নিরু জোরে পা চালিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। ভাবল, দিদি ঠিকই বলে যে, লোরেনের মা একটা যাচ্ছেতাই। আইজায়াস না কী একটা বার-এ গান গায়। যার-তার সঙ্গে মেশে। সুন্দরী মেয়েটাকেও খারাপ করে দিতে চায়। কিন্তু লোরেন হবে না। ও সত্যিকারের বড়ো ডান্সার হতে চায়।
বাড়ি ফিরে আর খিদে পেল না কিছুতেই নিরুর। মাকে, কাকাকে, বড়োঠাকুরদাকে বলল, খুব খেয়েছি লোরেনের জন্মদিনে। তাও জোর করে এক বাটি দুধ গেলাল মা। তারপর কাকার ঘরে কাকার বিছানায় গিয়ে মুখ গুঁজে শুল। কারণ শুধু খিদে নয়, ওর ঘুমও বোধ হয় চিরতরে কেড়ে নিয়েছে লোরেনের চুমু, বুকের স্পর্শ, গায়ের গন্ধ। মনে পড়ল নন্দিনীর ঠোঁট। যে ঠোঁটে কোনোদিনও চুমো দেওয়ার সাহস হয়নি নিরুর। নন্দিনীকে ছুঁতেই পারেনি কোনোদিন।
এটা মনে হতে নিজেকে খুব পাপী মনে হল নিরুর। নিজেকে ঘেন্না হল। বুঝতে পারল যে লোরেন যা করেছে তার জন্য সে নিজেও অনেকখানি দায়ী। নিরু তো সত্যিই …নিরুর চোখ ফেটে জল আসছে। জেগে থাকা আর ঘুমের মধ্যে একটা আবেশের জায়গা আছে। যেখানে তলিয়ে যাচ্ছে নিরু। কতক্ষণ এভাবে ও মুখ গুঁজে পড়ে ও ভুলেও গেছে। কাকা এসে না ডাকলে ও উঠবে না।
কিন্তু ও এখন স্পষ্ট শুনল কাকা মাকে বলছে, আমি জানি তোমার কষ্ট হবে বউদি । তাহলেও বলছি নিরুকে আমি ভালো বোর্ডিঙে পাঠিয়ে দেব। এখানে থাকলে ও নষ্ট হয়ে যাবে।
কাকা একটু চুপ করল। মা-ও চুপ। তারপর মা বলল, ওকে নিয়েই তো থাকি। এত ছোটো।
কাকা বলল, সে কষ্ট কি আমার নেই, বউদি?
মা বলল, ও তো পড়াশুনোয় এত ভালো। কী এমন হল?
কাকা বলল, সেজন্যই তো ভাবি। পাশের রাস্তার নন্দিনী বলে মেয়েটা আছে, ওর বাবা আমাকে আজ তিনটে লাভ লেটার দিলেন। বলছেন, নিরু লিখেছে ওর মেয়েকে।
মা আঁৎকে উঠে বলল, সে কী!
কাকা বলল, কিন্তু বউদি, কী সুন্দর চিঠি সেগুলো। ভাবতেই পারছি না আমাদের নিরু লিখেছে। ও কত নিঃসঙ্গ, একলা, আমরা কোনো খবরই রাখি না। আমরা তো ওকে নষ্ট করে ফেলব!
নিরু শুনল মার ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ। গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে ওর, কিন্তু ও কখনোই সেটা করবে না। মা, কাকা কেউ তো ওকে কিছু বলেনি। ও কাঁদলে ওরা লজ্জা পাবে, দুঃখ পাবে। আর ওকে ভেতরে ভেতরে মরে যেতে হবে। ও বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে রইল ভাঙা পুতুলের মতো।
আরও রাতে কাকা যখন এসে ওর পাশে শুল ও উঠে বসে ধরা গলায় বলল, কাকা, আমায় বোর্ডিং-এ ভর্তি করে দাও। নিরুর মুখে একথায় কাকা বেশ হকচকিয়েই গেছিল। উঠে বসে নিরুর মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে জিজ্ঞেস করল, কেন, কী হয়েছে বাবু?
নিরু কান্নায় ভেঙে পড়ে কাকার কোলে মুখ লুকিয়ে বলতে লাগল, এখানে থাকলে আমি খারাপ হয়ে যাব, কাকা! এখানে থাকলে আমি খারাপ হয়ে যাব। বাবলিকে দেখছি। আস্তে আস্তে কীরকম পাথরের মতো হয়ে যাচ্ছে বাবলি, ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটার দিকে স্থির তাকিয়ে বলছে, জিম ভালো ব্যাবসা করছে। আমার নীলুকে কেড়ে নিয়ে অ্যাণ্ডি তুলে দিয়েছে। স্ট্রং, হ্যাণ্ডসাম, অ্যামেরিকান ইয়ুথ। আই শুড বি হ্যাপি। আমার কী সৌভাগ্য নীতিনদা।
আর থাকতে পারছি না ঘরে। গলার কাছে মোচড়াচ্ছে কীরকম। বাললি দু-হাতে চোখ ঢেকেছে। আঙুলের ফাঁক দিয়ে জল গড়াচ্ছে। নীল কার্পেটের ওপর দৃষ্টি এঁটে মনোরোগীদের কায়দায় আপন মনে বিড়বিড় করে কী সব বলে যাচ্ছে বাপী। আমি একটা বড়ো স্টেপে ঘরের বাইরে গিয়ে টয়লেটটা খালি পেয়ে ওখানেই ঢুকে গেলাম। পিছনে দরজা টেনে দিয়ে দোনামনায় পড়লাম। এই ছোট্ট এক চিলতে টয়লেটে দাঁড়িয়ে আমার কী উপকার হবে? তার চেয়ে…
আমি পাশ ঘুরতেই বেসিনের আয়নাটাকে সামনে পেলাম। আর আয়নার মধ্যে নিজেকে। আর, আমার চোখে জল। গন্ডদেশ দিয়ে গড়াচ্ছে। কেন? কার জন্যে? কতটুকু?
আমি দেখছি আমি কাঁদছি। বাপী কাঁদতেও পারে না, তাই বোবা মেরে বসে আছে। বাবলির সামনে। বাবলিও কাঁদছে, কিন্তু ও চায় না আমরা দেখি। আমি চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসছি টয়লেট থেকে, ফের আয়নার একটা অংশে চোখ গেল। লাল লাল দাগ কীসব! আমি কাছে গিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। লাল লিপস্টিকে আঁচড় কাটা। নিশ্চয়ই বাবলির। কিন্তু কার জন্য? আমি আরও ঘনিষ্ঠ হলাম আয়নার। আর স্পষ্ট দেখছি
—ফেয়ারওয়েল নীলু? আই স্টিল লাভ ইউ।
ভেতরে কীরকম প্রতিরোধ হচ্ছে একটা। নীলু নীলু নীলু। পাষন্ড, বাস্টার্ড, সোয়াইন। ও কোনোদিনও বুঝবে না ভালোবাসা কী। ও কোনোদিন বুঝবে না বাবলিই বা কী। শুধু ভালোবাসার জন্যই ভালোবেসে বেসে মরে যাবে মেয়েটা। আমি পকেটের রুমাল বার করে আয়নার লেখাগুলো ঘষে ঘষে মুঝতে লাগলাম। নীলুর প্রাপ্য নয় এই ভালোবাসা।
শায়ের
ওরমান শহরটা মীরের জানার কথা নয়। এখন আর মনেই পড়ে না কতকাল আগে এখানেই এক মেহফিলে গাইতে এসে আলাপ হয়েছিল জীনাত বাইয়ের সঙ্গে। পহেলি নজরে মুগ্ধই হয়েছিলেন বলা চলে। গজলের প্রত্যেকটা শেরের সঙ্গে যেভাবে জীনাতের চোখে পলক উঠছিল পড়ছিল, যেভাবে চোখে বিদ্যুৎ খেলছিল কিংবা জল জমে উঠছিল তাতে মীর নিজেই ভারি অবাক হয়ে গিয়েছিল। সেদিন তো মহামান্য জাফর, আব্বাস, রঈস, নিয়ামত, তাবিজ, মোহশিন, মেহফুজ…তামাম দুনিয়ার সমস্ত নাম করা শায়েররাই আসরে হাজির ছিলেন। আর সবাই চাইছিলেন জীনাতকে কাব্যের দৌড় বোঝাতে। কিন্তু সাদামাটা মীরেরই কপালে সেই খোদার নূর এসে ঠিকরে পড়ল। মেহফিলের শেষে মীরকেই জীনাত এসে জিজ্ঞেস করল, আপনি বহু দূর থেকে এসেছেন, তাই না? আপনি ওরমানে আগে কখনো এসেছেন? না? এখানে গালিব একবার তিন দিন, তিন রাত্তির কাটিয়ে গেছিলেন।
