সেদিন রাত্তিরে তাঁবুতে শুয়ে মীর জীনাতের কথাই ভাবছিল। অল্প বয়সের ছেলে, বড়োলোকের সুন্দরী মেয়ের নজরে পড়লে কিছুটা বিহ্বল তো হবেই। তার ওপর জীনাত বাইয়ের মতো মেয়ে। এত অল্প বয়সে এত নামডাক তামাম হিন্দুস্থানে কারো হয়নি। একেকটা শের সুর দিয়ে আওড়ে গেলে হই হই পড়ে যায়। মনে মনে সবাই ওকে বিয়ে করতে চায়। এমনকী বুড়ো আব্বাসও এই আশি বছর বয়সে বেহায়ার মতন ওকে ভজাবার চেষ্টা করছিল।
তাঁবুর আলো তখনও টিম টিম করে জ্বলছে। ঘুমোবে না জেগে একটু শের পাঠ করবে এইসব ভাবছিল যখন মীর, হঠাৎ বোরখা পরে একটা মেয়ে ঢুকে পড়ল ঘরে। কে? কে? করে চেঁচাতে যাবে মীর কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুল না। বোরখার ভেতরের মেয়েটা আমিনা, মুখের পর্দা উঠিয়েই বলল, জীনাত বাই ডেকেছেন তোমাকে। এক্ষুণি চল।
ওই শীতের রাত্তিরে টিপ টিপ করে বৃষ্টিও পড়ছিল। আমিনা বলল, তুমি আমাকে চিনতে পারোনি? আমি জীনাতের দেখাশুনো করি। ছোটোবেলা থেকেই। মীর আমতা আমতা করে কী একটা বলতে যাচ্ছিল, কোথায় একটা ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ শুনে চুপ মেরে গেল।
এত রাত্তিরে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ গোটা ওরমান শহরে ভয়ের সঞ্চার করে। ট্রেনে আসতে আসতে বুড়ো আব্বাস মীরকে বলেছিল শেখ সুলেমানের কথা। জীনাতের মা আরজুমান বানুকে অন্ধের মতো ভালোবাসতেন। নামাজ পড়ার মতো দিনে আটবার ওরমান শহরের দিকে মুখ করে আরজুমানের নাম করে শের আওড়াতেন। খোদা বক্সের সঙ্গে বাঁকানো ছুরি নিয়ে রক্তারক্তি লড়াই লড়েছিলেন আরজুমানের জন্য। খোদা বক্স খুন হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সুলেমানও আরজুমানকে নিয়ে ওরমান থেকে ফিরতে পারেনি। রাত্রে ঘোড়ায় করে ফিরছিলেন যখন খোদা বক্সের স্যাঙাতরা পেড়ে ফেলে ওঁকে ছাপান্নবার ছুরি মারে। তারপর লাথি মেরে খালের জলে ফেলে দেয়। খোদা বক্সের ভাইপো দেদার বক্স তখন আরজুমানকে নিয়ে ওঁর মহল্লায় রাখে। বাড়ির সমস্ত ধনদৌলত ছেড়ে দেয় আরজুমানকে, ভালোবাসা দেবারও চেষ্টা করে। কিন্তু আরজুমান ওই যে মনে মনে সুলেমানকে ভালোবেসেছিল তার থেকে এক চুলও হটল না। বিরাট পালঙ্কে দেদারের পাশে শুয়ে শুয়ে আরজুমান সুলেমানের প্রিয় গজলটা মনে মনে গাইত। কিতনি কমজোর হ্যায় ইয়ে দুনিয়াওয়ালে। যব প্যার ঢুড়নেকো আয়ে তলোয়ার লায়ে। সুলেমানকেও ছুরি নিয়ে ভালোবাসার লড়াই লড়তে হয়েছিল।
এই দেদারেরই মেয়ে জীনাত। যে জীনাত ঘরে সুলেমানের তসবীর রেখে পূজো করে। আর নিঝুম রাতে ঘোড়ায় করে সুলেমানের আত্মা হন্যে হয়ে ঘোরে সারা ওরমান শহরটা। পাইক বরকন্দাজ ছাড়া আর কেউ ওই সময়টায় রাস্তায় নামে না। বিশেষ করে খোদা বক্সের কেউ রাস্তায় থাকলে তাদের পিছু নেয় কী একটা অশরীরী বস্তু। এর মধ্যেই ওদের সাতজনকে উন্মাদ করেছে সেই হাওয়া। প্রৌঢ় দেদার বক্স তো আজকাল বাড়ির বাইরে এক পাও যান না। সারাক্ষণ আগলে রাখেন মেয়েটাকে। মাঝে মাঝে রেগে উঠে বলেন, তুই সুলেমানের নাম নিস কেন? ব্যাটা মরে গিয়েও আমাদের কারোকে শান্তি দিল না।
এইসব কথা মনে আসতেই মীর তটস্থ হয়ে উঠল। একটা অভিশপ্ত মহল্লায় ঢুকছে ভেবে ভীতু মীর ফের মনে মনে নামাজ পাঠ করতে শুরু করল।
বাগানের দিকটা দিয়েই ঢুকিয়ে নিয়ে গেল আমিনা। সহসা মীরের চোখে পড়ল এক প্রৌঢ়া প্রদীপের আলোয় মুখ আদুল করে বসে। এরকমটা কিন্তু এরই গোঁড়া মুসলমান পরিবারে কখনো দেখা যায় না। বিশেষ করে রাত্তিরের এই সময়টায়। আমিনা বলল, উনি জীনাতের মা, আরজুমান বানু। বিশ বছর ধরে পাগল। ছ্যাঁৎ করে উঠল মীরের বুকটা। যেন একটা রূপকথার মানুষকে বাস্তবে দেখল। ফের ঘুরে তাকাল মীর। না কিংবদন্তীর সেই রূপের সাজ
আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বুড়ো আব্বাস বলছিল, নেহাত আমি ছুরি চালাতে জানতুম না। না হলে আমিও কি লড়তাম না ওর জন্য!
দু-তিনটে মহল পেরিয়ে আমিনা ডান দিকে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল। মীর থমকে দাঁড়িয়ে গেছে দেখে পিছন ফিরে ফিসফিস করে ডাকল, এসো। উজবুকের মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? মীর যেন একটু থতমত খেয়ে গেল আমিনা ওকে উজবুক বলল বলে। তারপরেই ভাবল, তাই তো! কেউ প্রেমে পড়লে তো ভারি উজবুক হয়ে যায়। মেয়েরাও সেটা বুঝতে পারে। না হলে আমিনার মতো একটা পরিচারিকা শ্রেণির মেয়ে…
মীর সাহাব! মীরের এবার ঘোর ভাঙল এক অদ্ভুত সুরেলা কণ্ঠের ডাক শুনে। মানুষ না দেখতে পেলেও ওর বুঝতে অসুবিধে হল না আওয়াজটা কার।
মীর তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল। অন্ধকারেই অনেকখানি মাথা ঝুকিয়ে কুর্নিশ করল জীনাতকে। গদগদ কণ্ঠে কী সব বলতে গিয়ে থমকে গেল। কালো জামার ভেতর থেকে জীনাত ততক্ষণে একটা বাঁকানো চকচকে ছুরি বার করে এনেছে। আর বলে চলেছে, আপনি নিশ্চয়ই এতক্ষণে আমাদের বাড়ির সব কাহিনি শুনেছেন কারো না কারো কাছে। সারা ওরমান শহর সে সব জানে। গত তিন বছর ধরে আব্বা আমার শাদি দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ওঁর পছন্দ যে লোকটা আমি তাঁকে ঘৃণা করি। ঘাউস মহম্মদ, যিনি ওর বাবা ছিলেন, তিনিই খান সাহেব শেখ সুলেমানকে প্রথমবার ছুরি মারেন। উনিই ফের শেখকে লাথি মেরে খালজলে ফেলে দেন। আমি ওর ছেলেকে কখনই বিয়ে করতে পারি না। কিন্তু আব্বার এসব বোঝার বুদ্ধি নেই। উনি জানেন না আমার মা শেখকে কতখানি পিয়ার করতেন। তাঁর পাগল হওয়ার কারণও শেখ সুলেমানের ভালোবাসা। কিন্তু আমার বাবা কোনোদিনই সে-কথা বুঝবেন না। ওঁর কাছে ঘাউস মহম্মদ শানদার আদমি, বিরাট পুরুষ। তাই ওর ছেলের লম্পট চরিত্রটাও ওঁর কখনো নজরে আসে না। আমি আপনার সঙ্গেই লক্ষৌ চলে যাব। আপনার বউ হয়ে থাকব। আপনি আমায় নেবেন?
