বৃষ্টির আওয়াজ থেমেছে বলে চিলেকোঠার পায়রাদের ‘গুগুরগু! গুগুরগু! কানে আসছে। কিন্তু সেসব শুনেও শোনা হচ্ছে না নিরুর। ওর তিন-তিনটে জবাব দেয়নি নন্দিনী। আর একটু আগে লোরেন ওকে জন্মদিনে ডেকেছে। যে লোরেনের বাড়ি ও কোনোদিনও যাবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিল। গেলেই তো খারাপ হয়ে যাবে। ওকে ন্যাংটা হওয়া নাচ দেখায় মেয়েটা দূর থেকে। হাতের নাগালে পেলে কী করবে কে জানে! কথাটা মনে হতেই আপনা থেকে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল একটা নিষিদ্ধ শব্দ—প্রস্টিটিউট! সদ্য শিখেছে উজ্জ্বলদার থেকে। যার মানে নাকি…
ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ হল বাইরে! ফতফত ফতফত… তরপর ঝিল্লির ডাক করর কররর …নিরু ‘ঝিল্লি?’ বলে ডেকে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল। আর অমনি ফতফত করে পায়রাটা ঢুকে পড়ল ঘরে। জায়গা মতো বসতে গিয়ে গা ঘষে গেল নিরুর সঙ্গে। আহা বেচারি! ভিজে নেতিয়ে আছে। কোথায় ছিল এতক্ষণ? নিরু ঠক করে লাইট জ্বালিয়ে দিল। ইচ্ছে হচ্ছে জামা দিয়ে ওর গা মুছিয়ে দেয়। কিন্তু ওমা ওকী! ওর পায়ে তো কোনো চিঠি নেই। নন্দিনী নিরুর চিঠিটা খুলে নিয়েছে, কিন্তু নিজের চিঠিটা দেয়নি।
রাগে দপ করে জ্বলে উঠেছে নিরুর মাথা। ও ফের লাইট নিবিয়ে দুদ্দাড় করে নেমে এল নীচে। মা বেরুচ্ছিল ঠাকুর ঘর থেকে, ও সোজা সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, মা, দুটো টাকা দেবে? কাকা এলে দিয়ে দেব।
মা বুঝল না নিরুর হঠাৎ দুটো টাকার প্রয়োজন হল কেন। আর কাকা এলে তা ফেরত করার কথাই বা উঠছে কেন। একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করল মা, কেন, দুটো টাকার কী দরকার?
নিরু বলল, লোরেনের জন্য গিফট কিনব।
মার রহস্য কাটল না। বলল, কে লোরেন? ও ধিঙ্গি ফিরিঙ্গিটা? নিরু কিছু মনে করল না। লোরেন সম্পর্কে সব্বাই এইভাবে কথা বলে। ও শুধু বলল, ওর জন্মদিন আজ।
তা সে তো তোমার দিদির বন্ধু। তোমাকে নেমন্তন্ন করে কেন? আপনা থেকে ওর সেই ছোটোবেলার রাগটা বেরিয়ে এল। নিরু ঝাঁঝ করে বলল, সে তোমায় জানতে হবে না !
মা বোধ হয় ওর বাবাকেই দেখল ওর মুখের মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে গলা নামিয়ে বলল, দিচ্ছি, কিন্তু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবে। আর কাকার থেকে নিয়ে ফেরত দেবার দরকার নেই।
নিরু কিছু না বলে টাকা নিয়ে হলঘরের একধারে রাখা চটি পায়ে গলিয়ে বেরিয়ে গেল মুকুন্দর দোকানের দিকে। যেখানে ক-দিন ধরে কিছু নতুন ফিতে আর ইয়ো-ইয়ো ঝুলছে। লোরেনের কালো গাউনের সঙ্গে মানাবে বলে একজোড়া সাদা রিবন কিনল ও। আর একটা লাল ইয়ো-ইয়ো। তারপর পাশের গলি দিয়ে জোরে পা চালিয়ে এগিয়ে পড়ল লোরেনদের বাড়ির দিকে।
লোরেন বিশ্বাসই করতে পারছে না সত্যিই নিরু ওটা ওর বার্থডে ভেবেছে। আসলে ও তো ঠাট্টা করেছে। কিন্তু এখন নিরুর হাতে রিবন আর ইয়ো-ইয়ো দেখে একেবারে ব্যাজার। ও যে কী বলবে তাই মুখে জোগাচ্ছে না। ও শুধু বলল, ইউ রিয়েলি থট ইটস মাই বার্থডে?
নিরুর কান্না পাচ্ছে। ও কোনোমতে গলার কাছটায় জমে ওঠা কান্নার দলাটাকে নিঃশ্বাসে চেপে বলল, আই বিলিভ ইউ, লোরেন।
ফের একবার যেন সাপের ছোবল খেল মেয়েটা, কিছুতেই আর অবস্থাটা হালকা করে আনতে পারছে না। ভয়ে গা-ঝাড়া হাসিও হাসতে পারছে না। পাছে অভিমানী ছেলেটা রেগে ফেটে পড়ে।
ও আস্তে করে হাত রাখল নিরুর গায়ে। নিরুর গা ঘেন্নায় গুলিয়ে উঠল। মেয়েগুলো পেয়েছে কী ওকে? সব কটা প্রস্টিটিউট! বেশ্যা! ও এক ঝটকায় লোরেনের হাত সরিয়ে দিল গা থেকে।
লোরেন ওর হাত থেকে উপহারগুলো নিয়ে গালে ঠেকাল। নিরু সেদিকে ফিরে চাইলও না একটা প্রতিশোধের ভাব জাগছে ওর ভেতরে। বাড়ির পথে ও নন্দিনীদের জানালায় একটা ঢিল ছুড়বেই। আর সেটাই ওদের ভালোবাসার শেষ কথা। ও তড়াক করে ডিভান থেকে লাফিয়ে উঠে দরজার দিকে পা বাড়াল। আর কিছু ঠাউরে ওঠার আগে আটকে পড়ল লোরেনের বুকের মধ্যে। লোরেন ওকে জাপটে ধরে গালে গাল ঘষছে, ঠোঁটে চুমু খাচ্ছে। জড়িয়ে জড়িয়ে অসভ্য ইংরজিতে কী সব বলছে কানে ফিস ফিসিয়ে। ও শুধু একটা কথারই হদিশ করতে পারছে— আই লাভ ইউ, লিটল লাভার, লিটল লাভার…
এক অদ্ভুত অনুভূতিতে শরীর অবশ হয়ে আসছে নিরুর। ও হাত দিয়ে অনুভব করছে লোরেনের বুক দুটো। কী মিষ্টি স্পর্শ! কী ভীষণ অন্যরকম সব কিছুর থেকে! অবশ হতে হতে ও গড়িয়ে পড়েছে ডিভানে। লোরেন সেই সুযোগে ফের চালিয়ে দিয়েছে এলভিসের গান ‘লাভিং ইউ, জাস্ট লাভিং ইউ। তারপর ফিরে এসে ফের আঁকড়ে ধরেছে নিরুকে। নিরুর হাতও …
হঠাৎ প্রবল চেঁচামিচি বাইরে। বেহেড মাতাল কিছু জাহাজি লোক হই হই করে ঢুকে পড়েছে ফ্ল্যাটে। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ইংরেজি গান গাইছে লোরেনের মা মার্লিন। নিরুকে ছেড়ে দিয়ে ডিভানে সোজা হয়ে বসল লোরেন। তারপর দু-হাতে মাথা গুঁজে কাঁদতে লাগল, দ্যাট বিচ উইল নেভার গিভ মি পিস। নেভার! নেভার! নেভার! ওর চোখের গরম গরম জলের ফোঁটা ছিটকে এসে পড়ল নিরুর গায়ে। আর ওর মনে পড়ল নন্দিনীকে, যাকে ও একবার এভাবে কাঁদতে দেখেছে। যখন ওর দিদি কলেজের প্রফেসরের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করে চলে গেল।
নিরু উঠে ঘরের দরজা খুলে দাঁড়াল। দেখল তিনটি যুবক প্রায় চ্যাংদোলা করে আনছে মার্লিনকে। মার্লিন নেশায় চুর, কিছুই দেখছে না চোখে, শুধু জোরে জোরে বেসুরো ভাবে গেয়ে যাচ্ছে ‘ নেভার অন আ সানডে। মার্লিন নিরুকে দেখতেও পাচ্ছে না, লোকগুলোকে বলতে শুনল, হাই বয়! ইউ নিভ আ ওম্যান?
