেন। নচেৎ এখান থেকে আমায় নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। ওদের চর সর্বত্র। আপনি খোদাতাল্লার অশেষ কৃপায় এই ছুরি পেয়েছেন। আপনি জিতবেনই।
আহ্লাদের জোয়ারে ভাসমান ভীতু মীর এক ঝটকায় ছুরিটা নিয়েই বলে উঠল, কালই আমি কুত্তার বাচ্চার জান নেব এই দিয়ে। তারপর আপনার পাশে এসে এই ছুরি রাখব। বলেই ফের ওর খেয়াল হল ভদ্র মেয়ের সামনে ওরকম কাঁচা বুলি সভ্য মীর এর আগে কখনো বলেনি। লজ্জাও হল কিছুটা, কিন্তু আনন্দের তরঙ্গে তখন সেই শরম ভেসে গেল।
রাত্রে নিজের তাঁবুতে ফেরার আগে মীর একবার ঢু মারল বুড়ো আব্বাসের তাঁবুতে। ভড়ক ভড়ক নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। মীর চাচা, চাচা করে দুই ঠেলা মারল ওকে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসল আব্বাস, তারপর অকথ্য গালিগালাজ শুরু করল। বত্তমিজ বেয়াদব! রাত্তিরে বুড়োদের ঘুম ভাঙায়। এরা কোনোদিনই ভালো শায়ের হতে পারবে না। কখনোই না।
তখন ‘চাচা-চাচা’ করে মীর বোঝাল বুড়োকে সমস্ত কথা। আর একেকটা কথার সঙ্গে সঙ্গে বুড়োর চুল দাড়ি দাঁড়িয়ে যেতে লাগল। তারপর যেই ছোরার কথা উঠল অমনি বুড়ো চিৎকার করে বলে উঠল, নহি! নহি! কভি নহি! এ কখনোই হতে পারে না। এ হবার না। তাহলে বলি শোনো…
ঘাউস মহম্মদের ছেলে জিগর পাঁচ বয়সে থেকে ছুরি খেলে। বারো বছর বয়স থেকে মদ খায়। আঠারো বছর বয়স থেকে মেয়েদের উপর হুজ্জতি করে। কেউ যে ওকে ঘাটায় না তার কারণ ওর বাড়ির পয়সা আর ওর গায়ের জোর। একটা মোষের মতো জোর ওর, যেমনটা ওর বাপের ছিল। কিন্তু জীনাত ওকে কোনোদিনই শাদি করবে না। দেদার বক্সও মেয়েরে বিয়ে দিয়ে ছাড়বেন ওর সঙ্গে। শেষে জীনাতের যখন সতেরো বছর বয়স ও জানিয়ে দিল ওর মনোনীত সাত-সাতজন পুরুষকে যদি ছুরির লড়াইয়ে খতম করতে পারে জিগর তবে ও না হয় বিয়ের কথা ভেবে দেখবে। তা এতদিনে ছ-জন তো জিগরের হাতে মরেছে। তুমি মরলেই জিগর চড়ে বসবে জীনাতের বাড়িতে শাদি করো শাদি করো’ বলে। আর মুশকিল এই যে, জীনাতের পছন্দ যত তোমার মতো ন্যাকাবোকা শায়ের-টায়ের, যারা কোনোদিনও জিগরের সঙ্গে লড়ে পারবে না। ছ-জন গেছে। তুমি মানে মানে কেটে পড়ো।
মীরের গলায় ততক্ষণে যেন বরফ জমে গেছে। ছুরিটা বার করে দেখিয়ে বলল, কিন্তু এই ছুরিটা! আমি কাল কী মুখ নিয়ে এই ছুরি ফেরত দিতে যাব?
সট করে ছুরিটা মীরের হাত থেকে কেড়ে নিল আব্বাস। বলল, কাল তোমায় যেতেই
হবে না কোথাও। তুমি গোছগাছ করো। আমরা এখনই হেঁটে স্টেশনে যাব। কাল ভোরের ট্রেন ধরে পালাব। আর কোনো কথা তোমার আমি শুনতে চাই না। তোমার আব্বাকে বলে আমি তোমায় মেহফিলে এনেছি। এখন আর কোনো কথা শুনব না।
রাতের অন্ধকারে দুটো কাপুরুষ হেঁটে স্টেশনের দিকে রওনা হল। যেমনটি ঠিক ত্রিশ বছর আগে কেটে পড়েছিল আব্বাস ছুরির লড়াই থেকে বাঁচতে।
ওরা লক্ষ্ণৌ ফিরে যাবার উনিশ দিন পর খবর পৌঁছোয় বিখ্যাত গজল গায়িকা এবং পরমাসুন্দরী জীনাত বাই ছুরি দিয়ে নিজের মুখ ক্ষতবিক্ষত করেছেন। হিসেব করে দেখা গেল ঘটনাটা মীরদের চলে আসার পরের দিনই। কিন্তু ওই বিকৃত কুৎসিত মুখের মেয়েকেই সাগ্রহে শাদি করেছেন পরলোকগত রহিস আদমি ঘাউস মহম্মদের পুত্র জিগর।
আজ কুড়ি বছর পর মীর ওরমানে ফিরেছে। সারা হিন্দুস্থানে সবার সেরা শায়ের এখন মীর মুশারফ লখনৌয়ী। তাঁকে আহ্বান করে নিয়ে আসছেন ওরমানের রহিস জিগর মহম্মদ। এই মেহফিল প্রতি পাঁচ বছর অন্তর হয় এককালের শ্রেষ্ঠ গায়িকা জীনাত বাইয়ের স্মরণে। যিনি দশ বছর আগে দেহ রেখেছেন।
শহরটা খুব অচেনা ঠেকছে মীরের। মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ল ওরই রচনা এবং ওরই প্রিয় শেরটা, আজব হ্যায় ইয়ে নগরী যহা পিয়ার মিলে। আজব হ্যায় ইয়ে নগরী যহা পিয়ার ভি ঘায়েল হো! মীর জোব্বার ভেতর থেকে শেখ সুলেমানের বাঁকানো ছুরিটা আরেকবার বার করে দেখল ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে। পুরোনো সেই ভয়াবহতাটা এখনও অটুট আছে। লক্ষৌয়ে কেউ মীরকে যখন জিজ্ঞেস করেন, সাহাব, শাদি কিউ ন নকিয়ে? মীর জোব্বার থেকে ছুরিটা বার করে দেখিয়ে দেয়।
বহু পরিচিত এই ছুরিটা আজ মীরের খুবই অদ্ভুত অদ্ভুত ঠেকছে। কেন, কে জানে!
সহযাত্রী
আমি প্যারিস থেকে জার্মানির কলোন শহরে যাচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম সাত ঘণ্টার যাত্রাটা একটা ডিটেকটিভ নভেল পড়েই কাটিয়ে দেব। পরে দেখলাম নভেলটা মোটেই তারিয়ে তারিয়ে পড়ার জিনিস না। ডিটেকটিভ নভেলের চেয়ে থ্রিলারের উপাদানই এতে বেশি। এদিকে থ্রিলারে আমার চট করে মন বসতে চায় না। শার্লক হোমস বা পোয়ারো-র ফ্যান আমি, বুদ্ধির খেলা দেখতেই ভালোবাসি? এই নভেলটা আমাকে বড্ড বেশি ছুটোছুটি করাচ্ছিল। আমি দুম করে বইটা বন্ধ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে বসলাম। ১আর জানালার বাইরে চোখ মেলে দেখবার চেষ্টা করলাম স্যাঁকেতা স্টেশন আসার উপক্রম হল কিনা। আর তখনই আমার নজরে পড়ল সামনে বসা প্রৌঢ় ভদ্রলোকের উৎসুক মুখটি। ট্রেনে ওঠার সময় এই ভদ্রলোকটি আমার সামনে বসেছিলেন কিনা মনে করতে পারলাম না।
